লামায় ইউপি চেয়ারম্যান ছাচিং প্রু’র যত অনিয়ম

সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি এখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। নির্বাচিত হওয়ার পর পেয়ে গেছেন আলাদিনের চেরাগ। কুঁড়ে ঘর ছেড়ে রাজার হালে থাকেন ডুপ্লেক্স প্রাসাদে। আর প্রসাদে বসেই জনসেবার নামে শুরু করেছেন শোষণ বাণিজ্য। রোহিঙ্গাদের ভোটার বানানো, জাল জাতীয় সনদপত্র প্রদান, রোহিঙ্গাদের ভূয়া জন্মনিবন্ধন বাণিজ্য, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও ভূমি অধিগ্রহণের নামে অর্থ আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, ষড়যন্ত্র মামলাসহ এমন কোন অপরাধ বাকী নেই যেখানে বান্দরবানের লামা উপজেলার রূপসী পাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছাচিং প্রু মারমার হাত নেই।

তিনি যেন পাহাড়ী জনপদের একক অধিপতি। সর্বশেষ পাহাড়ী বাঙ্গালী নারীদের অসহায়ত্বের সুযোগে অনৈতিক সম্পর্কের মতো ঘৃণিত কর্মকান্ড থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক এক বাঙ্গালী নারীকে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। তার এসব কর্মকান্ডে বিব্রত গোটা ইউনিয়নের লোকজন।

অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য মতে, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে লামা উপজেলার মং প্রু মারমার ছেলে রূপসী পাড়া ইউনিয়নের দুই বারের চেয়ারম্যান ছাচিং প্রু মারমা। বিগত সময়ে লামা মংপ্রু পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের চাকুরী করতেন। ২০১১ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে রূপসী পাড়া ইউনিয়নের নির্বাচনে প্রতিদন্দ্বীতা করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আর পিছনে ফিরে থাকাতে হয়নি, ইউনিয়নকে পরিণত করেছেন দুর্নীতির খনিতে। ২০১১ সালের পূর্বে সম্পদ বিবরণী মতে ১ একর জমি, স্ত্রীর ৫/৬ ভরি স্বর্ণ ও সামান্য নগদ টাকা ছাড়া কিছুই ছিলনা। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে সম্পদ বিবরণীর তথ্য মতে তার স্ত্রীর চাকুরীর বেতন, চেয়ারম্যান ভাতা, জমি লাগিয়ত বাবদ বাৎসরিক আয় উল্লেখ করা হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু পাঁচ বছরে তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে কয়েকশ গুন। লামার রূপসী পাড়া ইউনিয়নে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তুলেছেন প্রাসাদোপম ডুপ্লেক্স অট্টালিকা। নামে বেনামে দখলে নিয়েছে শত শত একর বনভূমি।

এসব অর্থের অনুসন্ধানে গিয়ে তার দুর্নীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট ও সরকারি বরাদ্দসহ লুপাটের তথ্য বার্তা বাজারের হাতে এসেছে। সেসব কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্তি ও রোহিঙ্গাদের জন্ম সনদ প্রদান, মং প্রু পাড়া হতে রূপসী পাড়া পর্যন্ত সড়ক নির্মাণে জমি অধিগ্রহণের আসল মালিকদের নাম বাদ দিয়ে তার পরিবার ও নিকট জনদের ভূয়া মালিক সাজিয়ে নামে অর্থ আত্মসাৎ, অসহায় মানুষের বাগানের গাছ লুটপাট, সরকারী বিধি লংগন করে ইউনিয়নের ৬টি বাজার ইজারা, ভিজিডি কার্ড বিতরণে অর্থ আদায়, অন্যের আইডি ব্যবহার করে ভিজিডি রেশন তুলে বিক্রি, হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করে নামমাত্র সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে বিশাল অংকের অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি পরিদর্শনকালে তথ্য গোপনসহ বিভিন্ন অপকর্মের তথ্য পাওয়া গেছে এসব নথিতে।

২০১১, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৮ এবং এই পর্যন্ত জেলা প্রশাসন কর্তৃক ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকান্ড পরিদর্শন হয়েছে মোট ৪বার। ২০১৮ সালের পরিদর্শনের নথি পর্যালোচনা করে তার দুর্নীতির পিলে চমকানো তথ্য পাওয়া গেছে। ইউনিয়নে নাইখ্যং মুখ বাজার, রূপসী পাড়া বাজার, রূপনগর বাজার, অংলা পাড়া বাজার, শীলের থোয়া বাজারসহ মোট ৬টি বাজার রয়েছে। অতচ পরিদর্শন রিপোর্টে কোন বাজার নেই এবং এসব বাজার থেকে কোন রাজস্ব আদায়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। ২০১১ সাল থেকে প্রীয়তোষ বড়ুয়া নামের এক ব্যক্তিকে ৪লাখ টাকার বিনিময়ে বছর কারবারী বাজার ইজারা দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদের প্যাডে ১৯/১২ স্মারক মূলে ২০১৯ সালের ১ জুলাই প্রিয়তোষ বড়ুয়াকে ফের ইজারা আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এইভাবে বাজার ইজারা বাবদ ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৩৬ লাখ টাকা আদায়ের কোনো হিসাব নেই। এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদে ৩টি মৌজায় ৬৫টি গ্রামে ৩ হাজার ২৫০টি বাড়ি রয়েছে। প্রতিটি বাড়ি থেকে সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা পর্যন্ত কর আদায় করা হয়। প্রতি বছর ৮ লক্ষ টাকা করে ৯ বছরে ৭২ লাখ টাকা আদায় করা হয়। অতচ পরিদর্শন কালে বাৎসরিক ৮০ হাজার টাকা আদায়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর স্থানীয় লোকজন বেশ কয়েকটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

এছাড়াও বিভিন্ন সময় স্থানীয় বাঙ্গালীদের যৌন হেনস্থার অভিযোগ থাকলেও সম্প্রতি সাহায্য প্রার্থী এক পয়ত্রিশোর্ধ অসহায় নারীকে ফোনে কুপ্রস্তাবের অডিও ক্লিপস ভাইরাল হয়েছে। পরবর্তীতে ওই নারীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে বান্দরবান জেলা আদালতে একটি মামলাও করেছেন ভোক্তভুগী নারী (মামলা নং- সি আর ১৯/২০২১)। মামলাটির তদন্ত ভার সিআইডি’র হাতে রয়েছে। ওই নারীর অভিযোগ, ছাচিং প্রু মারমা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে ও অর্থের বিনিময়ে মামলার তদন্তকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার মিশনে নেমেছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে, চেয়ারম্যান ছাচিং প্রু মারমার নিকট জানতে চাওয়া হলে সবকিছু তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবী করেন। বিস্তারিত জানতে চাইলে ফোনে কোনো কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।

এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষের দাবী চেয়ারম্যান দুই দফা দায়িত্বকালে ইউনিয়নকে নরকে পরিণত করেছেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানান তারা।

বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর