রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ছয় কর্মচারীকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কর্মকর্তা পদে পদোন্নতিতে আপত্তি তোলায় বোর্ড সচিব অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেনের দপ্তরে ঢুকে সচিবসহ হিসাব বিভাগের উপ-পরিচালক (ডিডি) অধ্যাপক বাদশা হোসেনকে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর বিকালে বোর্ড সচিবের দপ্তরে ডুকে অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও উপ-সচিব ওয়ালিদ হোসেনসহ তার সহযোগীরা এই হেনস্তা করেন বলে জানা যায়। বোর্ডের দুই কর্মকর্তাকে হেনস্তার ঘটনাটি সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট ধরা পড়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে অফিসার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ হোসেনকে এগিয়ে গিয়ে সচিবের মুখের কাছে হাত নিয়ে তাকে চড় মারতে উদ্যত হতে দেখা যায়। এরপর সচিব ও ডিডিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অশালিন মন্তব্য, গালিগালাজ ও শাসাতে দেখা যায়।
বোর্ড সচিব ও উপ-পরিচালক ঘটনার একদিন পর ১৩ সেপ্টেম্বর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর পৃথক পৃথক অভিযোগ দেন। একই ঘটনায় দায় চাপিয়ে সচিব ও উপ-পরিচালকের বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান বরাবর পাল্টা অভিযোগ দেন ওয়ালিদ হোসেনসহ তার সহযোগীরা।
জানা গেছে, ঘটনার ৯ দিনেও বোর্ড চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে গত ২০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বার বোর্ড চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন হেনস্তার শিকার দুই কর্মকর্তা। এ সময় প্রমাণ হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজ হস্তান্তর করেন তারা।
এদিকে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে হিসাব বিভাগের ডিডিকেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে তিনদিনের মধ্যে ব্যাখ্যা তলব করেছেন বোর্ড চেয়ারম্যান। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো উপ-পরিচালককে শারীরিক হেনস্তার পর মানসিক পীড়নের উদ্দেশ্যেই এই নোটিশ বোর্ড চেয়ারম্যান দিয়েছেন বলে মনে করছেন ঘটনার শিকার দুই কর্মকর্তার একজন।
হেনস্তার শিকার এক কর্মকর্তা জানান, বোর্ড চেয়ারম্যান ত্রাস সৃষ্টিকারী ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের হেনস্তাকারীদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। কারণ যে কুচক্রী সিন্ডিকেট ঘটনা ঘটিয়েছেন তারা বোর্ড চেয়ারম্যানের নির্দেশ ছাড়া কিছুই করেন না।
আর বোর্ড চেয়ারম্যান তার প্রতিপক্ষভেবে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে প্রেষণে দায়িত্বরত শিক্ষা ক্যাডারের পাঁচ কর্মকর্তাকে অতীতেও এদেরকে দিয়েই নানাভাবে হেনস্তা করেছেন বহুবার। কোনবারই দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, হেনস্তার শিকার দুই কর্মকর্তা শিক্ষা ক্যাডার থেকে পদন্নতিপ্রাপ্ত এবং মন্ত্রণালয়ের নিয়োগের মাধ্যমে প্রেষণে শিক্ষা বোর্ডে দায়িত্বরত আছেন।
জানা গেছে, অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী থেকে পদোন্নতি পেয়ে অফিসার হয়েছেন বিগত চেয়ারম্যানের আমলে। সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ এমন ৯ জনকে কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। তবে পদোন্নতির পর নিয়ম বহির্ভূতভাবে জাতীয় বেতন স্কেলে তাদের প্রাপ্যতার অধিক বাড়তি গ্রেড দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পদোন্নতিপ্রাপ্তরা প্রাপ্য বেতন ও সুবিধার অধিক আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন।
এদিকে বর্তমান সচিব প্রফেসর ড. মোয়াজ্জেম হোসেন ও ডিডি হিসাব অধ্যাপক বাদশা হোসেন নিয়ম বহির্ভুত হওয়ায় তাদেরকে বাড়তি বেতন গ্রেড দিতে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। গত ১২ সেপ্টেম্বর ঘটনার দিন এই ধরনের পদোন্নতি পাওয়া কতিপয় কর্মকর্তার সার্ভিস ফাইলের নথিপত্র সেকশান থেকে ফটোকপি করে নিজের হেফাজতে নেন ডিডি।
এসব নথিপত্র কেন ডিডি ফটোকপি করেছেন- তার প্রতিবাদ করতেই ওই দিন ওয়ালিদ হোসেন সচিবের দপ্তরে চড়াও হন। যেখানে আগে থেকে ডিডি বাদশা হোসেন মিটিং করছিলেন। ওয়ালিদরা ডিডিকে তুলে আনার চেষ্টাও করেছিলেন।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে প্রেষণে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে পদোন্নতি পেয়ে কর্মকর্তা হওয়াদের জটিল দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এ নিয়ে বোর্ডের পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম উপ-সচিব ওয়ালিদ হোসেনের বিরুদ্ধে এর আগেও প্রেষণ কর্মকর্তাদের শারিরীক হেনস্তার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি বোর্ড চেয়ারম্যান ড. মোকবুল হোসেন আরও ছয় কর্মচারীকে কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দিয়ে সচিবকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। নিয়ম বহির্ভূত হওয়ায় বোর্ড সচিব ফাইলটি আটকে দেন। এতে আগে থেকে চলা দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়।
এ বিষয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মোকবুল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
মাহাবুল/বার্তা বাজার/টি