অস্তিত্ব সংকটে তৃণমূল পোল্ট্রি খামারিরা

দিনের পর দিন পোল্ট্রি শিল্পের অন্যতম উপাদান মুরগির এক দিনের বাচ্চা, খাদ্য নিয়ে উৎপাদনকারী কোম্পানি ও ডিলারদের আচরণে হতাশায় প্রান্তিক খামারিরা। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার ঋণের চক্রে সর্বস্বান্ত হয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

একই সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিজেরাই মাংস ও ডিম উৎপাদনের জন্য জারি রেখেছে কৃত্রিম সংকট। বহুবিধ সমস্যার কবলে পড়ে কুষ্টিয়ার খোকসায় স্ব-উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে জানা যায়, শুধু একটি মুরগির শেড থাকলেই খামারিকে বাঁকিতে সবকিছু সরবরাহ করছে স্থানীয় পোল্ট্রি ডিলার ও খাদ্যের ব্যবসায়ীরা। তাই নির্ধারিত সময়ের পর মুরগি সুস্থ হওয়াসহ বাজার মূল্য স্বাভাবিক থাকলে মূল্য ফেরতের সম্ভাবনা থাকে। অপরদিকে নানা কারণে দরপতন ঘটলে হ্যাচারি মালিক ও খাদ্য ব্যবসায়ীদের খাতায় বকেয়ার পরিমাণ বাড়াতে থাকে। পাশাপাশি দেনাদার খামারিদের তালিকাও দীর্ঘ হয়ে পড়ছে।

এসব কারণে গত কয়েক বছরে খাদ্য কারখানা, হ্যাচারিসহ ওষুধ ব্যবসায়ীদের হিসাবের খাতায় লখ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদিত এক দিনের বয়সের বাচ্চাগুলো আইন ভঙ্গ করে মাংস ও ডিম উৎপাদনের জন্য নিজেদের খামারে ব্যবহার করছে বলে জানান খামারিরা।

কয়েকজন খামারি জানিয়েছেন, গেল তিন অর্থ বছরে পোল্ট্রি শিল্পে সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট কমিয়ে দিয়েছে। খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর দাম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও সিন্ডিকেট চক্রের কারণে গত এক বছরে কেজি প্রতি খাদ্যের দাম বেড়েছে ১০-১৫ টাকা। অন্যদিকে ডিলারদের কাছে থেকে দিনের পর দিন বাকিতে নেওয়ার কারণে বাড়তি দাম দিয়েই নিতে হচ্ছে এক দিন বয়সের বাচ্চাসহ খাবার ও ঔষধ।

বিক্রি উপযুক্ত হলে মধ্যস্বত্বভোগীরা ব্রয়লার ও সোনালী মুরগী কেজি প্রতি হাতিয়ে নিচ্ছে ১৫-২০ টাকা। ডিমে নিচ্ছে শতকরায় ১০-১৫ টাকা। তদারকি না থাকার কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে খামারিদের। আর নির্দিষ্ট অনুপাতে বাজারে ডিম ও মাংসের দাম না বাড়ায় বেশি খরচ করে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে নিয়মিতই ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রান্তিক খামারিরা।

অন্যদিকে, দুই মাস খাদ্য খাওয়ানোর পর সোনালী মুরগির ওজন ৭০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম হওয়ার কথা থাকলেও মুরগির ওজন হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ গ্রাম। ফলে বাজারে মুরগি বিক্রি করে লোকসান গুনতে হচ্ছে খামারিদের।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, বর্তমানে উপজেলায় রেজিস্ট্রিকৃত খামারে মুরগির সংখ্যা ২ লাখ ৪১ হাজার ৫২০টি। যাদের মধ্যে লেয়ার মুরগি ৬ হাজার ৪০০টি, সোনালী ৪৫ হাজার টি ও ব্রয়লার মুরগির সংখ্যা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০টি।

এছাড়াও দেশি মুরগি রয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ২৩০টি। তবে খামারিদের তথ্যমতে, এ উপজেলায় ছোট বড় খামারে মুরগির পরিমাণ আরও বেশি।

শোমষপুর গ্রামের ডাবলু মোল্লা বর্তমানে তার খামারে রয়েছে ৫০০টি সোনালী ও ১০০ ব্রয়লার। প্রতি মাসে তারা নিজস্ব শেডে প্রতিপালন করতেন দুই থেকে চার হাজার মুরগি। গেল দুবছর আগেও মুরগি প্রতিপালন করে মাসে তাদের আয় হতো ২০/৩০ হাজার টাকা। কিন্তু সম্প্রতি তাকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

কথা হয় বিলজানি ইউনিয়নের সিংঘোরিয়া গ্রামের ইসলাম হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, গতবছর ৪ ধাপে খাবারের দাম বেড়েছে। এবছর জানুয়ারিতে প্রতি বস্তা ব্রয়লার মুরগির খাবারের দাম ছিল ২২০০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৬১৫ বস্তা।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, পরিকল্পিতভাবে বাচ্চার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিজেরা মাংস ও ডিম উৎপাদনে নিয়োজিত হচ্ছে। এছাড়াও খাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ে ডিলারদের স্বেচ্ছাচারিতা রীতিমতো খামারিদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে।

ইমরান হোসেন বলেন, গত ১১ বছর ধরে সমসপুরের এর পোল্ট্রি খাদ্যের পরিবেশকের কাছে থেকে বাঁকি লেনদেন করেছি। প্রথম দিকে খাবারের মান ও দাম ভালো হলেও কিছুদিন পরেই বস্তা প্রতি ১৫০-২০০ টাকা বেশি ধরে খাতায় লিখা হতো।

কয়েক বছরের বকেয়ার খাতায় হিসেবের সঙ্গে অতিরিক্ত মিলিয়ে ৬ লাখ টাকা দাবি করেন ওই পরিবেশক। আমি অতিরিক্ত টাকা দিতে না চাইলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন তিনি। সবশেষে পোল্ট্রি বেচে তার টাকা পরিশোধ করি।

স্থানীয় পোল্ট্রি ফিড পরিবেশক নাহিদ পোল্ট্রি এন্ড ফিস ফিড এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ২০০৭ থেকে ব্যবসা করছেন সমষপুর বাজারে। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে প্রতি বস্তা ব্রয়লারের খাবারের দাম ছিল ১০১০ টাকা, বাচ্চার দাম ১৮-২০ টাকা।

সেসময় প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগী বিক্রি হতো ৯০-১০৫ টাকা। বর্তমানে প্রতি বস্তা ব্রয়লারের খাবারের দাম ২৬১৫ টাকা, বাচ্চার দাম ৩৫-৩৭ টাকা। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগী বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩৫ টাকা।

তিনি বলেন, পোল্ট্রি খাদ্যের প্রধান উপকরণ ভুট্টা সহ সকল উপাদানের দাম বেড়েছে। তাই খাদ্যের দাম বেশি। গত দুই বছর আগে আমার খামারির সংখ্যা ছিল ৭২ জন। বর্তমানে তার খামারির সংখ্যা ৩৪ জন।

কথা হয় খোকসা শামীম পোল্ট্রি এর স্বত্বাধিকারী আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে। বর্তমানে তার খামারির সংখ্যা ৩০ জন। তিনি বলেন, খাবারের দাম কমতে হবে অথবা মুরগির দাম বাড়তে হবে। তবেই প্রান্তিক খামারিরা লাভবান হবেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. পলাশ চন্দ্র রায় জানান, খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি করা হচ্ছে। এছাড়াও পোল্ট্রি খামারিদের সার্বিক সহযোগিতায় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনাসহ সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

মোঃ মোশারফ হোসেন/বার্তা বাজার/টি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর