তারিকুল ইসলাম, জেলা প্রতিনিধি: ভোটাধিকার পাওয়ার পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করছে সরকার। এলক্ষ্যে দেশের প্রথম জেলা হিসেবে শেরপুরে হিজড়া সম্প্রদায়ের ৫২ জন সদস্যের বাসস্থান তৈরির জন্য দুই একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের কবিরপুর মৌজার আন্ধারিয়া গ্রামে হিজড়াদের জন্য এ আবাসন তৈরি করা হবে।
জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব বলেন, অবহেলিত এ সম্প্রদায়কে সমাজের মূলস্রুতে সামিল করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে হিজড়াদের সাথে মতবিনিময়কালে তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের বাসস্থানের জন্য আমরা পত্র পাঠিয়েছিলাম। ইতোমধ্যেই তা অনুমোদিত হয়েছে। সদরের আন্ধারিয়া গ্রামে হিজড়াদের জন্য দুই একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে তাদের বাসস্থান করে দেওয়া হবে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিজড়াদের জন্য ভীষণ আন্তরিক বলে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক আরও জানান, কেবল বাসস্থান নয়, ওই আবাসন প্রকল্পে হিজড়াদের পূণর্বাসন ও কর্মর্সস্থানের লক্ষ্যে সেলাই মেশিন, হাঁস-মুরগী, গবাদি পশুপালন, মৎস্য চাষ সহ বিভিন্ন ধরনের আত্মকর্ম প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
কথায় কথায় নিশি সরকার বলেন, আসলে আমরা সমাজে ভীষণভাবে অবহেলিত। আমাদের দেখে মানুষ হাসে, ঘৃণা করে। কিন্তু আমাদের যে কত কষ্ট তা মানুষ বোঝে না। পরিবারে আমাদের স্থান নেই, সমাজ আমাদের ঘৃণার চোখে দেখে। কিন্তু আমরা সমাজে সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে চাই, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। আমাদের থাকা খাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নাই, ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। বাধ্য হয়ে আমাদের পথে নামতে হয়। কিন্তু আমরাওতো মানুষ। আমাদের থাকার জায়গা দরকার। লেখাপড়া করা দরকার। বিনোদন দরকার, কাজের সুযোগ দরকার। সর্বোপরি আমরা মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু সমাজের কাছে আমরা মূল্যহীন থাকায় কারও ওপরেই আমাদের আস্থা ছিলো না।
নিশি সরকার বলেন, এখন আমরা আমাদের যেকোনো প্রয়োজনে ডিসি-এসপি স্যারের সাথে একসাথে বসতে পারি। অনুষ্ঠানেও দাওয়াত পাই। তারা আমাদেরকে দাওয়াত করে খাইয়েছেন। গেল রমজানের রোজায় এসপি সাহেব (কাজী আশরাফুল আজীম) স্যার আমাদের শেরপুরের সকল হিজড়াদের নিয়ে ইফতার মাহফিল করেছেন। ঈদে সবাইকে শাড়ী ও সেমাই-চিনি উপহার দিয়েছেন। ঈদের দিন হুইপ আতিক এমপি এবং সমাজের গণ্যমাণ্য ব্যক্তিদের সহ একসাথে দুপুরে দাওয়াত খাইয়েছেন। ডিসি স্যারও (আনার কলি মাহবুব) ঈদ উপহার হিসেবে এবার আমাদের সবাইকে চাল-ডাল, সেমাই, সুজি, চা, নারকেল তেল ও প্রসাধনীসহ ১৪ প্রকারের জিনিস দিয়েছেন। ঈদ কার্ড দিয়েছেন। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রুমান ভাই (হুমায়ুন কবীর রুমান), সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানু ভাই (ছানুয়ার হোসেন ছানু), সাবেক মহিলা এমপি শ্যামলী আপা (ফাতেমাতুজ্জহুরা শ্যামলী) এবং হুইপ সাহেব (হুইপ আতিউর রহমান আতিক) আমাদেরকে ঈদ উপহার দিয়েছেন। আগেতো কেউ আমাদের খোঁজ নেওয়াতে দূরের কথা, আমগরে সবাই দুর দুর ছেই ছেই করতো। এখন সবাই আমাদের ডাকে, আদর করে উপহার দেয়। এই জন্যই এখন আমরা তাদের কথায় ভরসা পাই, আশ^স্ত হই।
নাগরিক প্ল্যাটফরম জনউদ্যোগ শেরপুর কমিটির মাধ্যমে শেরপুরে হিজড়া জনগোষ্ঠিকে সংগঠিত করে জেলা প্রশাসনের সাথে তাদের আবাসন ও কর্মসংস্থানের দাবীতে গত বছরের নবেম্বর মাসে (২০১৮ সালের ৮ নবেম্বর) ‘শেরপুরে হিজড়া জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভা করা হয়। হিজড়াদের নিয়ে জেলায় এটাই ছিলো প্রথম কোন আয়োজন। অনুষ্ঠানে প্রায় ৩৫ জন হিজড়া ছাড়াও ডিসি-এসপি, সমাজসেবা কর্মকর্তা, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, ব্যবসায়ী সহ সুধীসমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।