সিরাজগঞ্জ শপ-আলাদিনের প্রদীপে কপাল পুড়ছে হাজারও মানুষের

দেউলিয়া হওয়ার গল্পের ভিড়ে ‘সর্বনাশা’ বছরে আস্বাদন দিয়ে গেছে ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসা। ই-কর্মাস সাইটের মালিকরা মহামারীর দিনগুলোতে যেমন সম্পদ বাড়িয়েছেন হু হু করে, তেমনি দেশের বাজারে রীতিমতো ‘ঝড়’ চলেছে অন্তর্জালের এই কেনাকাটায়। আলু-তেল থেকে শুরু করে বিলাসবহুল গাড়ী যেমন বিকিয়েছে অনলাইনে, তেমনি সর্দি-কাশিরও ওষুধ পাওয়া গেছে একটি মুঠোফোনে।

এরুপ সিরাজগঞ্জ শপ ডটকম ও আলাদিনের প্রদীপ নামে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান খুলেই রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে বনে গেছেন সিরাজগঞ্জের কয়েক যুবক। তবে প্রতারণার জাল গোছাতে এখন অফিসে দিয়েছে তালা। এদিকে সিরাজগঞ্জ শপ ডটকম এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জুয়েল রানার বিরুদ্ধে প্রতারণামূলকভাবে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে।

এ ঘটনায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ঢাকা বনানী থানায় একটি মামলা হয়েছে। ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জ এর মতো চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে সিরাজগঞ্জের এই দুই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ও পণ্যের অর্ডার করে অগ্রিম টাকা দিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন হাজারো গ্রাহক। অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন প্রতিষ্ঠান দুটির কর্ণধারেরা, তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের অফিস। অনলাইন ব্যাংকিং নগদ’র মাধ্যমে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকায় হতাশায় ভুগছেন বিনিয়োগকারীরা।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলি ইউনিয়নের বেড়াবাড়ি গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত তরুণ জুয়েল রানা জেলা প্রশাসনের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্টের প্রশিক্ষণ নিয়ে গড়ে তোলেন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান সিরাজগঞ্জ শপ ডটকম। শহরের এম এ মতিন সড়ক ও কাঠেরপুল এলাকায় জাকজমকপূর্ণ দুটি অফিস নিয়ে জনবল নিয়োগ ও চটকদার বিজ্ঞাপন এবং বিশাল অফারের মাধ্যমে শুরু করেন বিনিয়োগ ও অর্ডারের অগ্রিম অর্থ আদায়। প্রতিষ্ঠান চালুর পর অল্প সময়ে কোটিপতি বনে যান প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারেরা। সেই সাথে শুরু হয় তাদের বিলাসী জীবনযাপন। অন্যদিকে জেলার তাড়াশ উপজেলার নিভৃতপল্লীর সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান মুন ও মাহমুদ হাসানও ঠিক একইভাবে গড়ে তোলেন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলাদীনের প্রদীপ। দেশের অন্যান্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জশপ ডটকম ও আলাদীনের প্রদীপ প্রায় সোয়া চার লক্ষ অর্ডারের বিপরীতে সংগ্রহ করে অগ্রিম ২০৫ কোটি টাকা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত দেশের ১৫টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকা এ প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পণ্য প্রদান ও টাকা রিফান্ড করার পরেও এখনো গ্রাহকদের কাছে প্রায় ২২ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া রেখে প্রতিষ্ঠান দুটির কর্ণধারেরা আত্মগোপনে যাওয়া ও নগদ অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকায় বিভ্রান্তি ও হতাশায় ভুগছেন বিনিয়োগকারীরা। আত্মগোপনে যাওয়ার দুই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারেরা গ্রাহকদের নানা আশ্বাস দিয়েছিলেন আমাদের দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

শহরের নাজমুল চত্তর এলাকার ভুক্তভোগী গ্রাহক মো. রেজাউল স্বরণ বলেন, গত তিন মাস আগে দুটি মোবাইল বাবদ ৪০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। এখন ও মোবাইল পাই নাই। তাদের অফিস ও বন্ধ। কাঠেরপুল এলাকার জাকির হোসেন ও একই অভিযোগ করে বলেন, আমি মোটরসাইকেল নেয়ার জন্য টাকা দিয়েছিলাম সেটা এখনও পাইনি।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জ শপ ডটকমের মালিক জুয়েল রানা এরই মধ্যে ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৩ টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন। সম্প্রতি ওই প্রতিষ্ঠান রিফান্ড রিকোয়েস্ট অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নগদ এর নিকট ধরা পড়ে। এ ছাড়া একই পরিমাণ টাকা একই হিসাব নম্বরে বারবার দেওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট (অনুরোধ) করা হচ্ছিল।

অদ্ভুত বিষয় হলো, সফলভাবে পণ্য ডেলিভারি হয়ে গেছে-এমন অর্ডারের বিপরীতেও রিফান্ড রিকোয়েস্ট আসছিল। এ ছাড়া অর্ডার অ্যামাউন্টের সঙ্গে রিফান্ড অ্যামাউন্টের গরমিল। গভীর রাতে রিফান্ড রিকোয়েস্ট আসতে থাকে প্রচুর। এ বিষয়টি ধরা পড়ার পর ‘নগদ’ সিরাজগঞ্জ শপ ডটকমের সঙ্গে তাদের সব লেনদেন স্থগিত করে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ই-মানি আকারের ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৩ টাকা প্রতারণামূলকভাবে নিয়ে যায়। এরপর নগদের পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জ শপ ডটকমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

গত ২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নগদকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এরইমধ্যে সিরাজগঞ্জ শহরের বাহিরগোলা ও এমএ মতিন সড়কে সিরাজগঞ্জ শপ.কমের প্রধান ও আ লিক অফিস দুটি গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তালাবদ্ধ ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসহ আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে কোম্পানির পণ্য ডেলিভারির গাড়িগুলোও।

আলাদিনের প্রদীপ ডটকম এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মুনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অনলাইন ব্যাংকিং সমস্যার কারণে ঢাকায় আছি। ওই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান জানান এক লাখ ২০ হাজার গ্রাহকের ৮৫ কোটি টাকার অর্ডারের বিপরীতে মাত্র ৫ কোটি টাকা বকেয়া আছে। নগদের ঝামেলা না থাকলে এসব বকেয়াও থাকতো না।

সিরাজগঞ্জ শপ ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জুয়েল রানা জানান, আমাদের যে দেনা ও প্রপারটিজ আছে, সেটা থেকেই এটা পরিশোধ করতে পারবো।

এদিকে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিমালার আওতায় আনা ও নজরদারির পাশাপাশি ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অর্থ ফিরিয়ে দিতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা ভুক্তভোগী গ্রাহকদের।

এম এ মালেক/বার্তা বাজার/অমি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর