আজ মঙ্গলবার সকাল ৯:৫১, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং, ২রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৬শে মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

হতাশা কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর সাহসী হয়ে ওঠার গল্প

নিউজ ডেস্ক | বার্তা বাজার .কম
আপডেট : মার্চ ৯, ২০১৭ , ১০:২৯ অপরাহ্ণ
ক্যাটাগরি : সফলতার গল্প
পোস্টটি শেয়ার করুন

আমি চরম হতাশাগ্রস্ত এক মানু্ষ। অল্প কিছুতেই হতাশার সাগরে সাঁতার কাটা আমার এক ধরনের হবি বলতে পারেন! সেই ছোট্টবেলা থেকেই আমি এমন। “তারে জামিন পার” এর ঈশানের মতো আমারও পড়তে লিখতে খুব সমস্যা হতো। পড়তে গেলে চোখের সামনে নানা কল্পনা ঘিরে ধরত। সবচেয়ে বেশী সমস্যা হতো লেখার ক্ষেত্রে, লিখতে বসে শুরু করে দিতাম ছবি আঁকা।

যেমন ধরুন, লিখছি হয়তো গরু ঘাস খায়। পাশে তা এঁকেও দিতাম। একবারতো অংক পরীক্ষার খাতায় বাসা এঁকে দিয়েছিলাম। যতদিন যাচ্ছিল আমার এ সমস্যাগুলো প্রকট হচ্ছিল। আমি যে সমস্যার সমাধান করতে চাইনি তা বললে ভুল হবে। কিন্তু কিছুতে শোধরাতে পারছিলাম না নিজেকে। যার কারণে রেজাল্টের অবনতি হচ্ছিল দিনকে দিন। হতাশা তখন জেঁকে বসেছিল আমায়। তবুও ৫ম ও ৮ম শ্রেণির বৃত্তিটা মিস হয় নি। কারণ সেই হতাশা আমাকে লড়ে যাবার শক্তি জুগিয়েছিল।

এসএসসি পরীক্ষার আগে আবারও ডিপ্রেশন মহাশয় আমার সদর দরজায় কড়া নাড়লেন। কারণ প্রিটেস্ট আর টেস্টের রেজাল্ট চরম বাজে হয়েছিল। বোনেরা, বন্ধুরা নানাভাবে অপমানিত করেছিল। যার ফলে নিজেকে সবকিছু থেকে আলাদা রেখেছিলাম। রুমে একা একা কাঁদতাম, আর ভাবতাম আর কিচ্ছু হবে না আমার দ্বারা। সুইসাইড করার চেষ্টা তখনই প্রথম করেছিলাম। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে বুঝেছিলাম মৃত্যুটা কত কষ্টের। বেঁচে থেকে লড়ে যাবার প্রবল ইচ্ছার বীজও বুনলাম তখনই। ফলস্বরূপ জিপিএ-৫ হাতছাড়া হলো না।

কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম এইচএসসি পরীক্ষার পর। পরীক্ষা আশানুরুপ হওয়ার পরও অল্পের জন্য জিপিএ ৫ পেলাম না। নিজেকে তখন বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। আমি বুঝতে পারছিলাম না এটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব। তখন বাসা ছেড়ে প্রথম হোস্টেলে থাকছিলাম, যার জন্য সে পরিবেশে নিজেকে কোনভাবেই মানাতে পারছিলাম না।

খুব কষ্ট হচ্ছিল, তবু একটা আশার জোরে চলছিলাম। রেজাল্টের পর সেই আশাটাও নিভে গেল। ঘুমের ওষুধের সাথে পরিচয়টা তখনই হলো। খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়ে সারাদিন শুয়ে থাকতাম। এমনকি কোচিংয়ের ক্লাসেও যেতাম না। অতঃপর কয়েকদিনের মাঝে অসুস্থ হয়ে গেলাম।

হোস্টেল ছেড়ে তাই বাসায় ফিরতে হলো। সেবার আমি কোথাও চান্স পাই নি। পাব কিভাবে আমি তো নূন্যতম প্রিপারেশনটাই নেই নি। হেরে গিয়েছিলাম, আর সেটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কী, ওই হারটা আমি মানতে পারিনি। আর তাই সবার অমতে সেকেন্ড টাইমের জন্য ট্রাই করি।

জাতীয় ভার্সিটিতে পরীক্ষা দেইনি আর প্রাইভেটের ঘোর বিরোধী। মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। পড়বতো পাবলিকেই। তার জন্য অবশ্য গঞ্জনাও কম খেতে হয়নি। বন্ধুবান্ধব পরিজন কেউ সাপোর্ট করেনি আমায়। কিন্তু আমি জানতাম জীবনটা আমার তাই লড়াইটাও একা আমারই। সবার অমতে নিজেকে প্রস্তুত করা শুরু করলাম। খুব কাঁদতাম তখন নিজের এই দশা দেখে। একটা ভুল আমার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছিল। লক্ষ্যে তবু অনড় ছিলাম।

অতিরিক্ত পরিশ্রম আমার শরীর দুর্বল করে দেয়। সবাই আমাকে সতর্ক করে তবু আমি থামিনি। যার দরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার আগের দিন আমি অসুস্থ হয়ে গেলাম। পরীক্ষা হলে যাবার আগে অজ্ঞান হয়ে যাই। হলে পৌঁছাই পরীক্ষা শুরুর ২০ মিনিট পর। আমি কেন জানি ঘাবড়ে যাইনি। শান্ত হয়ে পরীক্ষা দিলাম। কমন পড়েছিল ৮০% ই।

কিন্তু সময়টা..তবুও চুপ ছিলাম হল থেকে বের হয়ে। বিকেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা ছিল। কথায় বলে না, অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। আমারও তখন সেই হালই হয়েছিল। দেড় ঘন্টার পরীক্ষার পাক্কা ৪৫ মিনিট পর আমি পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি পাই শুধুমাত্র সিগনেচার শিটে আমার ছবি ছিল না বলে।

লাজ লজ্জা ভুলে সবার সামনে আমি ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলাম সেদিন। আর সেটাই মনে হয় স্বাভাবিক। গত ১ বছরের নিরলস পরিশ্রমের পর এভাবে এসে হেরে যাওয়াটা যে কী কষ্টের সেটা শুধু আমি জানি। জবিতে অবশেষে চান্স পেলাম। তবু ঢাবিতে চান্স না পাওয়ার কষ্টটা তখনও যাইনি। অবশেষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিয় বিষয়ে চান্স পেয়ে যাওয়ায় আর ভর্তি হই নি জবিতে।

আজকে এতকিছু বলার কারণ হলো জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। একটা ভুলের মাশুল হিসাবে পুরো ১টা বছর আমাকে বির্সজন দিতে হয়েছিল। মানসিক কষ্টের সেই দিনগুলোর কথা মন পড়লে আজও চোখ ভিজে যায়। আমার মতো হয়তো অনেকেই রেজাল্টের শোকে এমন একটা ভুল করে বসে। হতাশার গহ্বরে পা পিছলে পড়ে গেলে সেখান থেকে উঠে আসাটা অনেক কঠিন। তাই বলছি কি, ভবিষ্যতটা আমরা কেউ দেখি না। আজকে হেরে গেলে ভবিষ্যতটা অন্ধকারে ছেয়ে যাবে সেটা নিশ্চিত।

কিন্তু আজ আলোর খোঁজে নামলে আগামী দিনে হয়তো আলো নিজে থেকে এসেই ধরা দেবে। আমি বলব না যে আমি খুব ভালো আছি বা আমার ভবিষ্যত অনেক সুন্দর। হতাশা আজও আমাকে জ্বালাচ্ছে। তবু আমি স্বপ্ন দেখি একটি সুন্দর দিনের। যার জন্য সেই হতাশাই শক্তি জোগাচ্ছে প্রত্যেকবার লড়ে যাবার।

মীম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়