রায়পুরে বন্ধ থাকা কেজি স্কুল বিক্রির চেষ্টা!

সাত বছর আনন্দের সঙ্গে তিন বন্ধু মিলে স্কুলটি পরিচালনা করেছি। করোনায় সব শেষ করে দিয়েছে। একজন শিক্ষক মারা গেছেন। তার ৬ মাসের বেতন দিতে পারি নাই। খুব কষ্ট পেয়েছি। ১১ শিক্ষকের কেও শ্রমিক, কৃষি ও ব্যবসার কাজে নিয়োজিত হয়েছে। একই অবস্থাও বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৯ কেজি স্কুলের। সম্প্রতি সরজমিন গেলে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার মেঘনা উপকূলীয় কালুবেপারি বাজারের ইসলামগঞ্জ নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক মোঃ বিল্লাল হোসেন এ কথাগুলো বলে কেঁদে ফেলেন।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার সাধারণ ছুটি ও লকডাউন ঘোষণা করায় দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ রেখেছিলেন। এতে সারা দেশের মতো লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুলও বন্ধ ছিলো। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকায় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা বর্তমানে কর্মহীন ছিলেন । বিপাকে পড়া ৯১টির মধ্যে ২০টি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

উল্লেখ্য-রায়পুর উপজেলায় ১২১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্য মেঘনা উপকূলীয় জোয়ারের কারনে পানিবন্দি ৫টি বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের বেতননির্ভর কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের সহায়তায় কেউ এগিয়ে না আসায় তাদের পরিবারে চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ। নিরূপায় হয়ে কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। করোনায় সরকার বিভিন্ন খাতে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারের নেই কোনো বিশেষ সহায়তা।

রায়পুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৯১টি কিন্ডারগার্টেনে প্রায় ১৩ শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

কিন্ডারগার্টেনগুলোর আয়ের একমাত্র উৎস শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত টিউশন ফি। তাদের থেকে প্রাপ্ত এ আয়েই প্রতিষ্ঠানের ভবন ভাড়া, পরিবহন, বিদ্যুৎবিল, শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক সম্মানীসহ সব ব্যয় নির্বাহ করা হয়। শিক্ষার্থীদের বেতননির্ভর এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যৎসামান্য সম্মানী ও টিউশনি করে জোড়াতালি দিয়ে চলত শিক্ষক-কর্মচারীদের অস্বচ্ছল পরিবারের ভরণপোষণ। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় একদিকে বন্ধ রয়েছে শিক্ষার্থীদের বেতন, অপরদিকে বন্ধ রয়েছে প্রাইভেট টিউশনি। ফলে বন্ধ হয়েছে তাদের উপার্জন। লোকলজ্জা ও চক্ষু লজ্জার ভয়ে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা পারছেন না মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে আবার পারছেন না লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতে। তারা অপেক্ষায় আছেন কবে এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে।

রায়পুর কেজি স্কুল সমিতির (ওয়ামি) সভাপতি ও আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন জানান, কেজি স্কুলে শিক্ষকতার স্বল্প বেতনের পাশাপাশি প্রাইভেট পড়িয়ে কোনোরকমে পরিবারের প্রয়োজন মিটানোর চেষ্টা করে। স্কুল বন্ধ থাকার ফলে আয়-রোজগার না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে। আয়ের পথ বন্ধ হওয়ায় অর্থকষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঋণের দায়ে তারা জর্জরিত। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান স্কুল ভবনের ভাড়া ও বিদ্যুৎবিলসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর দায়ে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম। ৯১টির মধ্য ২০টি স্কুল সম্পুর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কিন্ডারগার্টেন স্কুল টিকে থাকা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। আয়ের পথ বন্ধ হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীরা পেশা পরিবর্তন করে, রাজমিস্ত্রী, দিনমজুর, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে পরিবার নিয়ে অতি কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

কিন্ডারগার্টেন সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি সহায়তা না পেলে ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শিক্ষাক্ষেত্রে অপরিসীম ভূমিকা রাখা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকে রাখা দায় হয়ে পড়বে।

ইসলামগঞ্জ নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ বিল্লাল হোসেন জানান, ২০১৩ সালে তিন বন্ধু স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করি। ১১ জন শিক্ষক কর্মরত ও প্লে থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত আড়াইশ শিক্ষার্থী অধ্যায়রত ছিলো। শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকায় পরিচালিত হয়। স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা কোনো বেতন দিচ্ছে না। ফলে আমরা শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রায় দেড় বছর বেতন ভাতা থেকে বঞ্চিত রয়েছি। এই দুর্যোগকালীন সময়ে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো সহায়তা না পাওয়ায় আমাদের পরিবারে হাহাকার বিরাজ করছে। স্কুলটি বিক্রি করার চিন্তা করছি। আমাদের মতোই রায়পুর শহরের মাহদুল মেহেদি একাডেমি, উদয়ন একাডেমি,প্যারাডাইম,মধুপুর আইডিয়াল, সায়েস্তানগর মডেল একাডেমি, বিসমিল্লাহ কিন্ডার গাডেন, সানরাইজ ও দক্ষিন চরকাছিয়া নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ ২০টি স্কুলের একই অবস্থা।

রায়পুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মুমুনুর রশিদ জানান, কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অতি দরিদ্র শিক্ষক-কর্মচারীদের ইতিমধ্যেই কিছু সহায়তা প্রদান করেছি। তারা খুব অর্থ সমস্যায় আছে। দাবির প্রেক্ষিতে তাদের এককালীন কিছু দেওয়ার চেষ্টায় আছি।

বার্তা বাজার/এসবি

 

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর