নিজেদের কোন্দলে দিশেহারা পাকুন্দিয়া উপজেলা আ.লীগ-বিএনপি

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজেদের ঘরের কোন্দলে দিশাহারা হয়ে পড়েছে। বিএনপি দুই ধারায় বিভক্ত। একটি পাকুন্দিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বর্তমান পাকুন্দিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এডভোকেট জালাল উদ্দীন গ্রুপ অপরটি চরফরাদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব কামাল উদ্দিন গ্রুপ।

অপরদিকে আওয়ামী লীগ তিন ধারায় বিভক্ত। একটি সদ্য সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনু, অন্যটি সাবেক সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক এডভোকেট সোহরাব উদ্দিন আরেকটি গ্রুপ বর্তমান সাংসদ ও আইজিপি নূর মোহাম্মদ কে ঘিরে।

এ দিকে আওয়ামী লীগের ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে হামলা মামলার কারণে আত্মগোপনে রয়েছেন কয়েকশো নেতা কর্মি।

গত ২২ জুলাই জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এডভোকেট মো. সোহরাব উদ্দিনকে আহ্বায়ক নির্বাচিত করে এক সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি বাতিলের দাবিতে কঠোর লকডাউন উপেক্ষা করে কয়েক দফা আন্দোলন করে পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ।

পরবর্তীতে গত ২৮ জুলাই জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এক চিঠির মাধ্যমে এডভোকেট মো. সোহরাব উদ্দিনকে পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

এর আলোকে গত ৯ সেপ্টেম্বর পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের ৬৭ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ।

কমিটিতে তিনজনকে যুগ্মআহ্বায়ক করা হয়েছে। তারা হলেন, বুরুদিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. মাহাবুবুর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি মো. সামছুদ্দোহা এবং জেলা যুবলীগের সদস্য, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক ভিপি মো. ফরিদ উদ্দিন।

কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম রেনু, উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইসচেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম ফজলুল হক বাচ্চু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট হুমায়ুন কবির, সাবেক প্রচার সম্পাদক মো. মতিউর রহমান মতি, সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. মুজিবুর রহমান, ডা. আবদুস সামাদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউনুস আলী রংগু মিয়া, পাটুয়াভাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান মো. শাহাবুদ্দিন, চন্ডিপাশা ইউপি চেয়ারম্যান মো. সামসুদ্দীন, নারান্দী ইউপি চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম, জেলা শ্রমিক লীগের উপদেষ্টা আতাউল্লাহ সিদ্দিক মাসুদ, মো. কেরামত আলী, মো. আবদুল মতালীব, মো. আজিজুল হক তোতা, মো. মজিবুর রহমান আকন্দ, মো. শাহাব উদ্দিন, ডা. মো. ইব্রাহিম, মো. এনামুল হক মন্টু, মো. মতিউর রহমান, মো. আকরাম হোসেন ভূঁইয়া কাঞ্চন, মো. রফিকুল ইসলাম রবি, মো. মোস্তফা কামাল আকন্দ, মো. আবদুস ছাত্তার, মো. আবদুল হাকিম, একেএম দিদারুল হক দিদার, মো. হাদিউল ইসলাম হাদী, মো. মকবুল হোসেন, মো. জসিম উদ্দিন সিকদার, আনোয়ার হোসেন স্বপন, মো. ফারুক হোসাইন, মো. চাঁন মিয়া, ফরহাদ হোসেন, এনামুল হক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বোরহান উদ্দিন, মো. শাহাব উদ্দিন, মো. নজরুল ইসলাম আকন্দ, চাঁন মিয়া, ফৌজিয়া জলিল ন্যান্সি, মো. জাহিদুল হক মিন্টু, অধ্যাপক ড. এম এ সাহিদ, মো. সিদ্দিকুর রহমান কবির, মো. আবদুল কাদির, মো. আবদুল মমিন, মো. মফিজ উদ্দিন মাষ্টার, মো. মোস্তাফিজুর রহমান, হাবিবা খাতুন, মো. আনোয়ার হোসেন আনার, মো. শাহাজাহান, এডভোকেট সুজিত কুমার দে, মো. সুরুজ মিয়া, মো. আক্তারুজ্জামান সোহেল, মো. মুছলে উদ্দিন, মো. বদরুজ্জামান গোলাপ, মো. তাজুল ইসলাম রংগু মিয়া, মোছা. তাহমিনা আক্তার রোজি, মো. রহমত উল্লাহ লাল মিয়া, মো. হামির উদ্দিন, মো. গোলাপ মিয়া, মো. ফজলুল হক ফিরোজ, মোহাম্মদ আলী, মো. আবদুল হাই, মো. হেলাল মাষ্টার এবং মো. জাকির হোসেন।

এই কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন উপজেলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনু ও স্থানীয় সাংসদ নূর মোহাম্মদ এর সমর্থকরা এবং সদ্য ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটি থেকে কয়েকজন সদস্য পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

অপরদিকে গত বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় পক্ষ বিপক্ষের দ্বন্দকে কেন্দ্র করে উপজেলার হর্শি বাজারে সংঘর্ষে দুই জন আহত হয়। এই মামলায় সুখিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সদ্য ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আজিজুল হক তুতাকে ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে আটক করে পুলিশ।

উভয় দলের গৃহ-বিবাদ নিরসন না হলে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌর এবং জাতীয় নির্বাচনে বিশাল প্রভাব পড়বে। অবশ্য দলের জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে দ্বন্দ্ব নিরসনে চেষ্টা করেও সফলতা আসেনি। এ আসনটিতে ১৯৯৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা এমপি নির্বাচিত হয়ে আসছেন। সে হিসাবে এই আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

বর্তমানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনু ও স্থানীয় সাংসদ নূর মোহাম্মদ এঁর অনুসারীরা দলীয় প্রোগ্রাম, বিভিন্ন অবকাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান করে জনগণের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন।

আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সোহরাব উদ্দিন দৃশ্যত কোনো প্রচারণা না চালালেও মোবাইল ফোনে ও বাড়িতে ডেকে এনে প্রচারণার কাজ চালাচ্ছেন। তাঁর পোগ্রাম থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলায় একাধিক নেতা কর্মি আহত হয়েছে এবং স্থানীয় সাংসদের একাধিক নেতা কর্মি হামলার স্বীকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

বর্তমান সাংসদ পাশ্ববর্তী উপজেলা কটিয়াদির বাসিন্দা হলেও পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতায়েম হোসেন স্বপন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেসবাহউদ্দিন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট হুমায়ুন কবির, উপজেলা কৃষকলীগের সাবেক সভাপতি বাবুল আহমেদ প্রমুখ সাংসদের অনুসারী।

বিএনপির দ্বন্দের বিষয়ে জালাল উদ্দীন বার্তা বাজারকে বলেন, ২০১৮ সালে উপজেলা ছাত্র দলের কমিটির নাম প্রস্তাব নিয়ে বিরোধে সদস্য সচিব কামাল উদ্দিন আমিসহ সিনিয়র নেতাদের সাথে অশোভন আচারণ করেছিল তার প্রতিবাদ করায় আজ পর্যন্ত আমার সাথে কোন যোগাযোগ নেই। আমরা উপজেলা বিএনপি ঐক্যবদ্ধ আছি।

উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব কামাল উদ্দিন বার্তা বাজারকে বলেন, কয়েক বছর আগে কে বা কারা আমার বিষয়ে আহ্বায়ক মহোদয়ের কাছে নালিশ দিয়েছিলেন আমি নাকি ওনাকে নিয়ে অশোভন কথা বলেছি তাহা সম্পুর্ণ মিথ্যা।

তারপর গত দুই বছর আগে আমাকে ( সদস্য সচিব) বাদ দিয়ে আহ্বায়ক জালাল উদ্দীন দলের প্রতিষ্ঠাতা বার্ষিকীর পোগ্রাম ঘোষণা করেন। তখন থেকে কিছুটা বিরোধ হলেও এখন দলের সিনিয়র নেতাদের কে নিয়ে নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনের দিনের জন্য প্রস্তোত হচ্ছি।

এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনু বার্তা বাজারকে বলেন, আমি কমিটি গঠনের বিরুদ্ধে নই। সদ্য ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটির কিছু বিতর্কিত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আমি ও বর্তমান সাংসদ সমর্থকরা। আমি আওয়ামী পরিবারের সন্তান। আজীবন আওয়ামী লীগ করে যাব।

এ ব্যাপারে সোহরাব উদ্দিন বার্তা বাজারকে বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি বৃহত্তর সংগঠন এখানে কিছু মত অনৈক্য থাকতে পারে। জেলা ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের পরামর্শ ও নির্দেশে আমি কাজ করে যাচ্ছি। আর নব ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটিতে উপজেলা ত্যাগী নেতাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে।

বার্তা বাজার/এস.আর

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর