১৫, আগস্ট, ২০১৮, বুধবার | | ৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯

ট্রাফিক সপ্তাহে রামগড় ও গুইমারাতে নেই দৃশ্যমান কোন কার্যক্রম

আপডেট: আগস্ট ৮, ২০১৮

ট্রাফিক সপ্তাহে রামগড় ও গুইমারাতে নেই দৃশ্যমান কোন কার্যক্রম

এম শাহীন আলম, খাগড়াছড়িঃ পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় সিএনজি পরিবহণে সেবার নামে চলছে নৈরাজ্য। অতিরিক্তি ভাড়া আদায়সহ যাত্রীদের সাথে দুর্বাবহার ও হয়রানী করা যেন চালকদের নিয়মিত রুটিনে পরিনত হয়েছে। এছাড়াও লাইসেন্স বিহীন অখ্যাত-কুখ্যাত ড্রাইভার দিয়ে চলছে এসব সিএসজি। সূত্রমতে, ৯০ শতাংশ গাড়িরই কোন কাগজপত্র নেই। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে মাসোহারা দিয়েই চলছে এর কার্যক্রম। দেশব্যাপী ছাত্র/ছাত্রীদের দাবীর মুখে সারাদেশে ট্রাফিক সপ্তাহ চললেও খাগড়াছড়িতে এর দৃশ্যমান কোন কার্যক্রম চোখে পড়েনি। লাইসেন্স বিহীন এসব সিএনজি অবাধে ঘুরে বেড়ালেও তা যনে দেখেও দেখছেনা পুলিশ। চলতি মাসে প্রায় সব ধরনের অবৈধ যানবাহনে মামলা হলেও অদ্যবদি কোন সিএনজি’কে পুলিশ মামলা দেয়নি এমন অভিযোগও রয়েছে।

রাজধানী ঢাকা থেকে জেলার প্রবেশ মুখ রামগড়-বারইয়ারহাট, রামগড়-জালিয়াপাড়া, জালিয়াপাড়া-মানিকছড়ি, মানিকছড়ি-হাটহাজারী, মানিকছড়ি-লক্ষীছড়ি, গুইমারা-মাটিরাঙ্গা, মাটিরাঙ্গা-তবলছড়ি, মাটিরাঙ্গা- খাগড়াছড়ি, খাগড়াছড়ি-পানছড়ি খাগড়াছড়ি-মহালছড়ি ও খাগড়াছড়ি-দীঘিনালার প্রায় সবক’টি সড়কে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এখন সিএনজি। এক সময় এসব সড়ক ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলের দখলে থাকলেও এখন সড়কগুলে ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে সিএনজি। সূত্রমতে, বর্তমানে খাগড়াছড়ির প্রায় সব’কটি উপজেলাতেই সিএনজি মালিক-শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে পুরো জেলায় অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার সিএনজি রয়েছে। এরমধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৩শতাধিক সিএনজির। এছাড়াও চালকদের মধ্যে প্রায় ৯০ভাগই লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ। যার কারেণ পাহাড়ী আকা-ঁবাঁকা রাস্তায় প্রায়শই সিএনজি দূর্ঘনার শিকার হচ্ছে। যাত্রীদের মতে, এর অন্যতম কারণ অদক্ষ চালক ও বেপরোয়া গতিতে চলাচল।

যাত্রীদের অভিযোগ, বছরে হিসেব করে ৩থেকে ৪বার ভাড়া বাড়ানো হয়। তাছাড়া বিভিন্ন উৎসবের নামে বে-হিসেবি চাঁদাবাজি তো আছেই। গত ৬মাস পূর্বে রামগড় থেকে বারইয়ারহাটের ভাড়া ছিলো ৬০টাকা যা বর্তমানে ৮০টাকায় রুপান্তরিত হয়েছে। রজব আলী, আমিনুল হক, গিয়াস উদ্দিন, আপ্রুসি মারমা’সহ বেশ কয়েকজন যাত্রীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, সিএনজি চালকরা যখন যেভাবে খুশি, তখন সেভাবেই ভাড়া বাড়িয়ে নেয়, আর ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবে এক প্রকার জোর করেই নির্ধারিত ভাড়ার চাইতেও দ্বিনগুন ভাড়া আদায় করে। কিছু বলতে গেলে চালকদের দুর্বাবহার শুনতে হয়।

তবে যাত্রী অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন একাধিক চালক। নাম প্রকাশ না করা শর্তে কয়েকজন সিএনজি চালক বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বাড়তি ভাড়া না নিয়ে কোন উপায় নেই, দৈনিক বিভিন্ন পৌরসভার টোল, সংগঠনের চাঁদা, কল্যান সংঘের চাঁদা এবং মাস শেষে থানা পুলিশকে মাসিক মোটা অংকের মাসোহারা, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনকে বাৎসরিক চাঁদা দিয়েই আমাদের রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হতে হয়, তা না হলে পুলিশ কর্তৃক বিভিন্ন হয়রানি মূলক মামলা খেতে হয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মালিক, চালক সমিতি, চালক কল্যান সমিতি, পৌর টোল এবং এক সমিতির গাড়ি অন্য সমিতির এরিয়ায় ভাড়া নিয়ে গেলে সেখানেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে গাড়ি ও চালকের লাইসেন্স না থাকায় কোন রকম হয়রানী বা মামলা না করার শর্তে খাগড়াছড়ির প্রতিটি থানার সাথেই সিএনজি চালকদের মাসিক একটা মাসোহারা ধার্য্য থাকে যা প্রতিটি চালককেই মাস শেষে সমিতির সভাপতি/সম্পাদকের মাধ্যমে গাড়ি প্রতি ৮শত টাকা হারে থানায় জন্য জমা দিতে হয়।

রামগড়ে অটোরিক্সা সিএনজি, চালক সমবায় সমিতির পক্ষে সভাপতি, মোঃ শাহজাহান ও লাইন সেক্রেটারী মোঃ জয়নাল আবেদিন, গুইমারাতে সিএনজি চালক ও মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ ফোরকান সেক্রেটারী মোঃ ওহাব মিয়া এবং মানিকছড়ি চালক সমবায় সমিতির পক্ষে সভাপতি মোঃ সাইফুল ইসলাম এসব টাকা সংগ্রহ করে প্রতিটি থানায় পৌঁছে দেয়।

এছাড়াও প্রতিদিন প্রত্যেকটি গাড়িকে সংগঠনের নামে ১০টাকা হারে প্রতি উপজেলায় চাঁদা দিতে হয় চালকদের। তবে এ টাকা দিয়ে দুর্ঘটনা কবলিত কোন গাড়ির মেরামত কিংবা কোন চালকের চিকিৎসার খরচে ব্যবহার করা না হলেও এর যথাযথ ব্যবহার কারা হয় বিভিন্ন সময়ে ডোনেশনের নামে সংগঠনের সভাপতি ও সেক্রেটারীসহ শ্রমিক নেতাদের কল্যানে। এতসবের পরও বছর শেষে পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে বাৎসরিক মোটা অংকের চাঁদাও পরিশোধ করতে হয় চালকদের।

এদিকে গত ৫ আগষ্ট থেকে দেশব্যাপী চলমান ট্রাফিক সপ্তাহ উপলক্ষ্যে সারাদেশে অবৈধ পরিবহন ও চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ট্রাফিক সপ্তাহের কোন কার্যক্রম দেখা যায়নি, (বিশেষ করে সিএনজি সেক্টরে)। এনিয়ে জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

গুইমারা, রামগড়, মাটিরাঙ্গা ও মানিকছড়ি থানা সূত্রে জানাযায়, গত ৩দিনে রামগড় থানায় ৯টি, গুইমারা থানায় ১০টি, মানিকছড়ি থানায় ১২টি এবং মাটিরাঙ্গা থানায় ৪৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার অধিকাংশই করা হয়েছে মোটরসাইকেলের হেলমেট কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার অপরাধে। তবে সিএনজি’র বিরুদ্ধে মানিকছড়ি থানায় ১টি, মাটিরাঙ্গা থানায় ৭টি মামলা করা হলেও কোন এক অদৃশ্য কারনে গুইমারা ও রামগড় থানায় লাইসেন্স বিহীন এসব সিএনজির বিরুদ্ধে কোন মামলা নেয়নি পুলিশ।

পুলিশ প্রশাসনে বিরুদ্ধে উঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রামগড় সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ মোঃ ফরহাদ জানান, রামগড় এবং গুইমারায় সব ধরণের যানবাহনের লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজপত্র চেক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমাদের উদ্দ্যেশ্য মামলা দেয় নয় বরং নিরাপদ সড়ক ও নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্যে।

সাধারণ যাত্রীদের দাবী, স্থানীয় থানা পুলিশ মাসোহারা গ্রহণ না করে লাইসেন্সবিহীন এসব সিএনজি ও চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সিএনজি পরিবহণে নৈরাজ্য ও যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকাংশেই হ্রাস পাবে। পাশাপশি সড়ক দূর্ঘটনা কমে আসবে।