সোনালী আঁশ পাট। দেশের অন্যতম অর্থকারী ফসল হিসাবেও পরিচিত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে পাটের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বিগত বছরগুলোতে আবহাওয়ার প্রতিকূল পরিবেশ আর উৎপাদন ছাড়া বাজার মূল্য কম থাকলেও এ বছর তা ভিন্ন। তাই এই পরিবেশ বিরাজ করলে দেশের এই প্রধান রফতানি শিল্প পাট ও পাটজাত দ্রব্য বিশ্ব বাজারে জোগান বাড়াতে পারে মনে করেন কৃষকরা।
বিগত বছরগুলোতে শ্রমিক খরচ আর দোকান মালিকের টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়ে কম টাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করতে বাধ্য হয় কৃষকরা। আর এতে এক দিতে লাভবান হন মধ্যসত্বভোগী ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে কৃষকরা সঠিক দাম না পেয়ে চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করেন। তবে এ বছর সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে পাট। আবারও পাটের সুদিন ফিরে আসছে। পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বাড়াতে ভোক্তাদের আগ্রহী করা হচ্ছে।
অপরদিকে পাট চাষে আগ্রহী করতে চাষিদেরকে সরকার থেকে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এবছর থেকে আবারও পাটের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন চাষিরা। মাঝখানে পাটের আবাদ কমলেও আবারও পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে চাষিদের। পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হলে পাটের আবাদ আরো বৃদ্ধি পাবে।
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা সাতক্ষীরা জেলা পাট চাষের জন্য বেশ উপযুক্ত। এ বছর জেলার সব উপজেলায় পাট চাষ হয়েছে। ফলন ও উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ কম হওয়ায় সঠিক সময়ে পাট বীজ বপন ও উৎপাদন করতে পেরেছেন কৃষকরা। তাছাড়া পরিমিত বৃষ্টিতে পাট জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়াতে সমস্যা হয়নি তাদের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে জানা গেছে, পাট উৎপাদন মৌসুম (বপন থেকে পাট কাটা) হচ্ছে ফাল্গুনের শেষ থেকে আষাঢ়ের শেষ পর্যন্ত। মোট চার ধরনের পাট রয়েছে: দেশী পাট, তোষা পাট, কেনাফ ও মেস্তা পাট। সাধারণত উঁচু ও মধ্যম উঁচু জমি, যেখানে বৃষ্টির পানি বেশি সময় দাঁড়ায় না এবং দো—আঁশ মাটি পাট চাষের জন্য বেশি উপযোগী। বৃষ্টিপাতের পরপরই আড়াআড়ি ৫—৭ টি চাষ দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। ঢেলা গুড়ো করে জমি আগাছামুক্ত করতে হয়। ভালোভাবে প্রস্তুতকৃত জমিতে বপনের ২—৩ সপ্তাহ আগে হেক্টরপ্রতি ৩.৫ টন গোবর সার মিশিয়ে দিতে হয়। বপনের দিন ১৫ কেজি ইউরিয়া, ১৭ কেজি টিএসপি ও ২২ কেজি এমওপি সার জমিতে প্রয়োগ করতে হয়।
বীজ বপনের ৬—৭ সপ্তাহ পর ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার ও চারা পাতলা করে হেক্টরপ্রতি ১০০ কেজি ইউরিয়া সার জমিতে পুনঃরায় ছিটিয়ে দিতে হয়।এছাড়া সময়মত পাটবীজ বপন করা উচিত। সাধারণত ছিটিয়েই পাটবীজ বপন করা হয়। তবে সারিতে বপন করলে পাটের ফলন বেশি হয়। সারিতে বুনলে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ৩০ সেমি বা এক ফুট এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৭—১০ সেমি বা ৩—৪ ইঞ্চি হতে হবে। বীজ বপনের ১৫—২১ দিনের মধ্যে ১ম নিড়ানী এবং ৩৫—৪২ দিনের মধ্যে ২য় নিড়ানী দিয়ে আগাছা দমন ও চারা পাতলা করতে হবে।
বিছাপোকা পাটের কচি ও বয়স্ক পাতা খেয়ে ফেলে। ঘোড়া পোকা ডগার দিকের কচি পাতা খেয়ে ফেলে। উড়চুঙ্গাঁ জমিতে গর্ত করে চারা গাছের গোড়া কেটে দেয়। চেলে পোকা কান্ডে ছিদ্র করে ফলে আঁশ ছিঁড়ে যায়। সাদা ও লাল মাকড় ডগার পাতার রস চুষে খায়, ফলে পাতা কুঁকড়ে যায়। তাই আক্রান্তের লক্ষণ দেখামাত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অথবা ইউনিয়ন বা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে।
কৃষি অফিস সূত্রে আরও জানা যায়, পূর্বের ন্যায় ডোবা—নালা না থাকায় কৃষক পাট পচাতে সমস্যার মুখে পড়ে। তাছাড়া মিষ্টি পানি ছাড়া পাটের আঁশ ছাড়ানো সম্ভব হয় না। সে কারণে লক্ষমাত্রা কমেছে। তবে উৎপাদন যথেষ্ট রয়েছে। এ বছর দেবহাটার লক্ষমাত্রা ছিল ৮০ হেক্টর। কিন্তু সেখানে ৫০ হেক্টর জমিতে পাট উৎপাদিত হয়েছে। যা হেক্টর প্রতি ১১ বেল পাট উৎপাদিত হয়েছে। উপজেলার সব জমির পাট ইতোমধ্যে কাটা ও জাঁক দেওয়া হয়েছে বলেও জানায় কৃষি বিভাগ। অনেকে পাটের আঁশ বিক্রি করেতে শুরু করেছে। পাটের আঁশ ২৬—২৮শ টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে।
পাট চাষি রব্বানী আলী দফাদার জানান, এবছর ২ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। ফলন খুবই ভালো হয়েছে। পাট বিক্রি শেষ। বিগত বছরে যেখানে পাটের আঁশ ১৫’শ টাকা মণ বিক্রি হত, সেখানে এবার ২৬৫০ থেকে শুরু করে সাড়ে ২৭’শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি। পাট চাষ করে বিগত দশ বছরেও এমন দাম পাইনি। সরকার এবার পাটের দাম বৃদ্ধি করায় আমরা অনেক খুশি। আশা এমন দাম পেলে আগামীতে আরো পাটের আবাদ বাড়বে।
পাট চাষি নিপু দাশ জানান, পাট বীজ বপন থেকে কাটা ও বিক্রি পর্যন্ত কৃষি বিভাগ আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি সরকারি বীজ ও সার পেয়ে আমরা খুব সহজে পাট চাষ করতে পেরেছি। এবছর পাটের দাম খুবই ভালো। পাটের পাশাপাশি পাট খড়ি ৬০/৭০ টাকা দরে আটি বিক্রি হচ্ছে। এমন দাম পেয়ে আমরা খুবই খুশি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ তিতুমীর জানান, পাট চাষের জন্য উষ্ণ জলবায়ু ও প্রচুর বৃষ্টিপাত দরকার হয়। ফাল্গুন ও চৈত্র মাস পাট বোনার উপযুক্ত সময়। এসময় কৃষকেরা পাট চাষে ব্যস্ত হয়ে পরে। শ্রাবণ—ভাদ্র মাসে পাট চাষিরা পাটগাছ কেটে ছোট ছোট করে আঁটি বাঁধে রাখে। আঁটিগুলো কিছুদিন পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় যাকে পাট জাগ দেয়া বলে। পাটের আঁশ পঁচে নরম হলে তা ছাড়ানো হয়। এরপর আঁশ ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। সেই আঁশকেই বলা হয় পাট। পাটের ভেতরের কাঠিকে পাটকাঠি বলা হয়। পাট থেকে রশি, সুতা, বস্তা, কাপড়, কার্পেট ইত্যাদি তৈরি করা হয়। পাটকাঠি জ্বালানি হিসেবে এবং বেড়া ও কাগজ তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। প্লাস্টিকের বস্তা ও পলিথিন ব্যাগ ব্যাবহারের পরিবর্তে পাটের তৈরী মোড়ক ব্যবহারে সরকার জোর দিয়েছেন। পাটের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে বহুগুণ এগিয়ে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করবে পাট শিল্প।
মীর খায়রুল আলম/বার্তা বাজার/এসজে