১৬, অক্টোবর, ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৫ সফর ১৪৪০

বাংলাদেশে ‘গণহত্যা’র প্রচারণায় এরা কারা?

আপডেট: আগস্ট ৮, ২০১৮

বাংলাদেশে ‘গণহত্যা’র প্রচারণায় এরা কারা?

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দুর্বৃত্তদের হামলা ও সংঘাতের সময় হত্যা ও ধর্ষণের গুজব ছড়ানো চক্রটি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা) হিসেবে অভিহিত করে এখনো প্রচারণা চালাচ্ছে। অনলাইনে গত শনিবার খোলা একটি পিটিশনে (https://www.change.org/ p/united-nations-we-want-justice-human-rights-violence-happened-in-bangladesh) গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সই করেছেন সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি।

‘Amrai Bangladesh’ (আমরাই বাংলাদেশ) নামে একজন ব্যক্তি/গোষ্ঠীর খোলা ওই অনলাইন পিটিশনে বাংলাদেশে গণহত্যা হচ্ছে উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো মানবাধিকার নেই। আমরা, এ দেশের নাগরিকরা, সারা বিশ্ব ও জাতিসংঘের কাছে ক্ষমতাসীন দলের এই গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই।’

পিটিশনে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ২০টি ছবি প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছে, ‘এখানে মানবাধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। আমরা, মানুষরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে আছি।’

ওই ২০টি ছবির ১৫টিই শিক্ষার্থী বিক্ষোভের। একটিতে ছাত্রদের ঝাড়ু হাতে রাস্তায় গাড়ির ভাঙা কাচ সরাতে দেখা যাচ্ছে। অপর চারটি ছবি রক্তাক্ত। সেগুলোকে গত কয়েক দিনে হত্যা, ধর্ষণ ও চোখ উপড়ানোর ছবি বলে দাবি করা হলেও সেগুলোর সত্যতা মিলেনি। তবে সেই ছবিগুলোই ব্যবহার করে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ শিরোনামে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশ ও ছাত্রলীগ নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরতদের ওপর অস্ত্র, টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে নির্যাতন করেছে। ছাত্রদের নির্মমভাবে নির্যাতন ও ছাত্রীদের ধর্ষণ করা হয়েছে উল্লেখ করে পিটিশনে দাবি করা হয়েছে, সব প্রমাণ (যেমন সরাসরি ভিডিও) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে একেক করে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।

এদিকে ‘এনলিস্ট বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অ্যাজ অ্যা টেররিস্ট অর্গানাইজেশন’ নামে আরেকটি পিটিশনে (https://www.change.org/p/united-nations-enlist-bangladesh-chhatra-league-bcl-as-a-terrorist-organization) ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়ে পিটিশন খুলেছে ‘জেনারেল পিপল অব বাংলাদেশ’ নামে একটি গোষ্ঠী। জাতিসংঘ, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, ইন্টারপোল, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস, হাউস অব কমন্স ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে আবেদন জানিয়ে খোলা ওই পিটিশনটি মাত্র তিন দিনে এক লাখ ৩৬ হাজারেরও বেশি ভোট সংগ্রহ করেছে।

পিটিশনে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, হত্যা-ধর্ষণসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করা হয়েছে। পিটিশনে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও রয়েছে। ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার পক্ষে করা আবেদনে সই করা কানাডাপ্রবাসী মাহিনুর রহমান খান লিখেছেন, তিনি বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারকে অযোগ্য মনে করেন। তাই তিনি সরকার পরিবর্তন চান।

গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত “বিদেশিদের কাছে এ কেমন বার্তা! বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ বলে প্রচার, সিরিয়ার সঙ্গে তুলনা” শীর্ষক প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন ব্যবহার করে চলমান পরিস্থিতিতে অজ্ঞাত চক্রের প্রচারণার বিষয়টি উঠে আসে। ফেসবুক পেজে সেই প্রতিবেদনটি নিয়েও সংঘবদ্ধ তৎপরতা চালায় ওই চক্র। সেখানেও ওই চক্র এ দেশে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে তাদের ছড়ানো হত্যা ও ধর্ষণের গুজব প্রকাশ না করার বিষয়টি তুলে ধরে বিষোদ্গার করে। বিদেশি হস্তক্ষেপেরও তারা দাবি জানায়।

সরকার এরই মধ্যে অভিযোগ করেছে, বিরোধী দলগুলো নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। গণহত্যার অভিযোগ তুলে অনলাইনে সংঘবদ্ধ প্রচারণা চালানো ব্যক্তিদের ফেসবুক ও টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে জানা যায়, তাদের বেশির ভাগই একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী। বেশ আগে থেকেই তারা এমন প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তবে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে এটি বিশেষ মাত্রা পেয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ২০১৩ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাতে হতাহতের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করে নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট, সংক্ষেপে আইসিসি) দ্বারস্থ হয়েছিল প্রবাসী বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। তবে সেই আদালতের প্রসিকিউটর ২০১৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দিয়ে জানান, এ ধরনের অভিযোগের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও ২০১৩ সালে সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলেছিলেন। প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অভিযোগ দায়ের করার পর আইসিসি তা আমলেও নিয়েছিল। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেনি আইসিসি।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউ ইয়র্ক থেকে বার্তা সংস্থা এনা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে অন্তত ১৭ জনের বিরুদ্ধে আইসিসিতে অভিযোগ দায়ের এবং আদালত কর্তৃক ওই অভিযোগের প্রাপ্তি স্বীকারের খবর দেয়। আইসিসির প্রসিকিউশন অফিসের তথ্য ও সাক্ষ্য ইউনিটের প্রধান এমপি ডিলন স্বাক্ষরিত (স্মারক নম্বর ওটিপি-সিআর-২৩৩/১৩) প্রাপ্তি স্বীকার করা পত্রে জানানো হয়, ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই তাঁরা নিউ ইয়র্কের মোহাম্মদ এ কাইয়ুম চৌধুরীর (নিউ ইয়র্কে বিএনপির সংগঠক) দায়ের করা অভিযোগসংক্রান্ত আবেদনটি নথিভুক্ত করেছেন।

তবে ২০১৬ সালের ২৫ মে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত-বিএনপির মিথ্যা অভিযোগ আইসিসিতে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে ২০১৩ সাল থেকে জামায়াত-বিএনপি চক্র বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ করে আসছে। ওই আদালতের প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা সম্প্রতি এক চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন যে এসব অভিযোগের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।’