বরিশালে হরিণের চামড়া-মাংস পাচার: ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা
বরিশালের হরিণের খামার থেকে গোপনে মাংস বিক্রির সময় আটক খামারের মালিক ও এনজিও আলোশিখা রাজিহার সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্রর নির্বাহী পরিচালক জেমস্ মৃদুল হালদারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাসহ ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড দিয়েছেন মোবাইল কোর্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবুল হাশেম।
এসময় ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী সুনীল হালদার ও খোকন সরকারকে ৫ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। জব্দকৃত ৩৭ কেজি হরিণের মাংস আগুনে পুড়িয়ে মাটি চাপা দেওয়া হয় এবং উদ্ধারকৃত মধ্যে ৬ টি হরিণের চামড়ার মধ্যে ১ কাঁচা চামড়া আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করে বাকী ৫টি চামড়া খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক মো. আবুল হাশেম জানান, বুধবার ( ৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তিনি ঘটনাস্থল এনজিও আলোশিখায় গিয়ে বন সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২এর ৬ এর ১ ও ১০ ধারায় এনজিও পরিচালক ও খামারের মালিক জেমস মৃদুল হালদারকে উপরোল্লিখিত আইন লংঘন করে দোষী সাব্যস্ত করে ২মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করছে।
একই আদালত অভিযুক্ত মৃদুল হালদারের কর্মচারী সুনীল চন্দ্র হালদার ও খোকন সরকারকে ৫হাজার টাকা করে জরিমানা করেছে। ওই আদালত অপর কর্মচারী বিপ্লব সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস প্রদান করে উদ্ধারকৃত ৬টি হরিণের চামড়া উপজেলা বনায়ন অফিসার মনীন্দ্র নাথ রায়ের জিম্মায় রাখার রায় প্রদান করেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, দু বছর আগে ওই খামারে প্রজনন সক্ষমতার ২৮টি হরিণ ছিল। এর মধ্যে খামারের মালিক মৃদুল হালদার বরিশাল জেলা প্রশাসককে ২টি এবং বিভিন্ন জনকে ৬টি হরিণ দানকরাসহ মোট ৮টি হরিণ কাগজে কলমে দান করা দেখিয়েছেন। ওই দানের পরেও প্রজনন ক্ষমতা সম্পন্ন ২০টি হরিণ থেকে কতটি হরিণ সাবক জন্ম হয়েছে এবং বর্তমানে কতটি বাচ্চা খামারে রয়েছে অজ্ঞাত কারনে তার কোন হিসাব নেই।
এ দিকে দন্ডপ্রাপ্ত এনজিও পরিচালক জেমস মৃদুল হালদারের বিরুদ্ধে এনজিওর নামে দাতা দেশগুলোর অর্থ আত্মসাৎ, নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে এনজিও পরিচালনা পর্ষদ গঠন, অর্থ পাচার ও মা, ভাই-বোনদের সাথে জমি ও অর্থ নিয়ে প্রতারণা ও স্বাক্ষর জাঁলিয়াতির বিস্তর অভিযোগ সামনে এসেছে। মৃদুলের প্রতারনার অভিযোগে মৃদুলের মা ও ভাই বোনেরা ইতোমধ্যেই আদালতের শরনাপন্ন হয়েছে। জেমস মৃদুলের নেতিবাচক কর্মকান্ড দুদকের অনুসন্ধানের দাবিও করেছেন তার পরিবার সমস্যরা।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খামারের মালিক জেমস মৃদুল হালদার অন্তত এক যুগ আগে নিজ বাড়িতে হরিণের খামার গড়ে তোলেন। মৃদুল তার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অবৈধভাবে খামার থেকে হরিণ জবাই করে সেই মাংসে অতিথিদের আপ্যায়িত করার অভিযোগ রয়েছে।
ওই খামার থেকে ইতোপূর্বেও রাতের আধারে গোপনে বিভিন্ন সময়ে সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আবার অনেক সময় কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে হরিণের মাংস ও চামড়া বিক্রি করাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে হরিণ বিক্রি করলেও তা খাতা কলমে বিভিন্ন ব্যক্তিকে দান করা করা হয়েছে দেখিয়ে সরকারের বিপুল পরিমান রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছিল।
থানা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাজহারুল ইসলাম জানান, উপজেলার রাজিহার গ্রামের প্রতিষ্ঠিত এনজিও ‘‘আলোশিখা রাজিহার সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র’’র অভ্যন্তরে হরিণের খামার থেকে কর্তৃপক্ষের কোন অনুমতি ছাড়া গোপনে হরিণ জবাই করে সেই মাংস বিক্রির সময় মঙ্গলবার রাত সাড়ে দশটার দিকে স্থানীয় জনগনের হাতে ধরা পরে ওই খামারের কর্মচারী মো. হায়দার।
স্থানীয়রা হরিণের মাংসসহ আটক করে পুলিশে খবর দেয়া হলে কৌশলে হায়দার পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে এনজিওর মালিক মৃদুল হালদারের দেয়া তথ্য মতে ওই এনজিও’র ফ্রিজ থেকে ৩৭ কেজি হরিণের মাংস ও ছাদের স্টোর রুম থেকে ৬টি হরিণের চামড়া উদ্ধার করে।
আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. গোলাম ছরোয়ার অভিযানের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এ ঘটনায় রাজিহার গ্রামের মৃত স্যামুয়েল হালদারের ছেলে ও হরিণ খামারের মালিক ওই এনজিও’র নির্বাহী পরিচালক জেমস মৃদুল হালদার (৪৮), তার কর্মচারী একই উপজেলার আহুতি বাটরা গ্রামের রাম চন্দ্র হালদারের ছেল সুনীল চন্দ্র হালদার (৫৫), রাজিহার গ্রামের মৃত চৈতণ্য সরকারের ছেলে খোকন সরকার (৩৮) ও ডাসার থানার নবগ্রামের মৃত অজিত সরকারের ছেলে বিপ্লব সরকারকে (৩৫)কে আটক করা হয়। ঘটনার সাথে জড়িত কর্মচারী হায়দার পুলিশ যাবার আগেই পালিয়ে যায়।
থানা অফিসার ইনচার্জ মো. গোলাম ছরোয়ার আরও জানান, ভ্রাম্যমান আদালতে দন্ডিত জেমস মৃদুল হালদারকে বুধবার বিকেলে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।
আরিফন রিয়াদ/বার্তা বাজার/টি