আবিদ ইসলাম। ৯ম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্র। চার ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সে। করোনা কালীন সময়ে ঝুঁকি জেনেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছে শিশুটি।
পরিবারের খরচ মেটাতে এ বয়সেই অটোরিকশা হ্যান্ডেল হাতে তুলে নিয়েছেন আবিদ। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় পরিবারকে সহযোগিতা করছে ওই কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থী।
কেন তুমি অটোরিকশা চালাচ্ছো জানতে চাইলে সে বলে, এক বছর হয় বাবা মারা গেছেন। সংসারে বাবাই ছিলো একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবা মৃত্যুর আগে কিছু ঋণ করে সেগুলো পরিশোধ করতে পারেননি। এদিকে আমার বড় বোন মোহনা আক্তার এর বিয়ের বয়স দুই বছর হয়েছে। তার স্বামী টাকা ও বিভিন্ন জিনিপত্র চেয়েছে আমাদের কাছে।
কিন্তু বাবা মারা যাওয়ায় তা দিতে না পারায় আমার বোনের সংসার ভেঙ্গে যায়। পরে বোন এক বছরের মেয়েকে নিয়ে চলে আসে আমাদে সংসারে। বর্তমানে বাবার ঋণের বোঝা ও পরিবারের ৬ সদস্যের দায়িত্ব এখন আমার কাঁদে। আমার ছোট ভাইটি বাক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। প্রতিদিন আটোরিকশা চালিয়ে ৭০০ টাকার মতো উপার্জন করি এর মধ্যে ৪০০ টাকা রিকশা মালিককে জমা দিয়ে আমার থাকে ৩০০ টাকা এতে আমাদের অভাবের সংসার ঠিক ভাবে চলে না।
আবিদ কেরানীগঞ্জ উপজেলার শুভাঢ্যা পশ্চিম পাড়া এলাকার মৃত মজিবর রহমানের ছেলে। সে পাশের এলাকার শুভাঢ্যা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির মানবিক শাখার ছাত্র।
আবিদ বলে, করোনায় স্কুল বন্ধ। কী করব, পড়াশোনাও নেই। আমার বন্ধুরা মোবাইলে অনলাইন ক্লাস করে। কিন্তু আমি ক্লাস করতে পারি না। করোনার কারণে সহপাঠীদের বাড়িতে যাওয়া যায় না। আমি পড়াশোনা করতে চাই। যদি সুযোগ পাই তাহলে পড়াশোনা করবো।
উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে অহরহ খোঁজ মেলে এমন শিশুর। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে শিশু শ্রম বাড়ার পাশাপাশি স্কুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। স্থানীয় অটোরিকশা চালকদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রত্যেক শিশু প্রথমে অটোরিকশা খেলার হাতেখড়ি হয় তাদের। আমাদের মতো নিম্ন আয়ের সন্তানরা বেশির ভাগ সংসারের আর্থিক সংকট দূর করতে নিরুপায় হয়ে এমন কাজ করাতে বাধ্য হয়।
অটোরিকশা চালকরা আরও বলেন, এটা করোনাকালীন সময়। ওরা ঘরবন্ধি। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় পড়াশোনার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এতে শিক্ষার্থীরা অকালে ঝরে পড়ছে। অনলাইন ক্লাসের নামে ক্ষুদে ছাত্ররা মোবাইলে নানা ধরনের গেইমে আসক্ত হচ্ছে। এছাড়া এমন অনেক হতদরিদ্র পরিবার আছে, যেখানে শিশু শিক্ষার্থীরা সংসারের খরচ চালাতে ভাড়ায় আটোরিকশা চালায় বা অন্যান্য কাজকর্ম করে।
শুধু আবিদ নয়। তার মতো নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা করোনাকালে পড়াশোনা থেকে দূরে গিয়ে পরিবারের অর্থের জোগান দিচ্ছে নানা ধরনের কাজ করে। কেরানীগঞ্জ উপজেলার, হাসনাবাদ, আব্দুল্লাহপুর, কদমতলী, জিনজিরা, আটি বাজার রুহিতপুরসহ বিভিন্ন ছোট-বড় হাটবাজার ঘুরে দেখা যায় সড়কে অহরহ কম বয়সের শিশুরা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও আটোরিকশা চালাচ্ছে।
বেশি গতিতে গাড়ি চালিয়ে ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে দেখা গেছে শিশু চালক-যাত্রীদের। অনেক অভিভাবক আজকাল নিজেই ইজিবাইক অথবা আটোরিকশার চাবি তুলে দিচ্ছেন তার সন্তানদের হাতে।
এ বিষয়ে শুভাঢ্যা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম হোসেন সোহেল বলেন, আবিদের রিকশা চালানোর বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আমাদের স্কুল থেকে আমারা আবিদকে সর্বোচ্চ সহযোগীতা করবো। এই ধরণের শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক অথবা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে পড়ালেখার পাশাপাশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সরকার।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. ইসমাইল বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এদের জন্য আমাদের সমাজের সকল স্থরের লোকেরই দায়িত্ব রয়েছে। আবিদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যই কিছু করার চেস্ট করবো। এখন তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু হলে। আবিদ যে স্কুলে পড়ে সে স্কুলের পূর্বের বকেয়ে সকল মওকুফ করবো এবং নতুন করে তাকে আর টাকা দিয়ে পড়তে হবে না।
পাশাপাশি যেহেতু মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশ মেয়ে ও ১০ শতাংশ ছেলে উপবৃত্তি পেয়ে থাকে। যদি সে পাওয়ার উপযোগী হয়, তাহলে তাকেও পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিব।
এছাড়া উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে তার পরিবারকে সহযোগীতার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আমি নিজে আবিদের সাথে কথা বলে তাকে বিদ্যালয় মুখী করার চেষ্টা করবো। এসময় তিনি আবিদকে ব্যক্তিগত ভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
রানা আহমেদ/বার্তা বাজার/টি