ফেনীতে বেড়ে যাওয়া নারী ও শিশু ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধে ১৪ দফা দাবি উত্থাপন করে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা ও স্মারক লিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেছে ফেনীর সচেতন নাগরিক সমাজ।
রবিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ফেনীর কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার চত্বরে ফেনীর সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে ১৪ দফা দাবির সমর্থনে কর্মসূচির সমন্বয়ক বখতেয়ার মুন্নার সঞ্চলনায় ফেনীর সকল জনপ্রতিনিধির পক্ষে বক্তব্য রাখেন, ফেনী সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ কে শহীদ উল্লাহ্ খোন্দকার, জাতীয় মহিলা সংস্থার ফেনী জেলা শাখা চেয়ারম্যান খাদিজা খানম রুনা, ফেনী জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোসাদ্দেক আলী, চাড়িপুর হাফেজিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা কাউসার হামিদ, ফেনী প্রেসক্লাব সভাপতি শওকত মাহমুদ, ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এনামুল হক পাটোয়ারি, ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পারভেজুল ইসলাম হাজারী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ফেনী জেলা শাখা সভাপতি সমর দেব নাথ ও সামাজিক সংগঠক মঞ্জিলা মিমি প্রমুখ।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় বক্তারা বলেন, দেশ আজ অভূতপূর্ব উন্নয়নের মহাসড়কে চলমান। সারাদেশে অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন ও প্রযুক্তিতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে অগ্রসরমান। ফেনীও আজ সারাদেশের ন্যায় উন্নয়নের উজ্জল সাক্ষ্য দিচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফেনীতে নারী ও শিশু ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগ জনক হারে বেড়ে চলেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীরা নিবাপদ নয়। এ বিষয়ে ফেনীবাসি আজ চরমভাবে উদ্বিগ্ন ও আতংক গ্রস্থ।
ফেনীতে সাম্প্রতিক সময়ে সোনাগাজীর চর লক্ষীগঞ্জ হাফেজ সামছুল হক (রা:) মাদ্রাসায় শিক্ষক কর্তৃক দশ বছরের মাদ্রাসা ছাত্র আরাফাত বলৎকার ও হত্যার শিকার, বগাদানার পাইকপাড়ায় গৃহ শিক্ষকের সাথে ছাত্রীর প্রেমের ঘটনা নিয়ে লংকা কান্ড, দাগনভূঞায় বারাহি গোবিন্দ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক শিশু শিক্ষার্থী ধর্ষণ, ফুলগাজীতে এক গৃহবধূ ও তার শিশূ কন্যাকে জীবন্ত সাপ গলায় পেঁচিয়ে অপচিৎিসা ও অমানুষিক নির্যাতনসহ চলমান ঘটনাগুলো ফেনীর সাধারণ মানুষকে আতংকিত ও ভাবিয়ে তুলেছে।
বক্তারা বলেন, দাগনভূঞায় বারাহি গোবিন্দ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই ধর্ষক শিক্ষক এক মাসের মাথায় জামিনে ছাড়া পেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ গরীব পরিবারটিকে সমঝোতার জন্য চাপের বিষয়টি ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর নজরে আসায় তিনি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারটির মানবিক ও আইনি সহায়তায় পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটা পাশে দাঁড়ানোর একটি ঘটনা মাত্র। আমরা বলতে চাই-এমন অসংখ্য ধর্ষক ও নারী ও শিশু নির্যাতনকারি জামিন পেয়ে ভিকটিম ও সাক্ষীদের হুমকি প্রদানের ঘটনাও ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর ভোগান্তি. হয়রানী, হুমকিতে পাশে কেউ নেই। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ফেনী জেলায় ২৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ৫৬টি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ফেনীর সুনাম রক্ষায় এখনই গণ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন শেষে দুপুরে নারী ও শিশু ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংসতা রোধের ১৪ দফা দাবি বাস্তবায়নে ফেনী জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসানের নিকট স্মারনক লিপি প্রদান করেন সচেতন নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দরা।
উত্থাপিত দাবিগুলো হলো:
০১.সরকারের জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাগণ ফেনীর মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অনুপোস্থিতে শিক্ষার্থীদের সাথে যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিষয় আলোচনা পূর্বক সরকারী মোবাইল ফোন নাম্বার বিতরণ।
০২. একই রূপ আবাসিক (হোস্টেল) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পদক্ষেপ গ্রহণ।
০৩. আবাসিক ও অনাবাসিক সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংসতার অভিযোগ জানাতে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি গোচরে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) সরকারী নাম্বার সম্বলিত ব্যানার/বিলবোর্ড প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতা মূলক ও নিশ্চিত করণ।
০৪. প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় আবাসিক ও অনাবাসিক সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কক্ষ ও হোস্টেলের প্রাইভেসি রক্ষা করে বাধ্যতা মূলক সিসি ক্যামেরায় আওতায় নেয় নিশ্চিত করণ
০৬. প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের মাদরাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হোস্টেল সুপারকে হোস্টেলে পরিবারসহ থাকা বাধ্যতা মূলক করণ
০৭. প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের মাদরাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হোস্টেল সুপারগণ ব্যতিত হোস্টেলে অন্য কারও প্রবেশাধিকার বা রাত্রি যাপনে নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করণ
০৮. প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের মাদরাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের আবাসিক ও একা কক্ষে ডেকে নেয়ায় নিষেধাঞ্জা আরোপ ও নিশ্চত করণ
০৯. উপরোক্ত ০৮টি (আট) দাবি জেলা ও উপজেলা আইন শৃংখলা কমিটির সভায় অনুমোদন নিশ্চিত করণ
১০. নারী ও শিশু ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে ভোগান্তি, হয়রানী বন্ধ করণ ও হয়রানীকারি কর্মকর্তার বিরূদ্ধে বিভাগীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করণ
১১. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তাকে ভিকটিমের জবানবন্দি ও গুরুর্ত্বপর্ন সাক্ষীর সাক্ষ্য আদালতে ২২ ধারা রেকর্ড নিশ্চিত করণ।
১২. ফেনীর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ত্বতাবধায়কে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মেডিকেল রিপোর্ট প্রদানের দীর্ঘসূত্রিতা বন্ধে কার্যকর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করণ
১৩. আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার বিচার কার্যে দীর্ঘ সূত্রিতা, ভোগান্তি, হয়রানী বন্ধে বিচার বিভাগের কার্যকর যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করণ
১৪. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার সাক্ষীদের জন্য সাক্ষী সুরক্ষা আইন কার্যকর করণ।
বার্তা বাজার/এমকে