সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী
আজ রোববার (৫ সেপ্টেম্বর) সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য এম সাইফুর রহমানের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খড়িয়াল খা নামক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর গ্রামের বাড়ী মৌলভীবাজার,সিলেট মহানগর বিএনপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপি স্মরণ সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। এ ছাড়া মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বাণীতে বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এম সাইফুর রহমানের কৃতিত্ব সর্বজনবিদিত। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, এম সাইফুর রহমান একজন প্রাজ্ঞ ও কীর্তিমান অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। তাঁর দক্ষ রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভূত সুনাম অর্জন করে। তিনি স্বদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম পথিকৃত। স্বাধীনচেতা, স্পষ্টভাষী, অটুট মনোবল এবং ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি ছিলেন সবার নিকট অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি।
বিএনপির মহাসচিব আরও বলেন, জিয়াউর রহমানের সহকর্মী হিসেবে দেশের দুর্যোগের সময় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে এম সাইফুর রহমান দেশকে কেবলমাত্র অর্থনৈতিকভাবেই স্বাবলম্বী করেননি বরং স্বদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকারে বিএনপিকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। জাতীয়তাবাদী দর্শনকে বুকে ধারণ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারের কবল থেকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণে এম সাইফুর রহমানের অবদান দেশবাসী ও দল চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
এম সাইফুর রহমান বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সর্বোচ্চ ১২ বার বার্ষিক অর্থ বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। যিনি সর্বোচ্চ সময়কালীন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী। ২০০৫ সালে ভাষা আন্দোলনে তার অবদানের জন্য তাকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
সাইফুর রহমান ৬ অক্টোবর ১৯৩২ সালে তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার সদর উপজেলার বাহারমর্দন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আব্দুল বাছিত এবং মা তালেবুননেসা। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন সাইফুর রহমান।
সাইফুর মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুল থেকে লেখাপড়ার পর দি এইডেড হাই স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫১ সালে সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে আইএ পাস করে ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরে তিনি ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত লন্ডনে পড়াশুনা করেন এবং দি ইনস্টিটিউট অভ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস (আইসিএইডাব্লিউ) থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আর্থিক ও মুদ্রানীতি এবং উন্নয়ন অর্থনীতিতে বিশেষাযয়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন।
সাইফুর রহমান পেশায় একজন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট ছিলেন। ১৯৬২ সালে পেশাজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় বেতন কমিশনে প্রাইভেট সেক্টর হতে একমাত্র সদস্য মনোনীত হন। তিনি ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্যও ছিলেন।
তিনি ‘রহমান, রেহমান অ্যান্ড হক’ নামে একটি নিরীক্ষা ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন যা চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তার কৃতিত্বের স্মারক হয়ে আছে।
১৯৯৪ সালে তিনি স্পেনের মাদ্রিদে বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সুবর্ণ জয়ন্তী সম্মেলনের গভর্নর নির্বাচিত হন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ ও ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে তিনি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, আইএফএডিতে বাংলাদেশের গভর্নর ছিলেন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ মেয়াদে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।
সাইফুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন এবং সলিমুল্লাহ হল ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য তিনি গ্রেফতার হয়ে এক মাস কারাবরণ করেন। তার জাতীয় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার বাণিজ্য উপদেষ্টা হিসেবে।
১৯৭৭ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলে যোগ দেন যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে রূপান্তরিত হয়। তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন সিলেট-১৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী ও পরে আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে এরশাদ ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করলে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের প্রায় সব নেতার সাথে তিনি গ্রেফতার হন।
১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে সিলেট-৪ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১২ জুন ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে মৌলভীবাজার-৩ ও সিলেট-৪ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে তিনি সিলেট-১ ও মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন।
বাংলাদেশে মুক্ত বাজার সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রবর্তক হিসেবে সমধিক পরিচিত। তিনি সবচেয়ে বেশি সময়কাল ধরে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং মোট ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করেন।
সাইফুর রহমান ১৯৬০ সালে বেগম দূররে সামাদ রহমানকে বিয়ে করেন। তিনি তিন ছেলে ও এক কন্যা সন্তানের জনক। ২০০৩ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র এম নাসের রহমান মৌলভীবাজার-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।
ভাষা আন্দোলনে তার অবদানের জন্য ২০০৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন। অর্ডার ন্যাশন্যাল, সেনেগালের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের নিজ বাড়ি বাহারমর্দন থেকে ঢাকায় যাওয়ার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের খড়িয়ালা নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন।
সাবেক এই অর্থমন্ত্রীর ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এম সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রামের বাড়িতে কোরআন খতম, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
দিনটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- রোববার সকাল ১০টায় বাহারমর্দানে সাইফুর রহমানের কবর জিয়ারত ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। বেলা ১১টায় সাইফুর রহমানের কর্মময় ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ে স্মরণসভা। দুপুরের পর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও হতদরিদ্রদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হবে।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বেকসী মিছবাউর রহমান বলেন, জাতীয় ও সিলেট বিভাগীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন, সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জিকে গউস উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিএনপির নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
এছাড়াও বিকেল তিনটায় কেন্দ্রীয় বিএনপি ভার্চুয়াল স্মরণ সভার আয়োজন করেছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্য রাখবেন স্থায়ী কমিটির সদস্য বৃন্দ।
বার্তা বাজার/টি