১৯, ডিসেম্বর, ২০১৮, বুধবার | | ১০ রবিউস সানি ১৪৪০

সকালে এসে ফিটনেসের সিরিয়াল মিললো দুপুরে

আপডেট: আগস্ট ৭, ২০১৮

সকালে এসে ফিটনেসের সিরিয়াল মিললো দুপুরে

সকাল ৭টায় এসে দেখি লম্বা লাইন। মিরপুর কাফরুল থানা পেরিয়ে গেছে লাইন। তবুও কষ্ট হতো না। সিরিয়াল আগেই পেতাম। কিন্তু দালালদের অত্যাচারে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ফিটনেস পরীক্ষা ২ ঘণ্টার মধ্যে করে দিতে চায় দালালরা। সেজন্য দিতে হবে দুই হাজার টাকা। টাকা দেইনি বলেই সকাল ৭টায় এসেও সিরিয়াল মিললো দুপুর ২টায়। এখনও ফিটনেস পরীক্ষা শুরু হয়নি। সামনে আরও ৫০টি যানবাহন আছে।’

মিরপুর-১৩ নম্বরে অবস্থিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে এসে মঙ্গলবার দুপুর ২টায় এভাবেই নিজের ক্ষোভের কথা উগড়ে দিলেন প্রাইভেটকারের চালকের আসনে বসা আবুল হোসেন। রাজধানীর মতিঝিল থেকে এসেছেন তিনি প্রাইভেটকারের ফিটনেস পরীক্ষা করানোর জন্য।

আবুল হোসেন বলেন, এখানে দালালদের টাকা দিয়ে অনেকেই দ্রুত কাজ করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। টাকা না দিলেই বরং ভোগান্তি। ব্যাংকে ফি জমা দেয়ার ক্ষেত্রেও দালালদের অগ্রাধিকার। শুধু আবুল হোসেন নয়, হাজার হাজার মানুষের গন্তব্য যেন এখন মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়।

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারি নির্দেশনা ও পুলিশের ট্রাফিক সপ্তা্হ ঘোষণার পর বিআরটিএ অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি ও ফিটনেস সনদ আবেদনের হিড়িক পড়েছে।

যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, শিক্ষানবীস লাইসেন্স, লাইসেন্স, লাইসেন্স নবায়ন ও হারানো লাইসেন্সের ডুপ্লিকেট উত্তোলন, যানবাহনের ট্যাক্স পরিশোধ, যানবাহনের লাইসেন্স ও নবায়ন করতে এসে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। পদে পদে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে লাইসেন্স প্রত্যাশীদের। সেই সঙ্গে দৌরাত্ম্য বেড়েছে দালালচক্রেরও। দীর্ঘলাইন ও ভীড়ের কারণে একই দিনে সব প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। মঙ্গলবার দুপুরে বিআরটিএ সার্কেল-১ কার্যালয়, মিরপুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

অন্যদিকে বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, হঠাৎ করেই ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ ও গাড়ির লাইসেন্স আবেদনের হিড়িক পড়েছে কার্যালয়ে। দীর্ঘ লাইনের কারণে সময়ক্ষেপন হচ্ছে। সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বেশি হলেও কর্মকর্তাদের সংখ্যা বাড়েনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, গাড়ির কাগজপত্র তৈরি করতে বিআরটিএ এলাকাজুড়ে প্রধান সড়কগুলোতে লম্বা লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর বিআরটিএ অফিসে প্রবেশের সুযোগ মিলছে সেবাগ্রহীতাদের। যে কারণে মিরপুর-১০ থেকে কাফরুল থানা পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। পুরো কার্যালয় প্রাঙ্গণ ও প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি আর মানুষের বাড়তি চাপে ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। ভেতরে মোটরসাইকেলের লাইসেন্স ও ডিজিটাল নাম্বার প্লেটের জন্য ফর্ম নিতে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সেবাগ্রহীতাদের।

তবে সবচাইতে বড় ভোগান্তি ফি জমা নেয়া ব্যাংক কাউন্টারে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে টাকা জমা দিতে পারেনি। গাড়ির লাইসেন্স পাওয়ার অপেক্ষায় রোদে পুড়ে ঘণ্টার ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় লোকজনকে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সাধারণ সেবাগ্রহীতারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। সেবা নিতে আসা লোকজন অভিযোগ করেন, সাধারণ প্রক্রিয়ায় সেবা পেতে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে, অথচ দালালদের দিয়ে দ্রুত কাজ হয়ে যাচ্ছে।

নিশান এক্স১০ গাড়ি নিয়ে মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে এসেছেন ঢাকা মহানগর পুরাতন গাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদ আহমেদ কাঞ্চন। জাগি নিউজকে তিনি বলেন, সকালে এসেছি, ট্যাক্স জমা দেব আর ডিজিটাল নাম্বার প্লেট নেব। এজন্যই ৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।

শিক্ষানবীশ লাইসেন্স করতে এসেছেন সাংবাদিক, পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তাসহ হাজার হাজার মানুষ। শাওন নামে এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষানবীশ লাইসেন্স করতে এসেছি। দুপুর হয়ে গেছে এখনও ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে রশিদ নিতে পারিনি। টোকেন নিয়েই ফিরতে হবে। নইলে সড়কে ভোগান্তিতে পড়তে হবে।

কল্যাণপুর থেকে আসা সানাউল হক বলেন, একমাস আগে মোটরসাইকেল কিনেছি, লাইসেন্স করা হয়নি। কিন্তু ট্রাফিক সপ্তাহের মধ্যে পুলিশ খুব ঝামেলা করছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে গত কয়েক দিন রাস্তায় বেরই হতে পারিনি। আইনি ঝামেলা এড়াতে এসেছি লাইসেন্স করতে। কিন্তু দিন পার হয়ে গেলেও ব্যাংকের লাইন শেষ হচ্ছে না।

বিআরটিএর উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মাসুদ আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা চলছে। আগে সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকতো। সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রীর নির্দেশনায় এখন শনিবারও বিআরটিএ কার্যালয় খোলা থাকছে।’

তিনি বলেন, ‘আগে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস চলতো। এখন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সব বিভাগ খোলা রেখে গ্রাহকদের সেবা দেয়া হচ্ছে। তবে আমাদের কর্মঘণ্টা বাড়ালেও বাড়েনি জনবল। সাধ্যমত চেষ্টা করছি যাতে কেউ সেবা নিতে এসে ফিরে না যান।’