অস্তিত্ব সংকটে আদিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়!
প্রায় দুই থেকে আড়াইশো বছর পূর্বে মায়ানমার ও আরাকানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বনাঞ্চল কেটে বসতি গড়ে তোলেন এই রাখাইন সম্প্রদায়। সাগর উপকূলীয় নির্জন বনভূমিকে বাসযোগ্য করার একমাত্র কারিগর এ রাখাইনরাই।
শুধু তাই নয়-তৎকালীন সময় থেকে প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে মোকাবেলা করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সামাজিক ভাবে এদের বংশ বিস্তার ঘটে। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের দম্ভ, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা এবং মৌলিক চাহিদা না মেটাতে পারায় বিলুপ্তের পথে এই সম্প্রদায়। কগজপত্রে রাখাইন জনগোষ্ঠি নিয়ে নানা কর্মযজ্ঞ দেখা গেলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি।
জানা গেছে, ১৭৮৪ সালে নানা সংকটে ও জানমাল নিরাপত্তার জন্য আরাকান ও মায়ামার থেকে নৌপথে রাখাইনদের আগমন ঘটে পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলায়। তৎকালীন সময়ে এখানকার সাগর উপকূলীয় নির্জন ও ভয়াবহ বনাঞ্চল কেটে বাসযোগ্য করে তোলে এবং অনাবাদি জমিকে আবাদযোগ্য করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন তারা।
পাশাপাশি সাগরে মাছ এবং কুইচা, সাপসহ বন্য পশুপাখি শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করাই ছিল তাদের মূখ্য পেশা। তৎকালীন সময়ে ওই সকল এলাকা গুলোতে রাখাইন জনগোষ্ঠির বসবাস ছিল চোখে পড়ার মত। স্বদেশ ত্যাগ করলেও তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারা সচেষ্ট ছিল।
এখন রাঙ্গাবালীতে আনুমানিক শতাধিক রাখাইন পরিবার বসবাস করছে। কিন্তু ৯০ এর দশকে ছিল কয়েক গুন বেশী। যারা আছেন, তারাও মানবেতর জীবন-যাপন করছে। খাদ্য সংকটের পাশাপাশি নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে।
এমন কি মাতৃভাষা প্রসারের জন্য কোন ব্যবস্থা নাই কোন সরকারী অথবা বেসরকারী কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। পাশাপশি রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের জবরদখল। গত দুই দশকে মিথ্যা মামলা এবং জবর দখলে অন্তত দুই সহস্রাধিক রাখানই পরিবার ভিটে ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ভিটে-মাটি রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের যথেষ্ঠ উদাসিনতা রয়েছে বলে দাবী করেন রাখাইনরা। একারণে কেউ কেউ পারি দিয়েছেন আপন দেশ আরাকানে। যারা রয়েছে তারাও রয়েছে সাম্প্রদায়িক শংকায়। রাখাইনদের নামনুসারে রাঙ্গাবালী উপজেলার গংগিপাড়া, মনি পাড়া, ছাতিয়ান পাড়া, পুলাউপাড়া, মিদুপাড়া সহ অনেক এলাকার নাম রয়েছে। কিন্তু সে সকল এলাকা গুলোতে প্রভাবশালীদের দম্ভে অনেই আগেই তারা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয় প্রবীন ব্যাক্তিরা জানান, রাঙ্গাবালীর উপজেলার উত্তরীপাড়া, গঙ্গীপাড়া এলাকায় দলনেতা পোঅং, উঃ গুনগ্রী, অক্যে চৌধুরী গঙ্গী রাখাইন সহ কয়েকজন রাখাইনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে রাঙ্গাবালীর অরণ্য ভূমি আবাদি জমিতে পরিনত করেন। পর্যায়ক্রমে রাখাইন পরিবারে লোক সংখ্যা বেরে গেলে তারা নতুন জায়গার সন্ধানে বের হয়। উপজেলার দারচিরা নদীর পশ্চিম পারে বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের তুলাতলী, কাটাখালী, ফেলাবুনিয়া সহ বিভিন্ন এলাকা তাদের আবাস যোগ্য হিসেবে পছন্দ করে সেখানে বসতি স্থাপন করা হয়।
যা এখনও রাখাইন পাড়া হিসেবে পরিচিত। পরবর্তী প্রজন্ম অলাউ হাং, ধনঞ্জয় হাং, পুলাউ হাং, মচালা মাদবর, লাফ্রু চান সহ অনেক প্রভাবশালী রাখাইন, এলাকায় জমিদার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতি ছিল তাদের প্রধান বৈশিষ্ট। হারিয়ে যাওয়া রাখাইনদের সাথে হারিয়ে গেছে, রাখাইন সাংস্কৃতি পেগু নাচ, রঙ্গিন ফানুস উরানো সহ বিভিন্ন অয়োজন এবং জলকেলি।
পটুয়াখালীর অরণ্যভূমি আবাদি জমিতে পরিনত করে করেছিলেন এই রাখাইনরা। তাদের জমি-জমা আজ সংখ্যাগরিষ্টদের দখলে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বার বার ঘূর্ণিঝর ও সামুদ্রিক জলোচ্ছাসে অনেক পাড়া ধ্বংস হয়েছে, বহু রাখাইনের মৃত্যু হয়েছে, অনেকে ছেলে মেয়ে আত্মীয় স্বজন হারিয়েছে, ধন সম্পদের অপুরণীয় ক্ষতি হয়েছে। রাখাইন জনগোষ্ঠির মধ্য শিক্ষার হার কম থাকায় স্বার্থলোভী ভূমিদস্যু মহল তাদের জমি-জমা অন্যায় ভাবে দখল করে নিয়েছেন।
মিথ্যা মামলায় ঝড়িয়ে অনেক নিরিহ রাখাইনকে ভিটেবাড়ী ছেরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। যারা রয়েছে তারা কুঁচে আর কাকরা ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়। রাইনরা আগে তাতে শাড়ি কাপর, শীতের চাদর বুনতো তাও এখন বিলুপ্তির পথে। তারাও যে কোন সময় ভিটে ছারা হতে পারে বলে জানাগেছে।
রাঙ্গাবালী উপজেলার তুলাতলী রাখাইন পাড়ার বাসিন্দা মাতেন, মাচান, উচামং রাখাইনের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। ষ্পষ্ট বাংলা ভাষা বলতে না পারলেও বাংলা জানেন ওরা। কেমন আছে জানতে চাইলে চোহামং রাখাইন এ ভাবেই বললেন, “ ভাল নেই! কুচে কাকরা ধরে সংসার চালাইসে, পোলা মাইয়া স্কুলে জাইসে কলেজে জাইসে খরচা চালাইতে পারেনা কি করিবে।
৯৫ বছর বয়সী মংথাছি রাখাইন বলেন, ক্ষমতাসিনরা আমদের পাড়ার জমি রেকত (রেকর্ড) করিসে, আমাগো লোরাইতে চাইসে, আমরা কি আলের (হালের) গরু পিরাইয়া মারিসে নাকি এ্যা ”। হত দরিদ্র হলেও টিকে থাকার চেষ্টা করছে ঐ পাড়ার রাখাইন পরিবার গুলো।
সাইফুল ইসলাম সায়েম/বার্তা বাজার/টি