সাত বছরে কোটিপতি নেসকোর চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী!

সিরাজগঞ্জে আলাদিনের চেরাগ নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানী লিমিডেটের (নেসকোর) চতুর্থ শ্রেণীর এক কর্মচারীর হাতে। আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে ওই ব্যক্তির বিষয়ে। কর্মচারির দুর্নীতির অভিযোগ ইতিমধ্যে জমা পড়েছে নেসকোর বিভাগীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের টেবিলে। বিধিবাম তবুও থেমে নেই তার অপকর্ম।

সরেজমিন ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জে নেসকোর আওতাধীন বিভিন্ন স্থানের জায়গা থেকে প্রতি মাসে চাঁদা আদায়, আদালত পাড়ার নেসকোর জায়গা ব্যক্তি মালিকানায় স্থায়ী করে দেয়ার সুকৌশল, নেসকোর কলোনীর ভিতর ২৫০ প্রজাতির ফলজ গাছের ফল নাম মাত্র ইজারা মূল্যে ক্রয় ও বিদ্যুৎ বিতরণ এবং নতুন সংযোগের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ
করে মাত্র ৭ বছরে তিনি বনে গেছেন প্রায় ১০ কোটি টাকার অগাধ বিত্ত বৈভবের মালিক।আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি বিহীন সম্পদ অর্জনকারী এই ব্যক্তির নাম মো. আব্দুল মালেক (মুন্সি)।

তিনি একজন নিম্নবৃত পরিবারের সন্তান। ২০১৪ সালে চাকরিতে যোগদান দেয়ার পর দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ শহরের পৌর মহল্লার রতনগঞ্জে অর্ধকোটি টাকায় ৫ শতক জায়গা ক্রয় করে নির্মাণ করেছে বহুতল ভবন, শহরের বেপারীপাড়ায় ৪০ লক্ষ টাকা মূল্যের ৫ শতক জায়গা ক্রয় ও সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন এলাকার পাশ্ববর্তী হরিপুর গ্রামে ১ কোটি টাকা মূল্যে ২৪ শতক জায়গা ক্রয় করে স্থাপন করছে টুইস্টিং মিল। এরমধ্যে প্রশাসন ও এলাকাবাসীর চোখে ধুলো দিতে ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে ঋন নিয়েছেন বলে গুঞ্জন তুলেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের পৌর এলাকার মিরপুর হায়দার পাড়া গ্রামের মো. জব্বার আলী মুন্সির ছেলে আব্দুল মালেক মুন্সি ২০১৪ সালের পূর্বে পিডিবি কোলনী হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতো। এ বেতনে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হতো বলে ভালো বেতনে কাজ করার খোঁজ করতেন।

এক সময়ে তার নুন আনতে পান্তা ফুরালেও ওই মাদ্রাসাটি নয়-ছয় করে তার নাটকিয় উত্থান ঘটে। সেই সূত্রে লাইনম্যান সাহায্যকারি পদে চাকুরী বাগিয়ে নিয়ে সিরাজগঞ্জ নেসকো অফিসে দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকড় পোতেন তিনি।

এরপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়ার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে তার। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে শুধু বেড়েছে তার সম্পদ ও নগদ টাকা।

পৌর এলাকার রায়পুরেও রয়েছে তার টুইস্টিং মিল। যেটা তার ভাইকে দিয়ে দেখভাল করান বলে জানা যায়। শহরের কয়েকটি জায়গায় প্লট ও কেনা আছে বলে জানা গেছে। অল্পদিনের ব্যবধানে তার এ সম্পদ দেখে ‘থ’ বনে গেছেন স্থানীয়রা। সিরাজগঞ্জের একাধিক ব্যাংকে তার নিজের, স্ত্রী ও সন্তানদের নামে রয়েছে ফিক্সড ডিপোজিটসহ প্রায় কোটি টাকার হিসাব। রয়েছে কয়েক লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রও।

স্বল্প শিক্ষিত ওই ব্যক্তির সম্পদের পাহাড় দেখে সিরাজগঞ্জ নেসকো অফিসের কর্মচারিরা ও স্থানীয়দের সন্দেহ হলে নানাভাবে দপ্তরকে জানালেও তিনি আছেন বহালে। বৈধ কোনো আয়ের উৎস্য ছাড়া চোখ ছানাবড়া করার মতো সম্পদের মালিক আব্দুল মালেক মুন্সি যেন রয়েছেন বহাল তবিয়তে।

নাম প্রকাশ না শর্তে ওই অফিসের কয়েকজন কর্মচারি জানান, চলতি বছরের ২৬ জুন নাম মাত্র ভাইভার মাধ্যমে আব্দুল মালেক মুন্সির আপন শ্যালকসহ মোট ৮ জনকে চূড়ান্ত নিয়োগ দিয়েছে নেসকো। ওই নিয়োগে নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে যোগসাজশ করে আলাদিনের চেরাগ পাওয়া কর্মচারি মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রোববার সরেজমিন শহরের কালিবাড়ী গেলে দেখা যায়, বাজারে পাশে নেসকোর সম্পত্তিতে তিনটি দোকান রয়েছে। এসময় তারা বলেন এই দোকান গুলো তারা শামীম হোসেন এর নিকট হতে ভাড়া নিয়েছেন। পরে স্থানীয় শামীমের হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন নেসকো অফিসের আব্দুল মালেক মুন্সিকে প্রতি মাসে চাঁদা দেয়ার মাধ্যমে তিনি লিজ নিয়ে ভাড়া দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী নেসকো লিমিটেড এর প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশিদ বলেন, ওই কর্মচারির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি ইতিমধ্যে পাবনা সার্কেলকে পাঠানো হয়েছে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

পাবনা নেসকো লিমিটেডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমাকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আমি সিরাজগঞ্জ নেসকো নির্বাহী প্রকৌশলীকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।

এদিকে সিরাজগঞ্জ নেসকো লিমিটেডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী গোবিন্দ চন্দ্র সাহার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমি আব্দুল মালেক মুন্সির বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।

তবে কালিবাড়ির বাজারের পাশে নেসকোর সম্পত্তিতে স্থাপিত দোকান থেকে মাসিক চাঁদা নেয়া হয় কিনা সেটাও আমার জানা নেই। আর আদালত পাড়ায় নেসকোর যে জায়গাটা রয়েছে সেটির কাগজপত্র আমাদের থাকা শর্তেও সেখানে যেতে পারছিনা। কে নাকি আদালতের মাধ্যমে জায়গার মালিক হয়েছে।

এসব ব্যাপারে জানতে আব্দুল মালেক মুন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সে তার বেতনের টাকা দিয়েই এতোকিছু করেছেন। তবে শহরের কালিবাড়ী বাজারের পাশে নেসকোর জায়গায় নির্মিত তিনটি দোকান থেকে প্রতি মাসে চাঁদা নেয়ার কথাটি স্বীকার করেন।

এম এ মালেক/বার্তা বাজার/টি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর