মধুমতি নদীর হিংস্র থাবা থেকে ‘বাবা-মার কবরটা আর রক্ষা করতে পারলাম না’ এভাবেই নিজের মনের কষ্টের কথা বার্তা বাজারকে বললেন ইকবাল শেখ (৫২)। বাবা-মার কবরকে স্মৃতি হিসেবে আগলে রেখেছিলেন তিনি। তবে, সেই স্মৃতি এখন মধুমতি নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার পাঁচুড়িয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ চরনারানদিয়া গ্রামের নদী ভাঙনের শিকার ইকবাল শেখ বলেন, ‘গত ১০ বছর আগে তার মা মারা গেলে বাড়ির পাশে কবর দেন। এরপর ৪ বছর আগে তার বাবা ইদ্রিস শেখ মারা গেলে তাকেও তার মায়ের পাশে কবর দেন।
সেই সময় নদী ছিলো অনেক দূরে। কিন্তু এবছর নদী একদম বাড়ির নিকটে চলে আসছে। ইতোমধ্যে তার বাবা-মার কবরের অর্ধেক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে বাড়ির সবকিছু নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন তারা।
ইকবাল শেখের স্ত্রী সালমা বেগম জানান, ‘নদীতে তাদের আবাদি জমি বিলীন হয়ে গেছে। বাড়ীর জমিও বিলীনের পথে। তবে সবকিছু চলে গেলেও তার স্বামীর দুঃখ ছিলো না। বাবা-মার কবরটা চলে যাওয়ায় বেশি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছেন তার স্বামী। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আর সারাক্ষণ শুধু বাবা-মার কবরের কথা বলে কান্নাকাটি করছেন।’
ওই গ্রামের কৃষক রহমান মোল্যা জানান, ‘তিনি কৃষি কাজ করে জীবিকানির্বাহ করেন। গতবছর নদীতে তার বাড়িটি বিলীন হয়ে যায়। সেই শোকে তার স্ত্রী মরিয়াম বেগম স্ট্রোক করেন। এরপর নতুন করে পুণরায় বাড়ি নির্মাণ করেন। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতে এবারও বাড়িটি নদীগর্ভে বিলীনের পথে। ইতোমধ্যে বাড়ির সবকিছু অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে গেছেন।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙন ঝুঁকিতে গত এক সপ্তাহে ওই গ্রামের ফরিদ মৃধা, ইমদাদুল মৃধা, আক্তার শেখ, আহমদ হোসেন গাজী, বাকী শিকদার, কামাল শিকদার, ছানোয়ার শিকদার ও তারিকুল ইসলামসহ প্রায় অর্ধশত পরিবারের বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেছে।
মো. ইকরামুজ্জান নামে গ্রামের অপর এক বাসিন্দা বার্তা বাজারকে বলেন, মধুমতি নদীর ভাঙন অব্যাহত ভাঙনে ইউনিয়নের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ চরনারানদিয়া গ্রাম। ভাঙনের কারণে অনেকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে।’
এদিকে ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে এতে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) সন্তোষ কর্মকার বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমান পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে।’
ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনজুর হোসেন বার্তা বাজারকে বলেন, ‘ভাঙন কবলিত স্থানে আপদকালীন জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্প প্রণয়ন করেছেন। আগামী শুষ্ক মৌসুমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।’
মিয়া রাকিবুল/বার্তা বাজার/টি