দেশের বাহিরে বাড়ছে রাজশাহীর পণ্যের কদর

বিশ্ব বাজারে রাজশাহীর পাট, রেশম, হস্তশিল্প ও আম এখন সুপরিচিত। বাংলাদেশের জিওগ্রাফিক্যাল আডেন্টিফিকেশন (জি-আই) বা ভৌগলিক নির্দেশক হিসেবে নিবন্ধিত ৯ টি পণ্যের মধ্যে রাজশাহীর রফতানি অঞ্চলেরই চারটি।

২০২১ সালে রাজশাহী সিল্ক, ২০১৯ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম, রংপুরের শতরঞ্জি ও দিনাজপুরের কাটারিভোগ এই সনদের আওতায় আসার পর এ অঞ্চলের রফতানিতে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। এর বাইরেও রাজশাহী বিভাগের অন্য পণ্যগুলোরও কদর বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (SAFTA) এর দেশগুলোতে রাজশাহীর পণ্য রফতানি বাড়ছে।

করোনাকালীন গত একবছরে রাজশাহী থেকে শুধু পাট, হ্যান্ডিক্র্যাফট, টি-শার্ট, অ্যাগলোম্যারেটন, তাঁত ও হালকা প্রকৌশল যন্ত্রপাতি রফতানি হয়েছে ৫ কোটি ৩৯ লক্ষ ৮৬ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি।

রাজশাহী রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ টি জেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী রফতানি অঞ্চলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিলো ৩ কোটি ৮৫ লক্ষ ৪০ হাজার ৩০৫.৫৫ মার্কিন ডলার।

যা একবছরের ব্যাবধানে বেড়ে দাঁড়াই ৫ কোটি ৩৯ লক্ষ ৮৫ হাজার ৩৮৯.৭০ মার্কিন ডলার। ভাষাগত ও যোগাযোগের দুর্বলতা, পরিবহনের সমস্যা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার কৌশল, বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ প্রক্রিয়াগত সমস্যাগুলো দূর করা গেলে এই রফতানির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী থেকে রফতানি হওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে প্রথমেই আছে পাট ও পাটপণ্য। বিভিন্ন কারণে পাটের উৎপাদনসহ ব্যবস্থাপনাগত জটিলতার কারণে দমে যাওয়া বাজার আবারও চাঙা হচ্ছে। গত পাঁচ বছর থেকে পাট রফতানি বাড়ছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে এক কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার ৫৮৫.৭৪ মার্কিন ডলার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৭৯. ৫৫ মার্কিন ডলার ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুই কোটি ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৫২৮.১৫ মার্কিন ডলারের পাট রফতানি হয়েছে রাজশাহী বিভাগ থেকে।

বগুড়া থেকে হালকা প্রকৌশল যন্ত্রপাতি, ইশ্বরদী থেকে হোশিয়ারি পণ্য, সিরাজগঞ্জ থেকে তাঁত বস্ত্র ও পাট সবচেয়ে বেশি ইন্ডিয়ায় এবং হ্যান্ডি ক্যাফটস ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটসহ অন্যান্য পণ্যের যে চাহিদা আছে তার তুলনায় রফতানি অনেক কম হচ্ছে। যোগাযোগের সুবিধা ও ভাষাগত কারণে পাট ও পাটপণ্য সবচেয়ে বেশি রফতানি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। এই সময় সমস্যাগুলো দূর করা গেলে জাতীয় রফতানিতে রাজশাহীর অবদান বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সহকারী পরিচালক কাজী সাইদুর রহমান জানান, আন্তজার্তিক বাজারে রাজশাহীর পণ্য চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু যে পরিমাণ চাহিদা আছে তার তুলনায় কম রফতানি হচ্ছে। সাপটা চুক্তির আওতায় দেশগুলোতে রাজশাহীর পণ্য বেশি রফতানি হচ্ছে। যোগাযোগসহ পরিবহণ সমস্যার কারণে আন্তর্জাতিক অন্য বাজারগুলোতে চাহিদা থাকার পর রফতানি করা যাচ্ছে না।

আবার অধিকাংশ রফতানি তৃতীয় পক্ষের কাছে করা হচ্ছে। এটা যদি সরাসরি করা যায় তবে রফতানি আয়ের পরিমাণটাও বাড়বে। তবে বর্তমানে বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে রফতানি বাড়ছে। সামনের দিনে আরও বাড়বে।

তিনি আরও জানান, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শসহ সার্টিফাইড সুবিধা দিচ্ছে। বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করা হচেছ।

কার্যকরি সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ণ ও রাজশাহীতে বিনিয়োগ বাড়লে রফতানির পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে বলে ধারণা করেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়াস হোসেন।

তিনি জানান, রাজশাহী অপার সম্ভাবনার একটি জায়গা। কিন্তু দেশের জাতীয় রফতানিতে রাজশাহীর অবদান অনেকটাই কম। যদিও বিগত বছরগুলোর চেয়ে রফতানি বাড়ছে। রফতানি বৃদ্ধির এই গ্রোথটা আরও হওয়া প্রয়োজন ছিলো। এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করলে হাজার কোটি ডলার নয়; বিলিয়ন ডলার রফতানি সম্ভব রাজশাহী থেকে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে এটা হচ্ছে না।

অধ্যাপক ইলিয়াস হোসেন আরও জানান, মাত্র ৫-৬ টি পণ্য থেকে এই পরিমাণ রফতানি আয় হচ্ছে। বাকিপণ্যসহ কৃষি ও মৎস্য নিয়ে কাজ করলে জাতীয় রফতানিতে রাজশাহী বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারবে। এক্ষেত্রে নতুন উদ্যোক্তা তৈরিসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা বাড়াতে, আন্তজার্তিক বাজারে টিকে থাকার বিষয়গুলোকে রপ্ত করার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর উদ্যোগ সন্তুষ্টজনক নয়। তাই সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, ব্যবসায়িক সংগঠন, সিভিল সোইসাইটির প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের যুক্ত করতে হবে।

পরিবহণ সমস্যার সমাধান ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রমে গতিশীলতা বৃদ্ধি পেলে রাজশাহীর রফতানি আয়ের পরিমাণ ও পণ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স ইন্ড্রাস্ট্রির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনি। তিনি জানান, রাজশাহী থেকে পণ্য রফতানির অন্যতম সমস্যা হচ্ছে পরিবহণ।

মধ্যপ্রাচ্যে রাজশাহীর পণ্য রফতানির অনেক সুযোগ আছে। কিন্তু এখানকার একজন ব্যবসায়িকে পণ্য রফতানি করতে হলে চট্টগ্রাম বা ঢাকায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে কস্ট বাড়ছে। একারণে তারা সরকারের কাছে কার্গো বিমানের দাবি জানিয়েছেন। এরইমধ্যে প্রয়োজনীয় আশ্বস মিলেছে। বর্তমান রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে দ্রুতই তা পাওয়া যাবে।

তিনি আরও জানান, পণ্য রফতানি করতে রাজশাহীর উদ্যোক্তাদের জ্ঞানগত প্রতিবন্ধকতাও আছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের দরকার। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স এটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকেও আরও গতিশীলতা আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

মাহাবুল ইসলাম/বার্তা বাজার/টি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর