আগুনমুখায় ডুবোচর: লঞ্চ চলাচলে ভোগান্তি, ড্রেজিংয়ের দাবি

এক সময়ের খরস্রোতা আগুনমুখা নদী। সাত নদীর মোহনা হওয়ায় এ নদী খুব উত্তাল ছিল। গভীরতা আর প্রসস্ততাও ছিলো অনেক। কিন্তু কালের বিবর্তনে আগুনমুখায় এখন অসংখ্য ডুবোচর জেগেছে। একারণে নদীটি এখন নাব্যতা সংকটে। যার ফলে সহজে নৌযান চলাচল করতে পারছেনা। প্রায় সময়ই দোতলা লঞ্চ আটকে গিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।

আগুনমুখা নদীর অবস্থান পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ও গলাচিপা উপজেলার মাঝামাঝি। নদীর উত্তর পাড়ে গলাচিপা উপজেলা, দক্ষিণে রাঙ্গাবালী উপজেলা এবং পশ্চিম পাশে রাবনাবাদ নদের মোহনায় নির্মিত পায়রা সমুদ্রবন্দর। রাবনাবাদ, দারচিরা, বুড়াগৌরাঙ্গ সহ সাতটি নদীর মোহনা পরেছে আগুনমুখায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগুনমুখা অতিক্রম করে এসব নদীতে যেতে হয়।

সরজমিনে দেখাগেছে, এ নদী পাড়ি দিয়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে আসা যাওয়া করে রাঙ্গাবালী উপজেলার দুই লাখ মানুষ। রাঙ্গাবালীর মানুষের গন্তব্যস্থান যেখানেই হোক না কেন আগুনমুখাকে বাদ দিয়ে নয়। আগুনমুখার বুক চিরেই পৌঁছাতে হয় গন্তব্যে। বাহন লঞ্চ অথবা ট্রলার। কিন্তু এই লঞ্চ-ট্রলার চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর তলদেশ থেকে উঠে আসা ডুবোচরগুলো। আর এ চরের কারণে নদীতে শতশত ফিশিং বোট ও সমুদ্রগামী জাহাজ মারাত্মক ঝুঁঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ডুবোচরের কারণে জাহাজ ও ফিশিং বোটগুলোকে ভাটার সময় ৫-৭ ঘণ্টা পর্যন্ত নদীর মাঝখানে নোঙর করে থাকতে হয়।

লঞ্চ কর্তৃপক্ষ জানায়, নদী দু’টি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। ডুবোচরের কারণে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম প্রায়। এ কারণে যাতায়াত অসুবিধায় ভুগছে রাঙ্গাবালী উপজেলার দুই লাখ মানুষ। এখানকার মানুষকে জেলা শহর, রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্য কোথায়ও গেলে এ নদী পারি দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু অসংখ্য ডুবোচরের কারণে প্রায় সময়ই মানুষের ভোগান্তি পোহাতে হয়। জোয়ারের সময় চরগুলো দেখা না গেলেও ভাটার সময় স্পষ্ট দেখা যায়।

ঢাকা-পায়রাবন্দর রুটে চলাচলকারী এমভি ইয়াদ লঞ্চের ম্যানেজার মনির হোসেন জানান, আগুনমুখা নদী পারি দিয়ে ঢাকা থেকে পায়রাবন্দর এবং কলাপাড়া উপজেলায় পৌছাতে হয়। এ নদী অসংখ্য ডুবোচর রয়েছে। যার কারণে লঞ্চ চলতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখিন হতে হচ্ছে। ভাটার সময় লঞ্চ বালুতে আটকে যায়, পরবর্তী জোয়ার আসার আগ পর্যন্ত লেগে থাকে। এ কারণে দুরের পথ ঘুরে আসতে হয়। অর্থাৎ যেসব যায়গায় গভীরতা আছে সেখান দিয়ে আসা লাগে। এতে প্রায় এক-দেড় ঘন্টা সময় বেশি লেগে যায়। বিশেষ করে বড় লঞ্চ চলাচল করতে বেশি সমস্যা হয়।

আগুনমুখায় মাছ শিকারকারী কাউখালী চরের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ মাঝি জানান, ডুবো চরের উপর দিয়ে জোয়ার ভাটার স্রোতের বেগ বেড়ে গেলে পানি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বড়বড় ঢেউ সৃষ্টি হয়। তখন এ নদী দিয়ে লঞ্চ-ট্রলার চলাচল করতে হয় খুব ঝুঁকি নিয়ে। বিশেষ করে আমরা ছোটছোট ইঞ্জিল চালিত নৌকা দিয়ে যখন ইলিশ মাছ ধরতে যাই, তখন খুব ভয় নিয়ে কাজ করতে হয়।

রাঙ্গাবালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান মামুন জানান, নদীপথে চলাচলের জন্য আগুনমুখা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যবসা বাণিজ্যের মালামাল পরিবহনের জন্য প্রতিদিন এ নদী দিয়ে এ অঞ্চলের শত শত ট্রলার, কার্গো ও জাহাজ চলাচল করে। নদীকে কেন্দ্র করে সোনারচর, জাহাজমারা, চরতুফানিয়া, চরমোন্তাজ ও গলাচিপায় গড়ে উঠেছে কয়েকশত জেলে পল্লী। এ সব জেলেপল্লীর হাজার হাজার ট্রলার প্রতিদিন নদী পাড়ি দিয়ে সাগর মোহনায় মাছ ধরার জন্য যাতায়াত করে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে সাগর মোহনায় গিয়ে। নদীর মোহনায় প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় অর্ধ শত ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। ভাটার সময় এসব চরে পানি থাকে এক-দেড় ফুট। এ সময় কোনো ধরনের ট্রলার কিংবা নৌযান চলাচল করতে পারে না। নিরুপায় হয়ে তখন নদীর মাঝখানে তাদের নোঙ্গর করে থাকতে হয়।

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান জানান, আগুনমুখা নদীর ডুবোচর নৌযান চলালে বিরাট বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। লঞ্চ মালিক সমিতি, স্পিডবোট মালিক সমিতি সহ স্থানীয় মানুষ এ নদীতে ড্রেজিংয়ের জন্য আমাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে দাবী তুলেছে। তাই নদী ড্রেজিয়ের জন্য আমরা ইতোমধ্যে প্রস্তাবনা পাঠিছি। যাতে এই ডুবোচর গুলোকে বালুমহল ঘোষণা করে পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। তাহলে এখানকার মানুষও উপকৃত হবে, সরকারও রাজস্ব পাবে।

পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মহিব্বুর রহমান মহিব জানান, ডুবোচরের বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবছি। আমরা অতি শীঘ্রই এব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।

সাইফুল ইসলাম সায়েম/বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর