মানবাধিকার মাল্টিমিডিয়া। একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। কাগজ পত্র কিছুই নেই। নেই সরকারি কোনো অনুমোদন। শুধু পৌরসভা থেকে নেয়া হয়েছে একটি ট্রেড লাইসেন্স। তারপরও তাদের প্রতারণার জাল বিস্তৃত। এ জালে ফেলে মানবাধিকারের নামে বাণিজ্য করে যাচ্ছে দেদারছে।
আর সাইনবোর্ড সর্বস্ব ভূয়া এ প্রতিষ্ঠানটি শোভা পাচ্ছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের বিপরীতে জনৈক খোকনের দুতলা বিল্ডিং-এ। এ অফিসে সেবার যেন শেষ নাই। একের ভিতর সব। সাইনবোর্ড দেখলেই নজরে পড়বে মানবাধিকার, তথ্য-গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা এ রকম চটকদার লেখা। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে তাদের এ সব কিছুই ভূয়া। এ চক্রের সঙ্গে যারা জড়িত তারা সকলেই পুলিশের খাতায় দাগী অপরাধী।
এদের মধ্যে দুইজন পুলিশের খাতায় সন্ত্রাসী ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একাধিক মামলার চার্জশিটভূক্ত আসামী। আরেকজন ১৯৯৩ সালের দিকে ঘাটাইল এস আর অফিসে জাল দলিল করার অপরাধে সনদ বাতিল হওয়া কথিত ভেন্ডার। যিনি হাবিব ভেন্ডার নামেই এলাকায় পরিচিত। তারাই এখন কখনো সাংবাদিক আবার কখনো মানবাধিকার কর্মী সেজে এলাকার নীরিহ মানুষকে ধোকা দিয়ে তাদেরকে কথিত অফিসে নিয়ে আসে।
আইনি সহায়তাসহ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে উভয়ের কাছ থেকে প্রথমে এন্ট্রি ফি বাবদ ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নেয়া হয়। পরে আদালতের আদলে বাদী বিবাদীর নামে নোটিশ পাঠিয়ে তাদেরকে অফিসে আনা হয়। তাদের কাছ থেকে হাজিরা ফিসের নামে নেয়া হয় ৫‘শ থেকে ২ হাজার টাকা।
এভাবে সক্রিয় প্রতারক চক্রটি প্রশাসনের নাকের ডগায় মাসের পর মাস বছরের পর বছর সাধারন মানুষকে ধোকা দিয়ে যাচ্ছে। আর এ প্রতারক চক্রের মুল হোতা কথিত নির্বাহী পরিচালক নামধারী ঘাটাইলের কর্না গ্রামের মৃত সলিম উদ্দিনের ছেলে হায়দার রহমান। অপরজন আঠার দানা গ্রামের মৃত ইলিয়াস খন্দকারের ছেলে আতা খন্দকার। যিনি ঘাটাইল থানার একাধিক ফৌজদারি সন্ত্রাসি মামলার চার্জশিটভূক্ত আসামী।
এলাকায় বিবাহ, তালাক, যৌতুক, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, পারিবারিক বিরোধ, জমি নিয়ে ঝামেলা, দেনমোহরসহ গরিব-অসহায়দের আইনি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়। অনেকে ভুঁইফোড় এ প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। মানবাধিকারের সুরক্ষা পাওয়া দূরে থাক, উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে শত হয়রানি হলেও ভয়ে এদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না।
ভোক্তভোগি ঘাটাইলের গুনগ্রাম এলাকার আঃ আজিজের মেয়ে আছমা বেগম জানান, আমি প্রতিবেশীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হই। পরে হাবিব ভেন্ডার আমাকে ঘাটাইলের ওই মানবাধিকারের অফিসে নিয়ে যায়। সুবিচারের জন্য সেখানে আমাকে আবেদন করতে বলেন। আমি তার কথামতো সুবিচারের জন্য ১০০০ টাকা ফিস দিয়ে আবেদন করি। পরে হাজিরার নামে একেক সময় টাকা দিতে হয়েছে। সর্বশেষ মামলার প্রতিবেদন দিতে আমার কাছে একবারে ২৫ হাজার টাকা চায়। এতে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। কোনো দিশকুল না পেয়ে আমি আমার মাকে জানালে তার একটি গাই (গাভী) বেঁচে আমাকে ২৫ হাজার টাকা দেয়। পরে আমি মানবাধিকার অফিসে গিয়ে ২৫ হাজার টাকা দেই।
এক প্রশ্নের জবাবে ভোক্তভোগি জানান, ওই টাকা দেয়ার কিছুদিন পর আমার হাতে একটি প্রতিবেদনের কাগজ দেয়। এতে আমার কোনো কাজ হয় নাই। উপরন্ত প্রতিপক্ষের দ্বারা আরো বেশী নির্যাতনের শিকার হয়েছি।
একইভাবে আঠারদানা গ্রামের মহর আলীর স্ত্রী আফরোজা বিদেশ পাঠানোর নামে প্রতারণার শিকার হয়ে কথিত ওই মানবাধিকার মাল্টিমিডিয়াতে অভিযোগ করে। এতে তিনি কো্নো সুবিচারতো পান-ই নাই। সেখানে গিয়ে আরো প্রতারণার শিকার হয়েছেন ওই নারী
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কথিত এ মানবাধিকারের নির্বাহী পরিচালক হায়দার রহমান বার্তা বাজারের সাথে কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি।
এ সংগঠনের সরকারের কোন অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে সংগঠনের পরিচালক হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব ভেন্ডার বলেন, কোনো অনুমোদন নাই। তবে পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এটা পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে কো্নো অসুবিধা হচ্ছেনা। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সাইনবোর্ড ও প্যাডসর্বস্ব এ সংগঠনের সাথেই ‘বঙ্গবন্ধু কর্ণার’ নামে আরো একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের বিরুদ্ধেও নানা অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে। এদের কর্মকান্ডে ক্ষুন্ন হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাবমূর্তি। সেই সাথে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সরকারে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত সাপেক্ষে এদের বিরুদ্ধে অইন ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলেছেন ভোক্তভোগিরা।
উত্তম আর্য্য/বার্তা বাজার/এসজে