১৮, ডিসেম্বর, ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৯ রবিউস সানি ১৪৪০

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ

আপডেট: আগস্ট ৭, ২০১৮

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ

আমরা হরিণ শিকার করি তার সুস্বাদু মাংসের লোভে, যদিও হরিণ একটা নিরীহ প্রাণী। হরিণ কারও ক্ষেত খায় না। তাদের বন্ধু বানর জঙ্গলের বিভিন্ন গাছ থেকে যে পাতা ছিঁড়ে মাটিতে ফেলে মূলত সেটা আর বন জঙ্গলের ঘাস খেয়ে জীবন ধারণ করে তারা। তবুও শিকার লোভীদের শিকারের লক্ষ্য হরিণ, তাদের প্রাণ দিতে হয় বিনা অপরাধে। আর তাই ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’।

সম্পদে ভরা এই বাংলাদেশে সাগরে জেগে ওঠা নিঝুমদ্বীপ, নলেরচর, কেয়ারিংচর, জাহাজেরচরসহ বেশ কয়েকটি নতুন দ্বীপ যেন আরেক বাংলাদেশের জানান দিচ্ছে। এর মধ্যে নিঝুমদ্বীপে গড়ে উঠেছে ৫০ হাজার লোকের নতুন বসতি ও বনায়ন। এ ছাড়া দ্বীপ হাতিয়ার পশ্চিমে ঢালচর, মৌলভীরচর, তমরুদ্দিরচর,জাগলারচর, ইসলামচর, নঙ্গলিয়ারচর, সাহেব আলীরচর; দক্ষিণে কালামচর, রাস্তারচরসহ অন্তত ১৫টি দ্বীপ ১৫-২০ বছর আগ থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে উঠেছে। যে মুহূর্তে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের সিংহভাগ ভূখণ্ড সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে, ঠিক সে মুহূর্তেই দেশের এই অভাবনীয় সম্ভাবনা সীমাহীন আশা জাগিয়েছে জনমনে। এ ছাড়া ঢালচর, নলেরচর, কেয়ারিংচর, মৌলভীরচরসহ কয়েকটি দ্বীপে জনবসতি জেগে উঠেছে। এসব দ্বীপে বন বিভাগ সবুজ বনায়ন করেছে। তবে জলদস্যু-বনদস্যুদের ভয়ে বাকি দ্বীপগুলোতে এখনো বসবাস শুরু হয়নি। এখনো অন্তত ৪০-৫০টি ডুবোদ্বীপ রয়েছে, যা আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে জেগে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন মিডিয়া সূত্রে জানা যায়।

নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত অ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইডিপি) এক জরিপ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সাল পর্যন্ত শুধু নোয়াখালী উপকূলেই সাড়ে ৯০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি জেগে ওঠে। নিঝুম দ্বীপ থেকে ৩৫-৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে ভাটার সময় বড় বড় চরভূমির অস্তিত্ব থাকার তথ্য জানতে পেরেছেন বিশেষজ্ঞরা। এসব চর জাগলে সেখানে গড়ে উঠবে জনবসতি তখন বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা হলেও কমবে।

ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে দশটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এ কাজে স্থানীয় জনসাধারণসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অধিকাংশই হবে চাষ অযোগ্য বা নদী আর সাগর বক্ষে জেগে ওঠা বালিয়াড়িতে হবে যাতে চাষযোগ্য জমি নষ্ট না হয়। সস্তা বিপুল আধা দক্ষ ও দক্ষ শ্রমশক্তির কাজে লাগিয়ে লাভবান হতে পারে বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশ এখানে বিনিয়োগ করে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২ মিলিয়ন মানে ২০ লাখ মানুষ কর্মক্ষেত্রে আসার যোগ্য হচ্ছে। সে কারণেই ‘দ্য চেঞ্জিং ওয়েলথ অব ন্যশন-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের মানব সম্পদকে অন্যতম সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছে। যদিও ঐ প্রতিবেদনে আমাদের দেশের অনেক সম্পদের কথা উল্লেখ করতে ভুলে গেছে অথবা এড়িয়ে গেছে, না হয় তাঁরা সম্পদ চিহ্নিত করতে পারেনি। যা হোক, বাংলাদেশের এই মানব সম্পদ ব্যবহারের উপায় খুঁজে বের করা খুব জরুরি। বেসরকারি খাতের বিকাশের যে গতি, সেই গতি এই বিপুল কর্মোপযোগী বাংলাদেশের মানুষকে কাজ দিতে এখনো সক্ষম হচ্ছে না। কারণ সেইমত শিল্পের বিকাশ হয় নি। কিংবা এফ ডি আই বা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট এর মাধ্যমে প্রস্তাবিত স্পেশাল ইকনমিক জোন (এসইজেড) এখনো সেই অবস্থায় আসেনি। যদিও কাজ চলছে খুব দ্রুত। এসইজেড চালু করা গেলে লাখ লাখ মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে এই বাংলাদেশেই।

নদীর দেশ বাংলাদেশ। একাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার। নদীগুলো ছিল প্রশস্ত গভীর ও পানিতে টইটম্বুর। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন নামক সংগঠনের দেওয়া তথ্যমতে দেশে শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে পানি থাকে এমন নদীর সংখ্যা ২৩০টি এবং সরকারি হিসাবে শুধু গ্রীষ্মকালে পানি থাকে এমন নদীর সংখ্যা ৩২০টি। অথচ দুঃখের বিষয় এই নদীগুলোর মধ্যে বর্তমানে ১৭টি নদী তার চরিত্র সম্পূর্ণ হারিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে। ধারণা করা হচ্ছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরও ২৫টি নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ষাটের দশকে সাড়ে ৭০০’ নদী ছিল বাংলাদেশে। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে মাত্র ২৩০টিতে দাঁড়িয়েছে। ৫০ বছরে ধ্বংস হয়ে গেছে ৫২০টি নদী। এইসব নদীর অনেকগুলোই আবার বেঁচে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সরকার আবাদযোগ্য জমি রক্ষায় হাইজ বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এইচবিআরআই) নদীর বাল থেকে ইট তৈরির একটি গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যাতে মাটির পরিবর্তে বালি দিয়ে ইট তৈরি করা যায়। ইউরোপের প্রায় সব দেশেই এমনকি এশিয়ার কোন কোন দেশেই মাটির ইট তৈরি নিষিদ্ধ। কারণ আবাদযোগ্য মাটি তৈরি হতে সময় লাগে হাজার হাজার বছর। এই গবেষণা প্রকল্প শেষে প্রাপ্ত ফরমুলায় জ্বালানি ছাড়াই ইট তৈরি হবে। সারা দেশের বিভিন্ন নদীর চরে ইটের কারখানা গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। যে সব ইট গার্মেন্টস শিল্পের মতো তাদের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করবে।হবে অনেক কর্মসংস্থান, আসবে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা।

অন্য দিকে আমাদের বঙ্গোপসাগরের সীমানা বেড়েছে বিনা যুদ্ধে, যেটা ওয়ার্ম ওয়াটার অঞ্চল। এসব অঞ্চলে সিংগাপুরের মতো গভীর সমুদ্র বন্দর করা যাবে প্রায় হাফ ডজন। ফলে ভারত, মিয়ানমার, চীনসহ আশে পাশের অনেক দেশ এটা ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। কারণ এই সমুদ্রবন্দর বছরের ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকতে পারবে আমাদের সমুদ্র উপকূল ওয়ার্ম ওয়াটারে হওয়ার কারণে। এখানেও কর্ম সংস্থান হবে দেশের বহু মানুষের। একটা গভীর সমুদ্র বন্দর অপারেশন করে সিঙ্গাপুর পৃথিবী অন্যতম ধনয় দেশে রূপান্তরিত হয়েছে সেখানে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কত তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন আছে কি? গ্রাম বাংলায় একটা কথা প্রচলিত আছে যে, ‘গরীবের সুন্দরী মেয়ের দিকে কুনজর থাকে ঘরে বাইরে সবার ‘।

যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর আত্মীয় নওশাবা, কিংবা সবুর খানের নাতি বা বাংলাদেশ বিরোধীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশুদের এই অভূতপূর্ব আন্দোলনের সুযোগে নিজের স্বার্থ হাসিলে এমন অপতৎপরতায় কেউ কেউ গোষ্ঠী ধরে পথে আকাশে সক্রিয় হওয়ায় অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? শিশুদের একটা পবিত্র আন্দোলন যেভাবে ছিনতাই হয়েছে তার বর্তমান রূপ দেখে বঙ্গবন্ধুর একটা কথা মনে পড়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর একটা কথা দিয়ে লেখা শেষ করতে চাই। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, যখন তুমি ভদ্রলোকের সাথে লড়াই করবে, তখন তোমার লড়াই হবে নিপাট ভদ্রলোকের মতোই। কিন্তু যখন কোন বেজন্মার সাথে লড়াই করবে তখন তোমাকে লড়তে হবে বেজন্মার থেকেও বেশি খারাপ হয়ে। তা না হলে তুমি হেরে যাবে।