বজ্রপাতে নিহত ৪ শিশুর দাফন সম্পন্ন, শোকাচ্ছন্ন এলাকা
বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে সংসারের সকল অভাব দূর করবেন। বাবা মায়ের কষ্ট লাঘব হবে তাদের মাধ্যমে। ইচ্ছা ছিল ছেলেকে বড় মাইলানা ও মানুষের মতো মানুষ বানাবেন। কিন্তু সংসারের অভাব আর দূর করা হলোনা দিনাজপুর সদর উপজেলার চার শিশুর। হঠাৎ বজ্রপাতে কেড়ে নেয় তাদের জীবন।
গত সোমবার(২৩আগস্ট) দিনাজপুর শহরের ৮নং নিউটাউন রেল ঘুন্টি এলাকার মনোয়ার চৌধুরীর পুকুরের পাশের টিনশেডের ঘরে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থলেই ৪ জন শিশুর মৃত্যু ঘটে। মঙ্গলবার( ২৪ আগস্ট) সকাল ১০ টায় তাদের জানাজা শেষে শেখ জাহাঙ্গীর কবস্থান ও কাসিপুর করস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় হাজার হাজার মুসল্লি উপস্থিত হয়েছিল। এসময় চারদিকে নেমে আসে শোকের ছায়া।
আদরে সন্তানকে হাড়িয়ে পরিবার গুলো যেন অসহায় হয়ে গেছে। ঘটনায় নিহত হাসান (১২) বাবাকে হারিয়েছেন সাড়ে তিন বছর আগে। বাবাকে হাড়িয়ে সংসারে নেমে আসে অন্ধকার। হাসান বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান। মায়ের বেঁচে থাকার সম্বল ছিল হাসান। বাবা সিদ্দিক ইসলাম কাজ করতেন আটো মেকানিকের। বেঁচে থাকা পর্যন্ত সংসারে ছিলনা কোনো অভাব। গত সাড়ে তিন বছর আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসানের বাবার মুত্যু হয়ে। মা শুরু করেন বাসা বাড়িতে কাজ। বাসাবাড়িতে কাজ করলে ছেলেকে দেখাশুনা করতে পারবেনা বলে ছেড়েছেন বাসাবাড়ির কাজ। বাসার সামনে নিয়ে বসেছেন পান-বিড়ির দোকান। ছেলেকে মাউলানা বানাবেন বলে হাসানের মা ওমিতা বেওয়া পাটিয়েছেন মাদ্রাসায়। পড়া শেষ করে মায়ের দুঃখ লাঘব ঘটাবে।
হাসানের নানা হবিবর রহমান বলেন, হাসানের বাবা মারা গেলে তাদের সংসার খুব কষ্টে দিন কাটতো। বোনকে বিয়ে দিয়েছে হাসান তার বাবার রাখা কিছু টাকা ও মানুষের কাছ থেকে নিয়ে। এখন তার মাকে কে দেখবে হাসান যে তার মায়ের বাঁচার সম্বল ছিল।
‘বাবা সাথে করে ঢাকা নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আজ যদি আপন (১৬) বাবার সাথে ঢাকা যায়তো তাহলে ভাইটা মোর বাচে থাকল হয়’ বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন আপনের বোন তুলি।
আপন তফিউদ্দিন মেমোরিয়াল হাই স্কুলে আষ্টম শ্রেণিতে পড়াশুনা করতো। বাবা সাদেকুর ইসলাম দিনমুজুরের কাজ করেন, মা রিনা বেগম গৃহীনি। ঘটনার আগের দিন আপনের বাবা সাদেকুল ইসলাম কাজের জন্য ঢাকা গিয়েছিল। সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল আদরে একমাত্র ছেলে আপনকে।
যাওয়ার সময় ছেলেকে বলেছিল, ‘বাবা মোর সাথে চল মুই কাজ করিম তুই সাথে থাকবো তোক কোন কাজ করেতে হবেনা। তোর স্কুল তো বন্ধ বাড়িত কি করোবো’। ছেলে আপন স্কুল বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলাধুলা, পুকুরে গোসল, কিংবা পছন্দের খেলা ফুটবল ছেড়ে বাবার সাথে যেতে রাজি হয়নি। বাবা একাই গেছেন ঢাকায়। আপন পড়াশোনায় ছিল অত্যন্ত মেধাবি। পঞ্চম শ্রেণিতে পেয়েছেন জিপিএ-৫। সবার থেকে ছিল আলাদা। কোনো কিছু বললে সব হুবহু মনে রাখতো আপন। ফুটবল খেলা ছিল আপনের প্রিয় খেলা। খেলতেও পারতো আনেক ভালো।
আপনের বড় বোন তুলি বলেন, ‘ভাই আমার সকালে চা বিস্কুট খায় বের হয়েছে। মা তাকে ভাত খেয়ে যেতে বলছিল। আপন পড়ে এসে খাবে বলে সেই যে বাহির হয়ল লাশ হয়ে বাসায় ফিরল আমার ভাইটা। বাবার স্বপ্ন ছিল ভাইকে বড় অফিসার বানাবে। আমাদের পরিবারে হার ধরবে’।
সাজ্জাত হোসেন (১৩) কাসিপুর চোকরিয়াপাড়া মাদ্রাসায় ৪র্থ শ্রেণিতে পড়াশুনা করতো। করোনার শুরু থেকে বাসায় মাকে সময় দেয় সাজ্জাত। বাবা আইনুল ইসলাম ভ্যান চালক, মা সাজেদা গৃহীনি। আইনুল-সাজেদার সংসারে বহু প্রতিক্ষার পড়ে সাজ্জাতের জন্ম হয়। তাদের বিয়ের পড়ে দুই তিনটা বাচ্চা তার মায়ের পেটে নষ্ট হয়ে যায়। গ্রামের মানুষ বলাবলি করতো সাজেদা বুঝি অপয়া। আইনুর তার বোনের মেয়েকে দত্তক নিয়ে লালন পালন করতে থাকে। বোনের মেয়েকেই নিয়ে চলছিল তাদের সংসার। কিছুবছর পড়ে সাজ্জাত তার মায়ের পেটে আসে। কিন্তু শংঙ্কা হচ্ছিল এবারো বুঝি বাবা হতে পারবেনা আইনুল ইসলাম।
সাজ্জাতের মা বিভিন্ন জায়গায় মানত করেছে বাচ্চার জন্য। বড় হয়ে সাজ্জাত হবে বড় মাওলানা বাবা- মায়ের এই ছিল ইচ্ছা। পালিত মেয়েকে এক বছর আগে বিয়ে দেন আইনুল। ঘটনার আগের দিন বোনকে নিয়ে এসেছে বাড়িতে।
সাজ্জাতের বাবা আইনুল ইসলাম বলেন, ‘বাচ্চা হওয়ার আগে হাসপাতালে নিয়ে যাই। অনেক টেনশনে ছিলাম কি হয়। যখন শুনতে পাই ছেলে হয়েছে এবং সবাই ভালো আছে কি যে আনন্দ হচ্ছিল তখন। কিন্তু বুঝতে পারিনি সেই আনন্দ আজ কান্না হবে। কষ্টের এই ছেলেকে হুজুর বানানোর জন্য মাদ্রাসায় দিয়েছিলাম। কষ্টের সংসারে অভাব দুর করবে ভেবেছিলাম। কিস্তু সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
‘ভাই তোক মুই আর মারিমনা ভাই, তুই আয় ভাই বলে কান্না করছে’ মিম মন্ডল (৯) এর বড় ভাই লাম মন্ডল (১৩)। তাদের মধ্যে যেমন ছিল মিল তেমনি ঝগড়া করতেন তারা দুই জনেই। মিম মন্ডল পড়ালেখা করতো ইসলামী মেমোরিয়াল মাদ্রাসায়। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে ভালো মানুষ বানাবে।
মিমের বাবা সাজু মন্ডল বলেন, আমরা গরিব মানুষ ছেলেকে বড় কিছু বানানোর ইচ্চা ছিল না। ভালো মানুষ বানাতে চেয়েছিলাম ছেলেকে। বড় হয়ে ছেল যেন আমাদের দেখে রাখে।
বার্তা বাজার/এসজে