মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলায় তিন দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে রয়েছেন ঢাকাই সিনেমার আলোচিত নায়িকা পরীমনি। ইতোমধ্যে পরীমনির মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বেশ কয়েকটি সংগঠন।
পরীমনির ওপর নির্যাতন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ দেখে প্রাণ জুড়োচ্ছে বলে জানিয়েছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
সোমবার (২৩ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেন তসলিমা নাসরিন। বার্তা বাজার পাঠকদের জন্য তার পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
‘পরীমনির ওপর নির্যাতন নিয়ে এখন বাংলাদেশে প্রতিবাদে সোচ্চার মানুষ। দেখে প্রাণ জুড়োচ্ছে। একসময় যখন কেউ ছিল না তার পাশে, যারা মন্দ লোক, তারা তাকে নিয়ে অকথ্য মন্দ কথা বলছিল, যারা ভালো লোক, তারা মুখ বুজে ছিল — তখন ব্রাত্য আমি আরেক ব্রাত্য’র পাশে দ্বিধাহীন দাঁড়িয়েছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে মৃদু কণ্ঠে তার পক্ষে কথা বলতে শুরু করল কেউ কেউ, তারাও মেয়েটির সম্পর্কে তিনটে ভালো কথা বললে তিনটে মন্দ কথা বলছিল — তাতে ‘ব্যালেন্স’ হয়, অন্যায়ের প্রতিবাদও হয়।
বিশিষ্টরা এলেন আরও পরে, তারও পরে এখন বিশিষ্ট অবিশিষ্ট সকলেই চেহারা দেখাতে কার্পণ্য করছেন না। এভাবেই কিন্তু প্রতিবাদগুলো গড়ে ওঠে। ব্রাত্যরা সাত পাঁচ না ভেবে স্রোতের বিপক্ষে দাঁড়ায়। স্রোত যখন খুব বেশি বিপক্ষে নয়, তখন সুশীলদের দেখা মেলে। যে মেয়েকে বেশ্যা বলা হয়, সেই মেয়ের পক্ষে সেই মেয়েরাই প্রথম দাঁড়াতে সাহস করে, যাদেরও কোনও না কোনও সময় বেশ্যা বলে সমাজের লোকেরা অপমান করেছে। ভদ্রমহোদয় বা ভদ্রমহিলারা অত সহজে ব্রাত্যদের পক্ষে কথা বলে না। কারও বিরুদ্ধে অন্যায় হলেও তারা আগে বুঝে নিতে চায় মুখ খুললে আবার বিপদ হবে কি না। কত তো অন্যায় হচ্ছে সমাজে, কটা অন্যায়ের প্রতিবাদ সুশীল সমাজ করে? যেটুকুই করে,গা বাঁচিয়ে করে।
আশঙ্কা হচ্ছিল, যেভাবে কোনও ক্ষমতাধরের নির্দেশে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং আদালত পরীমনিকে হেনস্থা করছে, হয়তো মেয়েটির সর্বনাশ না করে ছাড়বে না। আশঙ্কা হচ্ছিল মেয়েটিকে বোধহয় ছুঁড়েই ফেলে দেবে সমাজ, কিন্তু না, তার ফিরে আসার জন্য চিত্রপরিচালকগণ অপেক্ষা করছেন। জামিনের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তার মেরুদন্ডহীন আইনজীবীকেও ধিক্কার দেওয়া হচ্ছে। এভাবেই একটু একটু করে জনমত গড়ে উঠছে, এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস পরীমনি বিজয়ী হয়েই নিজের জীবনে ফিরে আসবে। তাকে হেনস্থা করার জন্য শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ আদালতকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
পরীমনিকে অন্যায় ভাবে জামিন না দিয়ে জেলে বন্দি করা হয়েছে, এ নিয়ে খবর হচ্ছে বলে আমরা জানতে পাচ্ছি। কত হাজারো নির্দোষকে জামিন না দিয়ে জেলে বন্দি করা হয়েছে এবং হচ্ছে, তার খবর কে রাখে! কত নির্দোষকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছে, যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে, বিনা বিচারে জেলে ফেলে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর, তার তালিকা বের করা যায় না? তারাও ব্রাত্য। সবার পিছে সবার নিচে পড়ে থাকা সর্বহারা ব্রাত্যদের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যেস করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করা শিখতে হবে। সাত পাঁচ ভাবলে সমাজ বদলানো যায় না।’
বার্তা বাজার/নব