সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি: গ্রেফতারের পর মুখ খুলছে মানুষজন

কারো বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুৎসা রটিয়ে, কারো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর ভয় দেখিয়ে চলতো তার চাঁদাবাজি। খেটে খাওয়া মানুষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী কেউ বাদ যায়নি তার খপ্পর থেকে। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার মানুষের কাছে আরিফুজ্জামান চাকলাদার আপেল ছিল নব্য ত্রাস।

গত বৃহস্পতিবার চাঁদাবাজির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করেছে আলফাডাঙ্গা থানা পুলিশ। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়। সেই সঙ্গে, রবিবার ফরিদপুরের একটি আদালত তাকে জেলগেটে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আরিফুজ্জামান চাকলাদার আপেল নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও আদতে কোনো জাতীয় কিংবা স্বীকৃত স্থানীয় পত্রিকায় কোনো নিয়োগ ছিল না তার। কিন্তু কীভাবে সাংবাদিক বলে নিজেকে পরিচয় দিতে শুরু করলেন, সেই মুখোরোচক গল্পটিও চালু আছে মানুষেরে মুখে মুখে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মোবাইল ফোনে টাকা রিচার্জের ছোটখাটো একটি ব্যবসা ছিল আপেলের। সেখানে ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে স্থানীয় একজন সাংবাদিকের সঙ্গে সখ্য হয়। পরে তার পরিচয়কে নিজের পরিচয় হিসেবে অপব্যবহার করে অপকর্মগুলো চালিয়ে আসছিল আপেল।

আপেল গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় আলফাডাঙ্গায় মিষ্টি বিতরণ করেছে তার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা। তারা আপেলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবির পাশাপাশি তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেছেন। এতদিন ভয়ে অনেকেই মুখ খোলার সাহস পাননি। যারা সামান্য প্রতিবাদ করেছেন তাদের উল্টো নাজেহাল হতে হয়েছে পদে পদে।

এদিকে সাংবাদিক না হয়েও নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আপেলের অপকর্মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্থানীয় পেশাদার সাংবাদিকসহ বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে বিতর্কিত করার যে চেষ্টা আপেল করেছে এ জন্যও তার কঠিন শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

জানতে চাইলে আলফাডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম আকরাম হোসেন বলেন, ‘আলফাডাঙ্গায় কয়েকজন কথিত সাংবাদিক মানুষকে জিম্মি করে নানাভাবে চাঁদাবাজি করে আসছে। তাদের মধ্যে আপেল নামে ছেলেটি সম্পর্কে অনেক অভিযোগ শুনেছি। সে যেসব অপরাধ করেছে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে ভবিষ্যতে কেউ আর এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না।’

কথিত সাংবাদিকের হুমকি-ধমকিতে নিরাপরাধ ব্যক্তিরাও জিম্মি ছিল উল্লেখ করে আলফাডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ.কে.এম জাহিদুল হাসান বলেন, ‘আলফাডাঙ্গায় সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে মানুষকে জিম্মি করে আসছে কয়েকজন হলুদ ও কথিত সাংবাদিক। তাদের মধ্যে আরিফুজ্জামান চাকলাদার আপেলের নামে একাধিকবার মানুষকে জিম্মি করে চাঁদা দাবির অভিযোগ পেয়েছি। সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা আর এ পেশার পরিচয় দিয়ে মানুষকে জিম্মি করা বড় দুঃখজনক।’

স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ আছে, বিভিন্ন সময় মানুষের সরলতা এবং দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অহেতুক ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করতেন আপেল। এদের কাছে টাকাও দাবি করতেন তিনি। টাকা না পেলে তাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে তার নিজের আইডিতে মানহানিকর তথ্য লিখে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার ভয় দেখাতেন তিনি। পরে মানুষ বাধ্য হয়ে তাকে টাকা দিত।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ী, শিক্ষক, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে অভিনব কৌশলে ব্ল্যাকমেইল করে চাঁদাবাজি করাই ছিল তার কাজ। এ থেকে পরিত্রাণ মেলেনি খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষেরও।

উপজেলার চরনারানদিয়া গ্রামের নাজমুল হাসান নামে এক ব্যবসায়ী জানান, ‘আপেল আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এসে চাঁদা দাবি করেছিল। তখন আমরা চাঁদা দেইনি বলে সে তার ফেসবুকে বিভিন্ন উল্টোপাল্টা লিখেছিল। এমনকি এসিল্যান্ডকে দিয়ে আমাদের জরিমানা করবে বলেও ভয় দিয়েছিল।’

মো. রিয়াজ নামে এক ব্যক্তি জানান, ‘মোটরসাইকেল চালক আসলাম ভাইয়ের কাছ থেকে আপেল ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। এমনকি চাঁদা না দিলে তাকে অপহরণেরও হুমকি দিয়েছিল। পরে এক ছাত্রলীগ নেতার হস্তক্ষেপে আসলাম ভাই পরিত্রাণ পেয়েছে।’

শিক্ষকদের থেকেও ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে এসে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা নিয়েছে।’

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারাও তার চাঁদাবাজি থেকে রক্ষা পায়নি। উপজেলার পানাইল গ্রামের সুলতান মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি জানান, ‘আমাদের গ্রামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধার নিকট থেকে কয়েক হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চাঁদাবাজ আপেল। বিষয়টি নিয়ে আমি বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগও দিয়েছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার জানায়, ‘আমরা একটি রাস্তা কার্পেটিংয়ের কাজ করি। আমাদের কাছে গিয়ে চাঁদা দাবি করে। টাকা না দিলে কাজ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিল।’

তার বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে গিয়েও চাঁদাবাজি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, ঈদের আগে বিভিন্ন দপ্তরে এসে ঈদ সেলামি দাবি করেছিল আপেল।

আলফাডাঙ্গা থানা অফিসার ইনচার্জ মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘আরিফুজ্জামান আপেল আসলে একজন কথিত সাংবাদিক। কোন প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার সাংবাদিক নয়। অনুমোদনহীন অনলাইন আর ফেসবুকে লেখালেখি করে। এক মহিলার কাছে চাঁদা দাবি করে। ওই মহিলার ভাতিজা থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে তার সত্যতা প্রমাণিত হয়। পরে তার নামে চাঁদাবাজি মামলা হয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’

মিয়া রাকিবুল/বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর