রাজশাহী মেডিকেলে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দুর্দণ্ড প্রতাপ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও তাদের স্বজনদের বিড়ম্বনা এবং হয়রানি থামছে না। স্বল্প জনবল ও অধিক রোগী সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরমধ্যে দালালসহ ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্মে অতিষ্ঠ রোগী ও স্বজনরা। হাসপাতালের অভ্যন্তরের ডাক্তার থেকে শুরু করে সুবিধাবাদী কর্তা ব্যক্তিদের কারণেই এদের দ্বারা রোগী হয়রানি কমছে না।

করোনা মহামারীর মধ্যেও বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে করোনা আইসিইউ ভবন, সকল জায়গাতেই দালালসহ দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। তবে শক্তভাবে এদের দৌরাত্ম্য দূর করার আশ্বাস দিচ্ছেন হাসপাতাল পরিচালক।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, সপ্তাহের সোমবার ও বুধবার দুই দিন বেলা ১ টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন সিন্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিদিনিই হরহামেশা ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করছেন তারা। হাসপাতালের ভেতর-বাহির সব জায়গাতেই বাঁধা ছাড়াই শো-ডাউন দিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে এখন দালালের দৌরাত্ম অনেকটা কম থাকলেও ওষুধ প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম কমছে না। কখনো এরা ডাক্তাদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডাও দিচ্ছেন। বহির্বিভাগের রোগি দেখার সময় ডাক্তারের চেম্বারেও কেউ কেউ বসে থাকছেন। কেউ আবার সকালে ডাক্তার আসলে দেখা করে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে থাকেন। এরপর ঘণ্টাখানেক পরপর ডাক্তারদের জানান দিয়ে আসেন তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।

রোগীদের অভিযোগ, অধিকাংশ সময় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ১০ থেকে ১২ জনের দল বেঁধে থাকেন। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। এতে রোগিরাও ভীত থাকেন। ছবি না তুলতে দিলেই বাঁধে বিপত্তি। গালিগালাজসহ বিভিন্ন বাজে মন্তব্যের শিকার হচ্ছেন রোগীরা।

বার্তা বাজারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, করোনার শুরু থেকেই বহির্বিভাগে রোগির চাপ অনেকটা কমতে থাকে। জরুরি বিভাগে বাড়তে থাকে করোনা রোগী। এতে বিভিন্ন কৌশলে এসব ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা করোনা ওয়ার্ডে ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে অবস্থান করতে থাকে। জরুরি করোনা ওয়ার্ডের বাইরেও ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে দেখা যায় তাদের। অধিকাংশ সময় এরা কোম্পানির কার্ড ঝুঁলিয়েই হাসপাতালে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু আনসার সদস্যদের কখনো তাদের কিছু বলতে দেখা যায়নি। হাসপাতালের অনেক দায়িত্বশীলদের সঙ্গেও তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে।

শনিবার (২১ আগস্ট) ও রবিবার (২২ আগস্ট) হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগির চাপ বেড়েছে। বহির্বিভাগের মেডিসিন বিভাগে সবচেয়ে বেশি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য ছিলো। কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে তারা রোগির ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলছিলো। ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে রোগিদের বসার জন্য যে চেয়ারের ব্যবস্থা আছে তার এক-তৃতীয়াংশই এসব প্রতিনিধিদের দখলে ছিলো।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মায়ের চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন সুজন আলী। তিনি জানান, সকাল থেকেই মায়ের চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতালে ছিলেন। টিকিট কাটা থেকে শুরু করে ডাক্তার দেখানো পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই ভিড়ের মধ্যে একদল লোক সকাল থেকেই রোগির টিকিটের ছবি নিচ্ছিলেন। তার টিকিটের ছবি তিনবারে তিনজন নিয়েছে। কয়েকজন ভদ্র লোক বাইরে কম পয়সায় ভালো চিকিৎসার জন্যও বলছিলো।

হাসপাতালকে রোগীবান্ধব, দালালমুক্ত, বিড়ম্বনা ও হয়রানিমুক্ত করাসহ সেবার মানোন্নয়নে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও অসৎ সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর কারণে কার্যত ফল রোগিরা পাচ্ছে না।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনসার থেকে শুরু করে সকলেরই সুসম্পর্ক রয়েছে। ডাক্তারাও চায় এরা হাসপাতালে আসুক। একারণেই হাসপাতাল পরিচালক বারংবার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এদের দৌরাত্ম্য কমছে না। এরা যাকে যেখানে যেভাবে ম্যানেজ করতে হয় করে। আর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা অধিকাংশই শিক্ষিত। সুতরাং তাদের কৌশলও অনেক। ডাক্তারকে দেয়া সুবিধার বিনিময়ে তারা কতটুকু পাচ্ছে সেটা তারা ঠিকই বুঝে নেয়।

এ বিষয়ে রামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানি বার্তা বাজারকে জানান, হাসপাতাল দালালমুক্ত ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্মমুক্ত করতে তিনি সচেষ্ট আছেন। কিন্তু হাসপাতালের ডাক্তার, আনসার অনেকেই চায় তারা আসুক। এরা প্যাড, কলম, ওষুধসহ অন্যান্য সুবিধা দিয়ে অনেককেই ম্যানেজ করছে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কখনোই এদের প্রশয় দিবে না। তারা সপ্তাহে দুই দিন একটি নির্দিষ্ট সময় হাসপাতালে আসতে পারবে। চিকিৎসা কাজে তারা কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারবে না। কিন্তু এটা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা মানছেন না। তাদেরকে বারবার অপমান করার পরও তারা আসছেন।

পরিচালক আরও জানান, হাসপাতালে এখন বাউন্ডারি ওয়ালের কাজ চলমান। একারণে তারা যে কোনো দিক দিয়ে হাসপাতালে ঢুকছে। তবে সামনের দিনে এদেরকে হাসপাতালে প্রবেশে আরও কঠোর হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এই নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে তারা হাসাপাতালে থাকতে পারবে না।

মাহাবুল ইসলাম/বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর