উন্মুক্ত হলো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রুপসী ম্যানগ্রোভ

ভারত-বাংলাদেশ সীমানা ঘেঁষে বয়ে চলা ইছামতির তীরে গড়ে ওঠা সাতক্ষীরার রুপসী ম্যানগ্রোভ পিকনিক স্পটটি দীর্ঘদিন পরে খুলে দেওয়া হয়েছে। খোলার পর থেকে বাড়তে শুরু করেছে দর্শনার্থীর সংখ্যা।

মহামারী করোনা ভাইরাসের ২য় ধাপের কারণে সরকারী নির্দেশনার আলোকে লকডাউনের পাশাপাশি বন্ধ রাখা হয় এই আকর্ষনীয় বিনোদন কেন্দ্রটি। দীর্ঘ লকডাউন শেষে বৃহস্পতিবার (১৯ আগস্ট) থেকে আবারো সকল পর্যটক ও বিনোদন প্রেমীদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেষা ইছামতির নদীর বুকে অবস্থিত এই বিনোদন কেন্দ্রটি। ইতোমধ্যে অন্যতম একটি বিনোদন কেন্দ্র পরিণত হয়েছে এই রুপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রটি।

তবে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় যশের প্রভাবে এই বিনোদন কেন্দ্রটি অনেক ক্ষতির মুখে পড়ে। এখানের অনেক ট্রেইল ভেঙ্গে গেছে এবং সৌন্দর্য বর্ধন করা অনেক কিছু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কেন্দ্রটিকে আরো নান্দনিক ও নয়নাভিরাম করে গড়ে তুলতে কাজ চলমান রয়েছে। তাছাড়া আগামী শীতের মৌসুমকে ঘিরে কেন্দ্রটি আরো আকর্ষণীয় ভাবে গড়ে তুলতে কাজ করা হবে বলেও জানা গেছে।

জেলা সদর হতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দুরে ইছামতি নদীর তীরে শিবনগর মৌজায় প্রায় ৫০ একর জমি জুড়ে রয়েছে এ বনটি। এটি উপজেলার “রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র” পর্যটন কেন্দ্র নামে পরিচিত।

ইছামতি নদীর তীরে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট এ ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রটি এ উপজেলায় মানুষকে গর্বিত করে। উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় টাউনশ্রীপুর এলাকায় ভারতের টাকী পৌরসভার বিপরীতে ইছামতি নদীর তীরে শিবনগর মৌজায় প্রায় ১৫০ একর জমিতে এ বনটি তৈরী করা হয়েছে। এই পর্যটন কেন্দ্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সহযোগীতা প্রদান করা হয়েছে।

পর্যটন কেন্দ্রটিতে অধিকাংশ সময়ে জেলা, উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক ভাবে বনভোজনের আয়োজন করা করা হয়। এই বনটিতে বহু প্রজাতির ফলজ ও বনজ বৃক্ষ রয়েছে। সুন্দরবনের আদলে বিভিন্ন প্রজাতির বনজ বৃক্ষের চারা এনে রোপন করে ব্যাপক বনের সৃষ্টি করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে কেওড়া, বাইন, গোলপাতা, কাঁকড়া, নিম, সুন্দরী, হরকচাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ উদ্ভিদ।

এখানে ১০একর জমির বুকে রয়েছে “অনামিকা লেক”। এই লেকে রয়েছে শান বাধানো পাকা ঘাট। বিনোদন পিয়াসীদের জন্য রয়েছে বসার স্থান। রয়েছে শিশুদের আনন্দ দেওয়ার জন্য কৃত্রিম বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে এটি পরিপূর্ণ বনে পরিনত করতে উপজেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে, সাতক্ষীরা জেলার ইছামতি সীমান্তের ইছামতির তীরে গড়ে ওঠা দৃষ্টিনন্দিত মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য ম্যানগ্রোভ মিনি সুন্দরবনটির ক্রমশ পরিধি বাড়ছে। ২০০৯ সালে দেবহাটার সুঁশিলগাতী এলাকার নদীর বেড়িবাধ ভেঙ্গে প্লাবিত হলে ২০১০ সালে উপজেলার প্রশাসনের উদ্যোগে বাঁধ রক্ষায় ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য ১০একরের মত জায়গা জুড়ে তৈরী এই ম্যানগ্রোভ বন। বেশ কয়েক বছর যেতে যেতে বনের আকার বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর রক্ষা পায় আশে পাশের এলাকাবাসীরা।

প্রতিবছর উপজেলা ও জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ উপভোগ করতে আসে প্রকৃতির এই দৃশ্য। তাছাড়া বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে বনটিতে কানায়কানায় দর্শণার্থী পরিপূর্ণ হয়। শীতের প্রথম থেকে শুরু হয় পিকনিক উৎসব। অনেকে এসে রান্নাবান্না করে ধুমধাম চড়ুইভাতিও করে। কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে উৎসবের আমেজ। সেই আমেজ ছড়িয়ে পড়ে সকলের মাঝে। বর্তমান স্থানটিতে প্রবেশ করতে হলে উপজেলা প্রশাসনকে টিকিটের মাধ্যমে ১০টাকা ফি দিতে হয়। যার পুরো টাকা সরকারি রাজস্ব তহবিলে জমা হয়। স্থানটি ইছামতির তীরে নিরিবিলি হওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এখানে সময় কাটাতে আসেন।

বিনোদন কেন্দ্রটির ম্যানেজার দিপঙ্কর কুমার ঘোষ জানান, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সার্বিক নিরাপত্তা ও সুন্দর পরিবেশ যাতে বজায় থাকে সে জন্য সর্বদা তৎপর আছি। এখানে ছুটির দিনে অসংখ্য মানুষ আসেন বেড়াতে। জায়গাটি নদীর তীরে হওয়ায় এখান থেকে টাকি পৌরসভা ও ভারতের কিছু এলাকা দেখা যায়। পর্যটকদের সুবিধায় পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, নামাজের ঘর, বাথরুম, পানির লাইন সব কিছু ব্যবস্থা কার হয়েছে। পিকনিকের জন্য স্পট আছে। দুরদুরান্ত থেকে মানুষ পিকনিক করতে আসে এখানে।

তিনি জানান, সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার বর্তমান উপ-সচিব আ.ন.ম তরিকুল ইসলামের উদ্যোগে বনটি গড়ে তোলা হয়। এরপর পর্যয়ক্রমে বিভিন্ন নির্বাহী অফিসারগন এটির উন্নয়ন করে। সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার বর্তমান এডিসি হাফিজ আল-আসাদ বনটির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি ও ব্যাপক উন্নয়ন করেন। বর্তমান বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন এই পর্যটন কেন্দ্র নিয়ে। আশা করি সেসব উন্নয়ন দ্রুত বাস্তবায়ন হলে কেন্দ্রটির আরো প্রসার ঘটবে।

দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাছলিমা আক্তার জানান, সুন্দরবনের আদলে গড়া রুপসী ম্যানগ্রোভ বনটি মানুষের কাছে আরো আকর্ষনীয় করে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমি সার্বিক বিষয়ে সর্বদা খোঁজখবর রাখি। এখানে আসলে সুন্দরবনে যাওয়ার অনেকটাই স্বাদ মেটানো যাবে। পরিবার পরিজন নিয়ে মুক্ত বাতাসে সময় কাটানোর মনোরম পরিবেশ রয়েছে রূপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে।

তিনি আরো বলেন, এটি দেবহাটা তথা সাতক্ষীরার সম্পদ। তাই এটি রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব। তাছাড়া সকলের সহযোগীতা না পেলে উন্নয়ন সম্ভব না। তাই এটি রক্ষা ও উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে সকলের সহযোগীতা কাম্য।

মীর খায়রুল আলম/বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর