কুমারখালীতে ঝুঁকি পূর্ণ ভবনে ৫০ পরিবারের বসবাস
বাড়িগুলো দেড়শবর্ষের পুরনো। খসে খসে পড়ছে পলেস্তারা। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনের মধ্যে মানুষের বসবাস। তবে যে কোনো সময় ভবনগুলো ধসে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
‘ঝড় উঠলেই দুঃশ্চিন্তা বেড়ে যায়। হালকা বাতাসে কেঁপে ওঠে জরাজীর্ণ দালান – কোঠা। বৃষ্টিতে ফাঁটল দিয়ে পানি ঝরে ভেসে যায় বাসা- বাড়িসহ আসবাবপত্র। ঝড়-বৃষ্টির প্রতিটি দিন – রাত যেন এক বিভীষিকাময়। পরিবার পরিজন থাকে ভেঙে পড়ার আতঙ্কে । তবুও বিকল্প কোন উপায় না থাকায় পরিত্যক্ত ভবণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস।
জীবন হাতে নিয়ে এমন ঝুঁকিতে বসবাস করছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভার প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার। জরাজীর্ণ ভবণ গুলো প্রতিনিয়ত প্রাণনাশ ও যানমালের ঝুঁকি বাড়িয়ে চলেছে।
কুমারখালী পৌরসভা, এলাকাবাসী ও একাধিক সুত্র জানায়, প্রায় দেড়শ বছর পূর্বে কুমারখালী পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড (বর্তমান) এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক ভবণ নির্মাণ করে ব্রিটিশ আমলের বিত্তশালী কুন্ডু বংশধররা। ইটের সুরকি, রাবিশ (ধূলাবালি) ও চুন দিয়ে ভবণ গুলো নির্মিত। স্বাধীনতার পূর্বেই তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
এরপর স্বাধীনতার পর ওই ভবণ গুলোতে স্থানীয় কিছু লোক নামে – বেনামে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ভবণের সংস্কার না করায় তা জরাজীরর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিটি ভবনেই পরগাছা জন্মেছে। প্রতিদিনই খুলে পড়ছে সরকি – চুন। অনেক স্থানে ধ্বস দেখা দিয়েছে, ধরেছে ফাটল। তবুও ভবণ গুলোতে যান ও মালের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছে ৪০ থেকে ৫০ টি পরিবার।

তবে উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার কর্তৃপক্ষ দাবি করেন, বারবার বসবাসকারীদের ভবণ সংস্কার ও অপসারণের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবুও তারা কোন কর্ণপাত না করে জান ও মালের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলের জরাজীর্ণ ভবনগুলোর একাধিক স্থানে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ফাটল। খসে পড়েছে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অবকাঠামো, বের হয়ে গেছে লোহার রড। এসব ভবনে বেড়ে ওঠা পরগাছাগুলো দেয়াল ভেদ করে অথবা দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে।
দেয়াল, সিঁড়ি, ছাদ সব স্থাপনাই এখন ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এরপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবণ গুলোতে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন মানুষ। এতে ভবণে বসবাসরত ও পার্শ্ববর্তি ভবণের প্রায় কয়েক হাজারো মানুষ রয়েছে জীবণ ঝুঁকিতে।
কুন্ডুপাড়ার নুরুল ইসলাম (৭৫) বলেন, সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে প্রায় ২১ বছর বসবাস করছি। ভিতরে রড সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে বসবাস করছি। তবে বৃষ্টি হলে ঘরের ভিতরে পানি জমে। ঝড়ের দিনে ভয়ে থাকি। অন্য কোথায় জায়গা জমি না থাকায় জীবন হাতে নিয়ে বসবাস।
একই এলাকার মৃত হালিমুজ্জামান নান্টুর স্ত্রী আছিয়া খাতুন বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে ভারতের সাথে বাড়ি বিনিময় সুত্রে এখানে বসবাস। ভবণের জানালা, দরজা অনেক আগেই ভেঙে গেছে। প্রতিদিনই প্রায় ছোট ছোট সুরকি গুলো খসে খসে পড়ছে। ভবণ বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে মেরামত করা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, পৌরসভায় প্রায় অর্ধশতাধিক পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ রয়েছে। সেখানে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে চলছে বসবাস। ভবনগুলো ব্রিটিশ সরকারের আমলে নির্মিত হলেও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। ভবণ গুলো যেকোনো সময় ধসে পড়ে ব্যাপক জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কুন্ডুপাড়ার একটি পরিত্যাক্ত ভবণের বাসিন্দা অসিত কুমার বলেন, বাপ – দাদার আমল থেকে বাস করছি। কিন্তু মেরামত করা হয়নি। একটু বাতাস হলেই পরিবার পরিজন নিয়ে ভাঙন আতঙ্কে থাকি। বৃষ্টির দিনে পানিতেই বাস করি। বিকল্প পথ না থাকায় ঝুঁকিতেই জীবন কাটায়।
বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও গবেষক গৌতম কুমার রায় বলে, ‘ তৎকালীন সময়ে ব্যবসা বানিজ্যের কারণে স্থায়ী বসবাসের জন্য ব্রিটিশ ও কুন্ডুরা এই ভবণ গুলো নির্মাণ করেন। কিন্তু দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ভবনগুলো সংস্কার না করায় এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’
কুমারখালী পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদ খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভবণ গুলো ঝুঁকিপূর্ণ। বারবার পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবুও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি আরো বলেন, সরকারিভাবে উদ্যোগ না নেওয়া হলে বড় ধরের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিতান কুমার মন্ডল বলেন, ইতিমধ্যে ভবণ গুলো পরিদর্শন করেছি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা বাস করছেন। খুব অচিরেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমারখালী পৌরসভার মেয়র সামছুজ্জামান অরুন বলেন, কয়েকবছর ধরে পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করে ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। তারপরও তারা সেখানে বাস করছেন। তিনি আরো বলেন, বসবাসকারীরা স্বেচ্ছায় কোন পদক্ষেপ না নিলে, খুব অল্প সময়েই পৌরসভার পক্ষ্য থেকে কার্যকারী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মোশারফ হোসেন/বার্তা বাজার/টি