সাভারে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে অনিয়ম!

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর।

আশ্রয়ণ প্রকল্প মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মহৎ উদ্দেশ্যপ্রসূত প্রকল্প, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার দেশের ভূমিহীন ও দরিদ্র মানুষের বাসস্থানের চাহিদা পূরণ করে তাদের জীবনধারা স্বাভাবিক ও সমুন্নত রাখার চেষ্টা করে থাকে। তবে লজ্জার বিষয় হলো, সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক যেখানে এসব ঘর কেবল সমাজের হতদরিদ্রদেরই পাওয়ার কথা, সেখানে দেশের কোনো কোনো স্থানে এই নির্দেশনার বাইরে গিয়েও ঘর পাবার বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

ঢাকার সাভার উপজেলায় ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীন ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ১২টি ইউনিয়নে মোট ৬০টি ঘর নির্মাণ করে ৬০ পরিবারকে প্রদান করা হয়। বিষয়টি নিয়ে এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আশুলিয়া ইউনিয়নে একই পরিবারে উপার্জনক্ষম তিন ব্যক্তি’র এই প্রকল্পের আওতায় ঘর পাবার বিষয়টি!

আশুলিয়া ইউনিয়নের ধলপুর গ্রাম। বর্ষীয়ান কৃষক জয়দার আলী শেখ। তার তিন পুত্র মোঃ কাবেল হোসেন, মোঃ সাদ্দাম হোসেন এবং হাবিল। অনেক বছর ধরে তিনজনই তারা চাকুরিরত। সাভার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীন সাভার উপজেলায় যে ৬০টি পরিবারকে তাদের নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে, জয়দার আলী শেখ এর তিন পুত্র তাদের অন্যতম তিনটি পরিবার।

তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়ার ধলপুর গ্রামে মোঃ কাবেল হোসেন এর ৫ শতাংশ, মোঃ সাদ্দাম হোসেন এর ৬ শতাংশ এবং হাবিল এর ২ শতাংশ জমিতে ১ লক্ষ টাকা মূল্যমানের ৩টি ঘর (৩টি টয়লেট সহ) প্রদান করা হয়।

সরেজমিন যাচাইকালে জানা যায়, জয়দার আলী শেখ এর ৩ ছেলে আনুমানিক গত ৮ বছর ধরে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে মালি/ঝাড়ুদার এর কাজ করে আসছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ৩ জনের জমি দেখানো হয়েছে ধলপুর গ্রামে। স্বভাবতই ঘর তিনটিও ধলপুর গ্রামেই নির্মাণের কথা। তবে অনুসন্ধানকালে মোঃ কাবেল হোসেন ও মোঃ সাদ্দাম হোসেন এর ঘর দুইটি পাশাপাশি পাওয়া গেলেও, আশ্রয়ন প্রকল্পে প্রাপ্ত হাবিলের ঘরটি দেখা গেছে ধলপুর থেকে আরো দূরে কাঠগড়া পশ্চিম পাড়ায়! সেখানে তথ্য সংগ্রহে গেলে বেরিয়ে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।

২০১৬ সালের ১৬ মে তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের পরিপত্র (স্মারক নং- ০৩.৭০৩.০১৪.০০.০০.১২৪৫.২০১৫.১৬৬) অনুযায়ী আশুলিয়া ইউনিয়নের জয়দর আলী শেখ এর উল্লেখিত তিন পুত্রের এই ঘর প্রাপ্তি সরকারি নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক। পরিপত্রের ২(ক) অনুচ্ছদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে এই প্রকল্পের আওতায় গৃহনির্মাণের জন্য অনুদান পাওয়ার যোগ্য সুবিধাভোগী কারা। এখানে নির্দেশনা রয়েছে- দুঃস্থ, অসহায় মুক্তিযোদ্ধা, বিধবা মহিলা, স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা, শারীরিকভাবে পঙ্গু ও আয় উপার্জনে অক্ষম, অতি বার্ধক্য এবং পরিবারে আয় উপার্জনক্ষম সদস্য নেই এমন ব্যক্তিই ঘর পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচিত হবেন।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যেখানে জয়দর আলী শেখ এর তিন পুত্র গত প্রায় ৮ বছর ধরে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরিরত এবং তারা উপার্জনক্ষম- তাহলে তারা কিভাবে এই ঘর পেলেন এমন প্রশ্ন ঘর পায়নি এমন অনেকের।

কাঠগড়া পশ্চিম পাড়ায় হাবিল যে এলাকায় ২ শতাংশ জমি দেখিয়ে প্রকল্পের ঘর পেয়েছেন, সেখানের বাসিন্দা বর্ষীয়ান মোঃ তাজুল ইসলাম জানান, এখানে এই ঘর পাবার আগে হাবিলের একতলা টিনশেড বাড়ি ছিলো। সে ওই বাড়িটা বিক্রি করছে, পরে যে জায়গা কিনছে সেটা দেখায়েই সরকার থেকে ঘর পাইছে।

এসময় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই এলাকায় অনেক মানুষ আছে, যাদের জায়গাও নাই, ঘরও নাই। কিন্তু তারা ঘর পাইতেছে না। যারা খাটতে পারে, যাদের লোক থাকে, যারা তদবির করতে পারে, তারাই ঘর পায়।’

অনুসন্ধানে আরও বের হয়ে আসে, কাঠগড়া পশ্চিম পাড়া এলাকায় হাবিল যে বাড়িটি বিক্রী করেছিলো, সেটির পাশেই রয়েছে আরেকটি টিনশেড পাকা ভবন। ওটা থেকে প্রতি মাসে ঘর ভাড়া বাবদ ৯ হাজার টাকা আয় হয় হাবিলের। এব্যাপারে হাবিলের বক্তব্য নিতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়না। তবে তার স্ত্রী সালমা জানান, এই বাড়িটি তার বাবা বানিয়ে দিয়েছেন। এখানে তার মেয়ে থাকে, তারা স্বামী-স্ত্রী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে থাকেন। তবে ওই ভবনের ভাড়াটিয়া পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বললে এ ভবন থেকে হাবিলের প্রতিমাসে ৯ হাজার টাকা আয়ের সত্যতা নিশ্চিত হয়।

তবে এই ভবনটি পরিদর্শনকালে ভয়ঙ্কর যে বিষয়টি সামনে আসে তাহলো- এখানে বসবাসরত তিন পরিবারের রান্নার কাজে ২টি ডাবল গ্যাস চুলা ব্যবহার করা হয়। তবে এই গ্যাস ব্যবহারের জন্য প্রতি মাসে তাদের কোনো বিল দিতে হয়না বলে জানান হাবিলের স্ত্রী সালমা। ভিডিও বক্তব্যে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, এটা অবৈধ গ্যাস, ২০ হাজার টাকা দিয়ে এলাকার আরও অনেকের মতো তিনিও এই সংযোগ লাগিয়েছেন।

বিষয়গুলো নিয়ে হাবিলের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে তাকে কল দেয়া হলে, সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি কথা বলেন নাই। পরবর্তীতে তাকে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেন নাই।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ওই পরিপত্রের ২(ঙ) অনুচ্ছদে উল্লেখ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার তার প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে মাইকিংসহ ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে ঘরের জন্য দরখাস্ত আহবান করবেন। ‘উপজেলা আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প টাস্কফোর্স কমিটি’ প্রকাশ্য সভায় উপযুক্ত পরিবার বাছাইপূর্বক ‘জেলা আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প টাস্কফোর্স কমিটি’র নিকট প্রেরণ করবেন। ‘জেলা আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প টাস্কফোর্স কমিটি’ প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলো যাচাইবাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা সুপারিশসহ নির্দিষ্ট ছকে আশ্রয়ণ -২ প্রকল্প কার্যালয়ে প্রেরণ করবে। প্রকল্প পরিচালক প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলো মূখ্য সচিব এর অনুমোদনক্রমে ঘর নির্মাণের কার্যাদেশসহ প্রয়োজনীয় অর্থ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুকূলে প্রেরণ করবেন। আর ইউএনও’র তত্বাবধানে পিআইসি দ্বারা উপজেলা প্রশাসন সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ঘর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করবে।

আরও উল্লেখ্য, উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে আহবায়ক, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব এবং সহকারি কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) ও সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানকে সদস্য করে গঠিত হয় পিআইসি।

সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধি সমন্বয়ে এতগুলো ধাপ পার হয়ে প্রকল্প সংক্রান্ত উল্লেখিত পরিপত্রের ২(ক) অনুযায়ী সঠিক ব্যক্তিকে ঘর প্রদান করতে না পারাটা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন সাভারের সচেতন মানুষ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সাভারের ইউনিয়নগুলোতে যে ৬০টি পরিবারকে ঘর প্রদানের জন্য সুবিধাভোগী মনোনীত করা হয়েছে, সেখানে জয়দর আলী শেখ এর তিন পুত্রকে নির্বাচন করাটা পরিপত্র অনুযায়ী অনিয়ম হয়েছে কিনা সে প্রশ্নও তোলেন তারা।

জয়দর আলী শেখ এর তিন পুত্রকে আশ্রয়ন-২ প্রকল্পে ঘর নির্মাণের সুবিধাভোগী নির্বাচনের বিষয়ে আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং আশুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এব্যাপারে আশুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এর প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট এলাকা আশুলিয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আশ্রয়ন-২ প্রকল্পে ধলপুর গ্রামের জয়দর আলী শেখ এর তিন ছেলে যে ঘর পেয়েছে, সেটার যাচাইবাছাই তার কিংবা আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে হয় নাই। সাধারণত এলাকার মেম্বারের মাধ্যমে আগ্রহীদের কাগজপত্র গ্রহন করে এসি ল্যান্ডের মাধ্যমে যাচাইবাছাই শেষে কারা ঘর পাবে সেটা নির্ধারণ করা হয়। ওই অর্থবছরে যখন এব্যাপারে প্রস্তাবনা দেয়া হয়, তখন তিনি সাদ্দাম, কাবিল ও হাবিলকে পান নাই। তারা তাকে বলেও নাই যে তাদের ঘর লাগবে, কিংবা এব্যাপারে কোনো কাগজপত্রও তার কাছে জমা দেয় নাই। তারা হয়তো অন্য কোনো মাধ্যমে তারা ঘর নিছে বলেও জানান তিনি।

এব্যাপারে জয়দর আলী শেখ জানান, ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী ওই সময়ে তার বাড়িতে এলেও তিনি বাড়িতে না থাকায় ঘরের বিষয়ে তারসাথে কোনো আলাপ হয়নি।

তবে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের কথা জানিয়েছেন সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাজহারুল ইসলাম।

পরিশেষে, সম্প্রতি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় প্রশাসন ক্যাডারের পাঁচ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে এ সংক্রান্ত পাঁচটি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে দু’জনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলাও হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় প্রতিবেদনে উল্লেখিত ঢাকার সাভারে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আশ্রয়ণ -২ প্রকল্পে ক্ষেত্রবিশেষে সুবিধাভোগী পরিবার নির্বাচনে সরকারী নির্দেশনা অমান্য করা হয়েছে কিনা তা ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেকে।

বার্তাবাজার/পি

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *