আজ ৩১ জুলাই মেজর (অবঃ) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকান্ডের এক বছর। গেলো বছর কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলীয় বাহারছড়া ইউনিয়নের মেরিনড্রাইভ সড়কের শামলাপুর পুলিশি তল্লাশী চৌকিতে বাহার ছড়া তদন্ত কেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলী তৎকালীন টেকনাফ থানার বহিস্কৃত ওসি প্রদীপের নির্দেশে গুলি করে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেন।
ঘটনার পরবর্তীতে পুলিশ একটি গতানুগতিক ভূয়া মামলা রুজু করে। পরবর্তীতে সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় আদালত ১৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে। ঘটনার সূত্র ধরে এক যোগে জেলার সব পুলিশ সদস্যদের বদলি করা হয়। কিন্তু টেকনাফ কমিউনিটি পুলিশের ব্যানারে যেসব দালালরা মাদক বিরোধী অভিযানে সহযোগীতার নামে প্রদীপকে বিপদগামী করেছিলো তাদের বিরুদ্ধে বেশ কটি মামলা হলেও তারা রয়েছে বহাল তবিয়তে।
যে কারনে খুন হয় সিনহা:
গেলো বছর ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষীর স্বাক্ষ্য ও বিভিন্ন ডিজিটাল কন্টেন্টসহ আলোচিত মামলাটির চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিল করেন র্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকান্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ পত্র মতে, গত বছরের ৭ জুলাই ‘জাস্ট গো’ নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলের কাজের জন্য সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সিফাত ও রুফত্তি নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান কালীন স্থানীয় লোকজনের সাথে তাদের সখ্যতা গড়ে উঠে। বিভিন্ন সময় সাধারণ মানুষের কাছে কথিপয় পুলিশের নিপিড়ন অত্যাচার ও টেকনাফ সবেক ওসি প্রদীপের কথিত রাজ্যের কথা জানতে পারেন।
মূলত প্রদীপ প্রচলিত আইন অমান্য করে স্বেচ্ছাচারি হয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা এবং তার অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সিনহা ও তার সঙ্গীরা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ওসি প্রদীপ সরকারি অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করতেন এবং ইয়াবাকেন্দ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব বিষয়ে ওসি প্রদীপের কাছে জানতে ক্যামেরা ও ডিভাইসসহ সিনহা, শিপ্রা ও সিফাত থানায় যান। থানায় যাওয়ার পর তাদেরকে অতিদ্রুত টেকনাফ বা কক্সবাজার ছেড়ে যেতে হুমকি দেয়। তা না হলে ‘তোমাদের আমি ধ্বংস করে দেব’ বলে হুমকি দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে বলে র্যাবের অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়। আর হুমকি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়াটাই সিনহা হত্যার কাল হয়ে দাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছে র্যাব।
ঘটনার দিন সকাল থেকেই সিনহার গতিবিধি নজরে রাখা হয়। সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন। শামলাপুর এপিবিএন পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির নামে গাড়ি থেকে নামিয়ে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদকে খুব কাছ থেকে চারটি গুলি করেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রদীপ কুমার দাশ যখন ঘটনাস্থলে যান, তখনো মেজর সিনহা জীবিত ছিলেন। এ সময় ওসি প্রদীপ সিনহার ‘মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়ের জুতা দিয়ে আঘাত করে’ বিকৃত করার চেষ্টা করেন। এর পরই সিনহার মৃত্যু হয়। পরে লোক দেখানোভাবে তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
হত্যা পরবর্তী ঘটনা:
৩১ জুলাই সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর সিনহার সহযোগী সিফাত ও সিপ্রা দেবনাতকে আটক করে পুলিশ। অভিযানে সিনহার গাড়ী ও কটেজ তল্লাশী করে মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলে একাধিক মামলায় শাহেদুল ইসলাম সিফাত ও সিপ্রা দেবনাতকে আদালতে প্রেরণ করে। তবে ৯ আগষ্ট সিপ্রা ও ১০ আগষ্ট সিফাত ২টি মামলায় জামিন লাভ করে।
৩১ জুলাই রাতে তৎকালীন এসপি মাসুদের সাথে ওসি প্রদীপের ফোনালাপ ফাঁস হয়। সেখানে ওসি প্রদীপ লিয়াকতকে গুলি করতে বলার বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর গণমাধ্যম ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’ হত্যাকান্ডের বিষয়ে সোচ্চার হলে ঘটনার মোড় পাল্টে যায়।
৫ আগষ্ট মেজর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ জুডিসিয়িাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পরিদর্শক লিয়াকত আলিকে প্রধান ও ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওইদিন রাতেই টেকনাফ থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। মামলার তদন্ত ভার দেয়া হয় র্যাব-১৫ কে।
৬ আগস্ট বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকতসহ মামলার ৭ আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এতে র্যাব আদালতে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করলে বিচারক ইন্সপেক্টর লিয়াকত, ওসি প্রদীপ এবং এসআই দুলাল রক্ষিতকে ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর এবং ৪ জন আসামিকে ২ দিন করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। এছাড়া অনুপস্থিত থাকা বাকি ২ আসামিকে পলাতক দেখিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। তার ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বরে জেলার সকল পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়।
মামলার তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় ৩ জন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ৩ সদস্য এবং প্রদীপের দেহরক্ষীসহ আরো মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। চলতি বছর ২৪ জুন মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামী কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসে। কারাগারে থাকা অভিযুক্ত ১৫ আসামি হলেন বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, দেহরক্ষী রুবেল শর্মা, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন ও সাগরদেব। আসামীদের মধ্যে ১২ জন নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। শুধু ওসি প্রদীপ, কনস্টেবল রুবেল শর্মা এবং সাগর দেব আদালতে জবানবন্দি দেননি।
মামলার বর্তমান কার্যক্রম:
করোনার কারনে দীর্ঘদিন আদালতের কর্যক্রম বন্ধ থাকার পর সাবেক ওসি প্রদীপ ও এসআই নন্দদুলালের জামিন চেয়ে গত ১০ জুন আদালতে আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু ওই দিন আদালতে নথি উপস্থাপন না হওয়ায় শুনানির দিন ধার্য করা হয়নি। ১৩ জুন এ নিয়ে পুনরায় আদালতে আবেদন করা হয়। আদালত আবেদনটি আমলে নিয়ে ২৬,২৭ ও ২৮ জুন স্বাক্ষ্য গ্রহনের দিন ধার্য্য করেন। কিন্তু কঠোর লকডাউনের কারণে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকাতে তা আর হয়নি।
বাদী পক্ষের আইনজীবি এডভোকেট মোহাম্মদ মোস্তফা ‘বার্তা বাজার’কে বলেন- শুধু মাত্র করোনায় লকডাউনে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বর্তমানে মামলার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আদালত চালু হলে মামলার কার্যক্রম ফের শুরু হবে।’
ধরা ছোয়ার বাইরে স্বীকৃত দালালরা:
এদিকে স্থানীয়দের মতে, টেকনাফ থানায় যোগদানের পর প্রদীপের শুরুটা ভালোই ছিলো। কাজের সুবিদার্থে তিনি কমিউনিটি পুলিশকে সাজিয়ে ছিলেন। কিন্তু কৌশলে কিছু মুখোশধারী মাদক কারবারীদের পৃষ্টপোষকতাকারী কমিটিতে জায়গা করে নেয়। তারাই মূলত প্রদীপকে ভূলবাল বুঝিয়ে বিপদগামী করে এবং পরবর্তীতে তাদের দেখানো পথ থেকে আর্থিক লোভের কারনে ফিরে আসতে না পেরে তিনি আরো বিপদগামী হয়ে উঠেন। অনুসন্ধানে কপু নেতা নূরুল হোসেন, রফিক, আজিজ, কিফায়েত উল্লাহ, হারুন সিকদার, চৌকিদার বেলাল, তৈয়ুব, দিদার সহ অন্তত দেড় ডজন দালালের নাম উঠে আসে।

সে সময় নূরুল হোসেন নামক প্রদীপের স্বীকৃত দালাল ক্রসফায়ার ও থানা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে চাপের মুখে কিছু টাকা ফেরত দিয়েছে। এরকম অসংখ্য অডিও ক্লিপস ও ভাইরাল হয়েছে। নূরুল হোসেইন ও আজিজের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা আদালতে চলমান রয়েছে এসংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য ‘বার্তা বাজার’র হাতে রয়েছে।
তৎককলীন র্যাবের মিডিয়া পরিচালক মাসুম বিল্লাহ গনমাধ্যমে এসে নাফ টিভি নামক একটি কথিত ফেইসবুক টিভির মাধ্যমে এসব দালালদের ব্যবহার করে প্রদীপ তার সমস্ত অপকর্মকে বৈধতা দিতে প্রচার চালাতেন বলে দাবী করেছিলেন। ওই ভূয়া চ্যানেলটি প্রদিপের নির্দেশে সিনহা হত্যাকান্ডের কিছুক্ষন পরে একটি পাতানো নিউজ প্রচার করে হত্যা কান্ডের ঘটনাকে ভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা করে। অতীতের দূর্নাম ঘুচাতে ফের বিতর্কিত কিছু ব্যক্তি দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে কথিত টিভি চ্যানেলটিকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হয়েছে চক্রটি।
সুশীল সমাজের দাবী, সিনহা হত্যার আসামীদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। স্বীকৃত এসব দালালদের প্ররোচনায় ও সহযোগীতায় প্রদীপ বাহিনীর হাতে অসংখ্য নিরিহ মানুষ খুন হয়েছে। সুতরাং দালালদের আইনের আওতায় আনা না গেলে তাদের অত্মার প্রতি অবিচার করা হবে।
বার্তাবাজার/পি