নকশিকাঁথায় জীবনগাথা পাকুন্দিয়ার আমেনা খাতুনের

হালকা ঠান্ডা, বৃষ্টি বা হাওয়ার সময় বাঙালী ঘুমোতে যাওয়ার আগে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির কথা মনে পড়ে সেটি হলো কাঁথা। সেটি হতে পারে নকশা করা বা নকশা ছাড়াই। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি আর গ্রামীণ কুটিরশিল্পের একটি বড় জায়গা দখল করে আছে কাঁথা। যদিও বেড়েছে কাঁথার জনপ্রিয়তা কিন্তু কালের পরিক্রমায় কমেছে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। বাঙালী নারীদের সুঁই সুতো হাতে কাঁথা সেলাই চিরচারিত অভ্যাস হলেও তারা এখন আর কাঁথা সেলাই করতে চায় না।

কিন্তু অর্ধশত বছর ধরে কাঁথা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চন্ডিপাশা ইউনিয়নের বড়আজলদী গ্রামের আমেনা খাতুন। এখনো জীবীকার একমাত্র পেশাই এটি। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে উনার বয়স প্রায় সত্তর। বিয়ে হয়েছিল একই উপজেলার পাটুয়াভাঙ্গা গ্রামের এরশাদ আলীর সঙ্গে, মাত্র ষোল বছর বয়সে। বিয়ের তিন বছরের মাথায় এক সন্তান রেখে স্বামী এরশাদ আলী চলে যান না ফেরার দেশে।

স্বামী মারা যাওয়ার একবছরের মাথায় সন্তান নিয়ে চলে আসেন বড়আজলী গ্রামে বাপের বাড়ীতে। কিন্তু বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল হওয়ায় পেশা হিসেবে বেচে নেন মায়ের কাছ থেকে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। সেই থেকে এখন অবধি সেটাই করে যাচ্ছেন আমেনা খাতুন। তার কাজের অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পাননি সঠিক সম্মানী।

আমেনা খাতুন জানান, কাঁথা প্রতি পাই মাত্র ৩০০-৪০০ টাকা। প্রতিমাসে সেলাই করতে পারি তিন থেকে পাঁচটি। বয়স অনেক হইছে, কাঁথা সেলাই করতে কষ্ট হলেও পেটের দায়ে এখনো করে যাচ্ছি।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার স্বামী মারা গেছে প্রায় পঞ্চাশ বছর অতিবাহিত হলেও আমি পাইনি বিধবা ভাতা বা বয়স্ক ভাতার মতো কোন সরকারি সহায়তা। এমনকি করোনাকালীন কোনো ত্রান ও এই নকশিকাঁথা কারিগরের ঘরে পৌছায়নি। বার বার স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে গেলে মেলে শুরু প্রতিশ্রুতি। কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে দুই হাজার টাকা নিয়েছিল এক জনপ্রতিনিধি তারপর কার্ড দিতে না পেরে একশো দুইশো করে টাকা ফেরৎ দেয় ঐ জনপ্রতিনিধি। চেয়ারম্যান মেম্বারের পিছনে ছুটতে ছুটতে এখন ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। এখন যতটুকু পারি কাজ করে খাই। শুনেছি সরকার সাধারণ মানুষকে খুব সহযোগিতা করে। যদি কোন সরকারি সহযোগিতা পাই তাহলে খুবই উপকৃত হব, শেষ জীবনে একটু সুখে কাটাতে পারিব।

সরেজমিনে দেখা যায়, নাতির বৌ নিয়ে ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস। ছেলে সরকারের দেওয়া আশ্রয় প্রকল্পে বসবাস করেন। জীবিকা নির্বাহ করে রিকশা চালিয়ে। বয়সের কারণে ঠিক মতো কাজ করতে পারেনা। একদিন কাজ করিলে দুই দিন ঘরে থাকতে হয়। তাই মা আমেনা খাতুনকে দেখাশোনা করতে পারেনা। বৃষ্টির মধ্যেই নকশিকাঁথা সেলাই করছেন আমেনা খাতুন। নামাজের সময় হলে একটু গুছিয়ে রেখে নামাজ পড়েই আবার নকশীকাঁথা সেলাই শুরু করেন আমেনা খাতুন। প্রতিবেশীরা গল্প ও সেলাই কাজে সহযোগিতা করেন।

এ বিষয়ে চন্ডিপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন বলেন, আমেনা খাতুনের সমস্ত কাগজ পত্র আমার আছে বিগত দুই বছর ধরে আছে। দুই বছরে নতুন কোন কার্ড হয়নি, শুনছি ঈদের পর নতুন বিধবা ভাতার কার্ড দিবে তখন আমেনা খাতুনের কার্ডটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হবে।

এবিষয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, গত অর্থ বছরে আমাদের কোনো বরাদ্দ না থাকায় কোনো কার্ড দেওয়া হয়নি। তবে এই অর্থবছরে পাকুন্দিয়ার যত মানুষ আছে (বিধবা হলে বিধবা ভাতা, বয়স্ক হলে বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী হলে প্রতিবন্ধী ভাতা) পাবেন। এক্ষেত্রে আমি আশাবাদী আমেনা খাতুন ভাতা পাবেন এবছরই। আমাদের এখন গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা লাগবে। যখন আমরা প্রচার করব শতভাগ ভাতার আওতায় আসবে। পাকুন্দিয়ায় তখন একশ্রেণীর দালাল মানুষের কাছ থেকে টাকা পয়সা নিবে। কারণ সবাই ভাতা পাবে খুব শীঘ্রই এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেবে তারা। খুব শীঘ্রই একটি প্রেস ব্রিফিং করে জানিয়ে দিব সমাজসেবা থেকে সকলে ভাতা সুবিধা নিতে পাবেন। তার জন্য কাউকে কোনো টাকা দিতে হবে না। এই অর্থবছর পাকুন্দিয়া শতভাগ ভাতার আওতায় আসবে বলে জানান এই অফিসার।

সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি আর গ্রামীণ কুটির এই শিল্পকে যথাযথ রক্ষানাবেক্ষণ এবং কারিগরদের সঠিক সম্মানীর ব্যবস্থা করলে প্রাচীন এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

হুমায়ুন কবির/বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর