সিরাজগঞ্জে হঠাৎ করে কুকুরের উপদ্রব বেড়েছে। প্রতিদিন কুকুরে আক্রান্ত রোগী ভিড় করছে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে। সদর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে কুকুরের কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে মানুষ চিকিৎসার জন্য আসছেন। উপদ্রব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দিনে ২৮ জন পর্যন্ত কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগী আসছে চিকিৎসা নিতে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) সরেজমিন গেলে হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে ২ হাজার ৬২৮ জন এবং অন্যান্য বন্য প্রাণীর কামড়ে ১ হাজার ৪৮৯ জন চিকিৎসা নিয়েছে। আইনি বাধ্যবাধকতায় কুকুর নিধন করতে না পারা এবং সময়মতো টিকার আওতায় না আনার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জলাতঙ্ক রোগের আতঙ্ক ভর করছে। তাই তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে।
প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে কুকুরের কামড়ে রোগী জেনারেল হাসপাতালে আসে। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানান দিনে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন কুকুরে আক্রান্ত রোগী আসে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতিকালে রোগী বেশি আসছে। অনেক সময় ২৫ জনের বেশি রোগীও আসে। এ মাসের ১৫ দিনের মধ্যে ১০ জুলাই সবচেয়ে বেশি ২৮ জন রোগী আসে।
কুকুর কামড়ালে রায়গঞ্জ থেকে জেনারেল হাসপাতালে টিকা নিতে আসা জিয়া সেখ (৪৪) বলেন, বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে ডান পায়ে কুকুড় কামড়ে রক্ত বের করে দেয়। তাই হাসপাতালে টিকা নিতে এসেছেন। তার সঙ্গে আসা এক স্কুল শিক্ষক বলেন, আগে কুকুরকে টিকা দিয়ে রং করে দিতো। আর সে গুলো দেখিনা। একই দিন চিকিৎসা নিতে আসা সদর উপজেলার আব্দুল আওয়াল (৬০) বলেন, কুকুরের কামড়ের রোগীকে চার দফায় হাসপাতালে টিকা নিতে হয়। শুধু কুকুর নয়, বিড়াল, বানর, শিয়াল, বেজি, চিকার মাধ্যমেও জলাতঙ্ক হতে পারে। কুকুর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আসলে কার ?
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স আরিফুল হক বলেন, র্যাবিস ভাইরাসের টিকা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। এ ছাড়া টিটানাস, ইআরআইজিসহ কয়েকটি ওষুধ নিয়মিত নিতে হয় কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীকে। জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত কুকুরের কামড় খেয়ে টিকা না নিলে মানুষেরও জলাতঙ্ক হয়। এ জন্য আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।
সিরাজগঞ্জ জজ কোটের আইনজীবি এ্যাড. মো. আব্দুল মালেক খান ভাসানী জানান, গত বছর সংসদে পাস হওয়া ‘প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯’ অনুযায়ী কোনো প্রাণী হত্যা করলে ছয় মাসের জেল অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে প্রাণীর প্রতি যে কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, কুকুর এবং বন্য প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নিয়মিত ভাবে র্যাবিস টিকা দেয়া হচ্ছে। টিকার কোন সংকট নেই। তবে সিরাজগঞ্জে এই রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মনির হোসেন এ বিষয়ে বলেন, কামড়ের পর আক্রান্ত স্থান ক্ষারযুক্ত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এ ছাড়া দ্রুত সময়ে টিকা নেওয়া দরকার। হাসপাতাল থেকে টিকা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। এ ছাড়া কামড়ের মাধ্যমে যে ভাইরাস ঢুকেছে তার কার্যকারিতা হ্রাস করার জন্য এআরজি নামে একটি ইনজেকশন দিতে হয়। সেটি বেসরকারিভাবে কিনে নিতে হয়। ওটা কিছুটা দামি।
কুকুরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে জেলার শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একসময় কুকুর নিধন কর্মসূচি চালাত। কিন্তু আদালতের নির্দেশের কারণে তা আর করা যাচ্ছে না। এরপর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় কুকুরের টিকাদানের একটি কর্মসূচি ছিলো। কিন্তু গত বছর থেকে তা হচ্ছে না। ফলে কুকুরের উপদ্রব বেড়েছে। কুকুরের বংশবিস্তার ও রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. রামপদ রায় বলেন, জাতীয় জলাতঙ্ক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি জেলা প্রাণিসম্পদ বাস্তবায়ন করে। এবার পালন করেছে কিনা আমার জানা নেই।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শাহাবুদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, জলাতঙ্কমুক্ত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলো। কিন্তু সেটি এখন চালু নেই। তবে কেউ কুকুরকে টিকা দিতে চাইলে নিকটস্থ প্রাণিসম্পদ অফিসে নিদিষ্ট খরচ বহন করে টিকা দিতে পারবে।
এম এ মালেক/ বার্তা বাজার/টি