সরকারি আবাসনে সীমাহীন দারিদ্র্যতার মাঝে থেকে ইজিবাইক চালক কাদের মোল্লা পরম যত্নে পালন করেছেন ফ্রিজিয়ান জাতের একটি বিশালাকার ষাড়। কালো ষাড়টির বিশাল দেহ আর রাজকীয় চেহারার জন্য নাম দিয়েছে গরিবের রাজা। যা এবারের কোরবানির বাজারে অত্র এলাকার সবচেয়ে বড় ষাড়ের স্বীকৃতি পেয়েছে।
দূর-দুরান্ত হতে ষাড়টি দেখতে বাড়িতে ভিড় করছেন মানুষ। ভূমিহীন কাদের ষাড় বিক্রির টাকায় একমাত্র সন্তানের জন্য জমি কিনে বাড়ি করে দেয়ার স্বপ্ন দেখছেন। ষাড়টি চুরি হওয়ার ভয়ে নিজের টিনের ঘরের পাশে ইটের দেয়াল তুলে আটকে রেখেছেন। বিক্রির পরই দেয়াল ভেঙে বের করা হবে রাজাকে। কাদেরের সফলতা দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন আশ্রায়নে অন্য বাসিন্দারা।
তিন বছর আগে স্থানীয় রামনগর হাট হতে ৩৯ হাজার টাকায় ১ বছর বয়সের ফ্রিজিয়ান বাছুরটি ক্রয় করেন ইজিবাইক চালক কাদের। এর পর থেকে নিজে খেয়ে না খেয়ে খাবার জুগিয়েছেন তার। ইজিবাইক চালিয়ে সামান্য আয় উপার্জনের অধিকাংশই অর্থই ব্যয় করেছেন একমাত্র সম্বল ফ্রিজিয়ান জাতের এই ষাড়টির পেছনে। ষাড়টির ওজন আজ প্রায় ২০ মন বলে দাবী তার। উচ্চতায় সাড়ে পাচ ফিট, সাড়ে সাত ফিট লম্বা চার বছর বয়সী ষাড়টির দাম হাকছেন ১২ লক্ষ টাকা। তবে বাজার অনুপাতে ন্যায্য মূল্য পেলেই ষাড়টি বিক্রি করবেন তিনি। বিক্রির পর দেয়াল ভেংগে বাহিরে আনবেন তার গরিবের রাজাকে।
তবে করোনা পরিস্থিতিতে তার সে স্বপ্ন পূরণ নিয়ে শংকায় পড়েছেন মাগুরা রামনগর দুর্গাপুর আশ্রায়নের দরিদ্র কাদের।
কাদের জানান, অনেক সপ্ন ও সাধ করেই ৩৯ হাজার টাকায় ফ্রিজিয়ান জাতের একটি গরুর বাছুর কিনে পালন করছেন যার নাম দিয়েছিলেন রাজা। স্বামি স্ত্রী মিলে পরম যত্নে লালন পালন করছেন রাজাকে। তার মতো গরিবের সংসারে উন্নত জাতের রাজকীয় চেহারার ষাড়টি বেড়ে ওঠায় গরিবের রাজা নাম দিয়েছেন তিনি।। ইজি বাইক চালিয়ে সামান্য উপার্জনের অধিকাংশই ব্যয় করেছেন রাজার খাবার জোগাতে। তবে বিদেশি জাতের হোলেও দেশীয় পদ্ধতিতে ঘাস, গমের ভুসি, খুদ ইত্যাদি খাবার খাইয়েছেন তিনি।
এ বছর কোরবানি ঈদে ভালো মূল্যে বিক্রি করে সন্তানের জন্য এক টুকরো জমি ও ঘর তুলে দিতে চান ভুমিহীন কাদের। ভাগ্যকে ফিরানোর সপ্ন দেখেন তিনি। আবাসনের নিজের টিনের ঘরের কোনে চুরির ভয়ে ইটের দেয়াল ঘিরে গোয়ালে আটকে রেখেছেন রাজাকে। নিজের আসা যাওয়া জন্য সামান্য একটু দরজা রাখা আছে যেখান দিয়ে রাজাকে বের করার উপায় নেই। এক বছরের অধিক সময় ধরে বন্দি হয়ে আছে শান্ত স্বভাবের রাজা। দেখতে আসা সকলেই গায়ে হাত বুলিতে আদর করে শান্ত রাজার। ষাড়টি বিক্রি করে ভাগ্য বদলাবেন সে আশায় দিন গুুনছেন পুরো পরিবার।
কিন্তু করোনা মহামারীর কারনে বিক্রীর জন্য তেমন সাড়া পাচ্ছেন না তিনি। সবশেষে লকডাউনের কারনে ইজিবাইক বন্ধ থাকায় নিজের আয়ের পথও বন্ধ। অনেকের থেকে ধার দেনা করেই রাজার খাবার জোগান দিচ্ছেন তিনি। আগেও দেনা হয়ে রয়েছেন। এখনও বড় ব্যাপারীরা না আসায় বিক্রির জন্য তেমন সাড়া পাচ্ছেন না। ঢাকায় বড় হাটে নিয়ে যাবার সে সাধ্যিও নেই তার। এ অবস্থায় বন্দী রাজার দেয়াল ভেঙ্গে বের হওয়া ও কাদেরের স্বপ্ন নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে।
কাদের বলেন, গরিব মানুষ আমি অনেক সপ্ন ষাড়টিকে নিয়ে সন্তানের মতো লালন পালন করেছি । এটিই এখন একমাত্র সম্পদ। ষাড়টি ন্যায্যমুল্যে বিক্রির জন্য চিন্তায় পড়ছেন। অনেকে অনলাইনে বেচাকেনার কথা বলছেন। কিন্তু কোন ধারনা না থাকায় রাজার সঠিক মুল্য পাওয়া নিয়ে শংকায় পড়েছেন তিনি। কোরবানির বাজারে ষাড়টির ন্যায্যমূল্য পেতে জেলার স্থানীয় ক্রেতাদের সুদৃষ্টি কামনা করছেন দরিদ্র কাদের মোল্লা।
মাগুরা হতে রামনগর আশ্রয় কেন্দ্রে ষাড় দেখতে আসা যুবক টুটুল জানান, মানুষের মুখে ষাড়টির গল্প শুনে দেখতে এসেছেন তিনি। আশ্রায়নে এই স্থানে এইরকম বড় ষাড় তৈরী করে কাদের মোল্লার বিশেষ নজির তৈরী করলেন। যা দেখে অবাক হয়েছেন তিনি। স্থানীয়রা বলছেন এ বছর কাদেরের গরিবের রাজাই অত্র অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ষাড়।
আশ্রায়নে কাদেরের প্রতিবেশী মনিকা খন্দকার, শফি মন্ডলসহ অন্যান্যরা জানালেন, কাদের সামান্য উপার্যনে ইজিবাইক চালিয়ে নিজে খেয়ে না খেয়ে ষাড়টির খাবার জুগিয়েছেন। তার এই সফলতায় দেখে অন্যরাও তার মতো অন্তত একটি করে ষাড় পালনের জন্য অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। দরিদ্র কাদের মিয়ার ষড়টি বিক্রি করে স্বপ্ন পুরন হোক, তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটুক এমনটি আশা করছেেন আশ্রায়নের প্রতিবেশীরা।
স্ত্রী শেফালী বেগম জানালেন, এ-ই গরুটি তাদের একমাত্র সহায় সম্বল। দিনরাত প্ররিশ্রম করে নিজেরা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। স্বামীর সামান্য উপার্যনের অধিকাংশই খরচ করেছেন রাজার জন্য। তাদের দুইজনের স্বপ্ন রাজাকে বিক্রি করে একমাত্র সন্তান ইসমাইলের জন্য এক টুকরো জমিতে বাড়ি তৈরী করে দিবেন। সাথে ছোট বাণিজ্যিক গরুর খামার গড়ার সপ্নও দেখেন তারা।
সম্বল বলতে এই গরুটি ছাড়া কিছুই নেই তায় সেটি চুরি হওয়ার আশংকায় অনেক কষ্টে গেলো বছর ইটের দেয়াল তুলে গোয়াল ঘর তৈরী করেছেন। একপাশে সামান্য একটু চলাচলের জায়গা বাদে পুরোটাই আটকে দিয়েছেন চোরের ভয়ে। রাজার বিশাল দেহখানি বের হবার উপায় নেই। এক বছর হয় ঘরেই আটকা পড়ে আছে রাজা। মাথা বের করে সকলের ডাকেই সাড়া দেয় তাদের স্বভাবের রাজা। বাড়ির ছোটদের সাথেও দারুন সখ্যতা তার। চারদিকে ধার দেনা করা, একমাত্র সম্বল রাজা বিক্রি না হলে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে তাদের।
তাছিন জামান/বার্তা বাজার/মেরাজ