হাতের আঁচড়েই উঠে যাচ্ছে পাকা ঘরের মেঝে

হাতের আঁচড়ে উঠে যাচ্ছে সরকারি খাস জমির ওপর তৈরি করা আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাকা ঘরের মেঝে। জাদু কিংবা কৌশল নয়, ঘরের এ বাস্তবতা মিলেছে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায়। উপকারভোগীরা ঘরে উঠার আগেই এমন হাল দেখে হতবাক সবাই। মেঝে দেবে যাওয়া ঘর গুলো আবার জোড়াতালি দেয়াচ্ছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।

উপজেলা নির্বাহী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্য ২০২০-২১ অর্থবছরে দুইশতক খাসজমি প্রদানপূর্বক ভূমি ও গৃহহীনদের জন্য এ উপজেলায় ৯০টি ঘর বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ৬০টি ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৩০টির কাজ শেষ না হওয়ায় হস্তান্তর করা হয়নি।

বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) সরেজমিন ওই উপজেলার জামতৈল ইউনিয়নের মধুনান্দিনা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর উপহার আশ্রয়ণ প্রকল্প-২’র আওতায় নির্মিত ৫টি ঘর। কাজ শেষ হয়েছে প্রায় চার মাস আগে। অথচ, উপকারভোগীরা ঘরে ওঠার আগেই ঘরগুলোর মেঝে ও বারান্দার বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ফাটল। দেবে গেছে প্রতিটি ঘরের মেঝে। বারান্দার কয়েকস্থান থেকে পলেস্তারা উঠে গেছে। এসব ঘরগুলো নির্মাণ করা হয় পিআইও’র তত্বাবধানে। সংস্কার কাজও চলছে তার তত্বাবধানে। কাজের সাইডে রয়েছেন তার খরচে রাখা কর্মচারী রুহুল আমিন।

তিনি জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের জায়গাটি নিচু হওয়ায় কাদামাটি ফেলে ভরাট করে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। যে কারণে কিছু স্থানে দেবে গেছে। এগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। নির্মাণাধীন এ ঘরগুলো দেখেই বোঝা যায় ব্যবস্থাপনায় ছিল বড় গরমিল। আশ্রয়কেন্দ্রটির এ অবস্থা দেখে যে কারো চোখ কপালে উঠার মতো।

উপকারভোগী এক নারী জানান, প্রধানমন্ত্রী ঘর দিয়েছেন কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেটি আমরা হাতে পাইনি। দলিলও পাইনি, ঘর গুলো দেবেও গেছে। আরেক নারী জানান, আমরা ঘর পাইনি আর সর ঘরের মেঝে দেবে গেছে।

ভ্যানচালক শহীদুল ও স্থানীয় পারভীন খাতুনসহ আরও অনেকেই জানান, নির্মাণ কাজ নিয়মিত পর্যবেক্ষন করা হয়নি। অদক্ষ লোক ও জোড়ালাগানো কাঠ দিয়ে একদিনে সবগুলো ঘরের চালা ও বারান্দার ছাউনি করা হয়েছে। যে কারণে অনেক জায়গায় ত্রুটি রয়েছে। অল্প বৃষ্টিতেই ঘরে পানি ঢোকে। এছাড়া, বালু ও সিমেন্ট সঠিক অনুপাতে ব্যবহার করা হয়নি। ইট ব্যবহার করা হয়েছে অতি নিম্নমানের। ভ্যান থেকে নামাতেই ভেঙে যেতো। কর্মকর্তা নিজে কাজ করায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি বলে জানান তারা। এছাড়াও

চরবাশবাড়ীয়া গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩০টি ও উপজেলা পরিষদের ১টি ঘর রয়েছে। যার সিংহভাগ ঘরের কাজ এখনও শেষ হয়নি। পিআইও’র পছন্দনীয় পার্শ্ববর্তী উল্লাপাড়া উপজেলার এরশাদ নামে এক ব্যক্তি এ নির্মাণ কাজের দায়িত্বে রয়েছেন। তার অধিনে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে স্কুলছাত্র, ইট খোলা ও গার্মেন্ট শ্রমিক জুবায়ের, আরিফুল ইসলাম, শাহীন রেজা, রমজানসহ আরো কয়েকজন কিশোর। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তারা জানায়, প্রতিবস্তা সিমেন্টের বিপরীতে কয় বস্তা বালু দেয়া হচ্ছে তা তারা জানে না। কারণ তাদের এ কাজের কোন অভিজ্ঞতা নেই। তবে, নিম্নমানের ইট দিয়ে ঘর নির্মাণের কথা শিকার করে তারা।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়- পিআইও মোছা. আয়শা সিদ্দিকা ১২ জুন ২০১৯ ইং তারিখে কামারখন্দ উপজেলায় যোগদান করেন। এরপর অফিস সহকারী নাসিরসহ কয়েকজন কর্মচারীকে নিয়ে সীমাহীন দুর্ণীতি, ঘুষবাণিজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতায় জড়িয়ে পড়েন। চলমান তার এমন কর্মকান্ডে অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে অফিস পড়ায়। তিনি বিভিন্ন অপকর্ম করার জন্য সরকারি কর্মচারির বাইরে নিয়ম বহিঃর্ভূতভাবে ঘুষের টাকা দিয়ে তিনজন ব্যক্তিগত কর্মচারি রেখেছেন। এছাড়া, পিআইও আশ্রায়ণ প্রকল্পের বরাদ্দকৃত ঘর নির্মাণে কমিটির সদস্যদের ধার ধারেননি। এমন কি মাসিক সমন্বয় সভায়ও ঘর নির্মাণসহ কোন কার্যক্রম অবহিত করা হয়নি। অথচ, নিজস্ব অনভিজ্ঞ লোকদিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

অপরদিকে, ২০২০-২১অর্থবছরে জয়েন বড়ধুল পশ্চিমপাড়া আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ি হতে মাজেম সরকারের জমি পর্যন্ত কাবিটা’র নতুন রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের পিআইসি’র সভাপতি উম্মেনূর পিয়ারা উপজেলা চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগে বলেন, ১ম পর্যায়ের একটি সাধারণ কাবিটা প্রকল্পের ৪র্থ কিস্তির টাকা দিতে পিআইও ৩০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আরও টাকা দাবি করেন তিনি। এতে রাজি না হওয়ায় নানা অজুহাতে তিনি সময় ক্ষেপন করে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছেন।

একই অর্থবছরে বাড়াকান্দি তহেজ সরকারের বাড়ির মোড় হতে কয়েলগাতি পাকা রাস্তা পর্যন্ত সংস্কার প্রকল্পের পিআইসি ও উপজেলা আ.লীগের সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, কাজ শেষ হলেও পিআইও নানা অজুহাতে বিল পরিশোধে টালবাহানা করছেন। তাছাড়া, তিনি অত্যন্ত বদরাগী। বিনা কারণে মুক্তিযোদ্ধাসহ সবার সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। নাটোর সদর, পাবনার চাটমোহরসহ পূর্বতন বিভিন্ন কর্মস্থলেও তিনি একই ধরনের কর্মকান্ড ঘটিয়েছেন। যা ফেসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

চরট্যাংরাইল পূর্বপাড়া গুণির বাড়ি হতে রফিকুলের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের পিআইসি’র সভাপতি মোছা. বিউটি খাতুন বলেন, শতভাগ কাজ সমাপ্ত করা সত্বেও শেষ বিল প্রদানের জন্য পিআইও ২২হাজার টাকা ঘুষ নেন। অথচ, অর্থবছর পেড়িয়ে গেলেও সে বিল পরিশোধ করা হয়নি। এদিকে, কাজের বিল না দিয়ে পিআইও টাকাগুলো অব্যয়িত দেখিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

এদিকে ভূমিহীন ও গৃহহীনকে স্থায়ী ঠিকানা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর মহতি উদ্যোগ নিয়ে অনিয়মকারীদের রিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান সিরাজগঞ্জ- ২ (সদর ও কামারখন্দ) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না। তিনি মুঠোফোনে বলেন, যদিও বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে যারা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে অব্যবস্থাপনার আশ্রয় নিয়েছে ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়েছে তদন্তসাপেক্ষ আমি তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবি করছি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আয়শা সিদ্দিকা তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ মাপ-জরিপ করে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আর মধুনান্দিনা গ্রামের আশ্রয়ন প্রকল্পে দুয়েকটি ঘরের মেঝে দেবে যাওয়ায় সে গুলো সংস্কার করা হচ্ছে।
আশ্রয়ন প্রকল্পের আহ্বায়ক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. মেরিনা সুলতানা বলেন, পিআইও’র তত্বাবধানে কাজগুলো করা হচ্ছে। তবে, জামতৈল ইউনিয়নের মধুনান্দিনা গ্রামের আশ্রয়ন প্রকল্প কাজে কিছু ত্রুটি থাকায় সেগুলো তিনিই সংস্কার করে দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসএম শহীদুল্লাহ সবুজ বলেন, পিআইও’র দুর্ণীতি, ঘুষবাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে উপজেলা আ.লীগের সভাপতি, প্রকল্প সভাপতি ও সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্যগণের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।

এম এ মালেক/বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর