জমি লিখে না দিয়ে তালাক দেওয়াই কাল হয়ে দাঁড়ায় মোসলেমার!
বাড়িসহ জমি লিখে না দিয়ে তালাক দেওয়াই কাল হয়েছে এমটি দাবি করেছে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয় মোসলেমা। গত ২৭ জুন ২য় স্বামী রফিকুল সাড়ে চার বছরের শিশু সন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়ে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে তাকে। এরপর হত্যার পর লাশের প্রমাণ নষ্ট করতে শরীর থেকে হাত, পা ও মাথা কেটে আলাদা করে ইছামতী নদীতে ফেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মোসলেমার পরিবার।
হাড়দ্দহ মাঝেরপাড়ার আমানত আলীর ছেলে আমজাদ হোসেন(৬৮) জানান, গত ২৭ জুন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে রউফ চেয়ারম্যানের মোড়ে একটি মাইক্রোবাস থেকে নামে রফিকুল ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী মোসলেমা। সাড়ে ১৩ হাজার টাকা মাইক্রোবাস ভাড়া দেয় তারা। তাদের পাড়ায় মোসলেমার জন্য নির্মিত বাড়িতে প্রথমে ঢোকে রফিকুল। পরে যায় মোসলেমা। রাস্তা থেকে নামার সময় মোসলেমার জুতো ছিঁড়ে যায়। বিকেল ৫টার দিকে মোসলেমার বাবা ও মা ওই বাড়িতে এসে বাইরের দিক থেকে তালা মারা দেখে। তারা আমাকেসহ স্থানীয় লোকজনদের মেয়ের বিপদ সম্পর্কে অবহিত করেন। তারা আড়াই ঘণ্টা অবস্থান করে স্থানীয় চেয়রাম্যন ইসরাইল গাজীকে বিষয়টি অবহিত করে বাড়িতে চলে যান।
পরদিন সকালে মোসলেমার বাড়িতে ঢোকার মুখে পার্শ্ববর্তী একটি তালা গাছের নীচ থেকে পলিথিনে রাখা একটি কালো রং এর বোরখা দেখতে পাওয়া যায়।
মোসলেমার মা শাহীদা খাতুন বলেন, আট বছর আগে মোসলেমার সঙ্গে লক্ষীদাড়ি গ্রামের নূর আলী গাজীর ছেলে মফিজুলের বিয়ে হয়। তিন বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সে মারা যায়। এরপর দেড় বছরের ছেলে মোস্তাকিমকে নিয়ে মোসলেমা একবার বাপের বাড়ি ও একবার শ্বশুর বাড়িতে যাতায়াত করতো। এরমধ্যে সে সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড় বাজার থেকে বিভিন্ন ধরণের কসমেটিকস সামগ্রী ভোমরা বন্দরের জাহাঙ্গীর মার্কেটের পাশে রফিকুল বিশ্বাসের দোকানসহ বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করতো। জমি ও বাড়ি করে দেওয়ার শর্তে দু’বছর আগে ভালবেসে হাড়দ্দাহ গ্রামের বাবর আলীর ছেলে রফিকুল (ভোমরার ব্যবসায়ি) সন্তানসহ মোসলেমাকে বিয়ে করে।
পরে আগের পক্ষের ছেলেকে মেনে নিতে না পারায় আমাদের কাছে রেখে দেওয়া হয় শিশুটিকে। এরপর জমি ও বাড়ি করে না দেওয়ায় মোসলেমার সঙ্গে রফিকুলের ক্রমশঃ সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে ২০১৯ সালের ৬ আগষ্ট রফিকুল তার নিজ নামীয় ১১ শতক জমি মোসলেমার নামে রেজিষ্ট্রি দলিল (নং-৫৬৭৭) কোবালা করে দেয়। পরে মোসলেমাকে দু’কক্ষ বিশিষ্ঠ এসবেস্টার্স ছাউনি দিয়ে ঘর করে দেয় তাকে। গত রমজানের এক সপ্তাহ আগে রফিকুলকে তালাক দিয়ে পুষ্পকাটির রেজাউলের সহায়তায় সৌদি আরবে যায় মোসলেমা। কিন্তু তাকে তালাক দিয়ে বিদেশ যাওয়া ভালভাবে মেনে নিতে পারেনি রফিকুল। একপর্যায়ে রেজাউলের মাধ্যমে মোসলেমার মোবাইল নাম্বার যোগাড় করে ছেলেকে বাপের বাড়ি থেকে ধরে এন নৃশংসভাবে খুন করার হুমকি দেয়। এতে ২৬ জুন বিকেলে মোসলেমা ঢাকা বিমানবন্দরে আসে। সেখানে আগে থেকে অবস্থান করে রফিকুল।
২৬ জুন বিকেল ৫টার পরপরই মোসলেমা ঢাকায় আসার বিদেশে পাঠানোর সহায়তাকারি রেজাউলের ফোনে তার স্ত্রীর সাথে কথা হয় তার। ২৭ জুন সকালে মোসলেমার সঙ্গে কথা বললে সে সাতক্ষীরায় আছে বলে জানান। ঐদিন বিকেল ৫টার দিকে হাড়দ্দহ মাঝেরপাড়ায় মোসলেমার বাড়িতে আমরা দরজায় তালা লাগানো দেখতে পায়। পরদিন দুপুরে দেবহাটার ভাতশালায় ইছামতী নদীতে হাত, পা ও মাথা কাটা এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। এসময় আমরা খবর পেয়ে সন্ধ্যায় দেবহাটা থানায় গিয়ে শরীরে বিশেষ শ্বেতীর দাগ দেখে মেয়ের লাশ মোসলেমার বলে শনাক্ত করি।
পরদিন পুলিশ হাড়দ্দহ ১নং পিলারের পাশ থেকে ও পার্শ্ববর্তী এক ব্যক্তির চিংড়ি ঘেরের আইল থেকে মোসলেমার দু’টি কাটা পা উদ্ধার করে পুলিশ। জামাইকে বাড়িসহ জমি লিখে দিতে রাজী না হওয়ায় মোসলেমাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। হত্যাকারিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান মোসলেমার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা।
এদিকে সোমবার সাতক্ষীরা সীমান্তবর্তী হাড়দ্দহ গ্রামের ভাঙার মুখ নামকস্থানে গেলে বাবর আলী বিশ্বাসের ছেলে রফিকুল ইসলামের বাড়িটি তালাবন্ধ অবস্থায় দেখা যায়।
জানতে চাইলে রনি হোসেন, রুহুল আমিন, আল-আমিন ও ইউপি সদস্য আব্দুল গণিসহ কয়েকজন জানান, রফিকুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মোসলেমা এ বড়িতে কখনো আসেনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা সদর থানার উপ-পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মানিক সাহা জানান, এ মামলায় শাহীদা খাতুন বাদি হয়ে রফিকুলসহ ছয় জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা (জিআর-৪৪৮/২১)দায়ের করেছেন। রফিকুলের প্রথম স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান নিজেই মামলাটির তদারকি করছেন। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হত্যার মোটিভ, হত্যার সঙ্গে কারা যুক্ত তাদেরকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। মামলার বাইরে থাকা কয়েকজনকে সন্দেহের আওতায় রাখা হয়েছে।
মীর খায়রুল আলম/বার্তা বাজার/টি