ভাঙনে ভেসে যাচ্ছে স্বপ্ন

“বাড়ে বাড়ে ভাঙে, বছরে বছরে ভাঙে, মানষের জাগাত যায়া থাকি। পানি আইলে থাকপের পাইনে, মানষেন জাগাত যায়া নিন্দ পাড়া নাগে, হামরা চাউল ডাউল চাইনা, হামাক নদীতে বান্দি দেউক” কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের উলিপুরে উপজেলার বজরা ইউনিয়নের ৬৩ বছরের বৃদ্ধা রাশেদা বেওয়া। ২ ছেলে ১ মেয়ের সংসার। ছেলেরা ইতিমধ্যে বৃদ্ধা মাকে ফেলে গেছেন ভাঙন থেকে বাঁচার জন্য। বৃদ্ধা এই নারী নিজের ভিটে মাটির মায়ায় এখনো নিজের বসতভিটা ছেড়ে যান নি। তবে নদীর পাড়ের পানি বাড়ার সাথে ভাঙন আতংকে দিন কাটাচ্ছেন তিস্তা পাড়ের এই নারী।

অন্যদিকে, নিজের সব বাড়ি ঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন ৩০ বছরের শফিকুল। বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে আশ্রয় হয়েছে অন্যের ভিটে মাটিতে। শফিকুল পেশায় একজন দিনমজুর। প্রতিদিন দিনমজুরি করে যা পান তাই দিয়ে কোনমতে চলে ৩ সদস্যের ছোট্ট সংসারটি। কিন্তু এবারেন সর্বনাশা তিস্তার ভাঙনে বাড়ি-ঘর সব নদীর ভাঙনে পড়ায় তিনি এখন সব কিছু হারিয়ে বসে আছেন। শুধু শফিকুল কিংবা রাশেদায় নন এনাদের মতো কয়েক’শ পরিবার তিস্তা নদীর ভাঙনে আতংকে দিন পাড় করছেন।

একই চিত্র রাজারহাটের বিদ্যানন্দে সেখানেও তিস্তার স্বপ্ন ভেঙেছে অর্ধশত পরিবারের। তিস্তা পাড়ে নিজের অপরিপক্ক পাটগাছ কাটতে দেখা যায় এক নারী। কথা বলে জানা যায় তার নাম লাইলি বেগম। ঋণ করে নিজের ৫০ শতক জমিতে পাটক্ষেতের আবাদ আর ইউক্যাপিটাস গাছ লাগিয়েছিলেন নিজের স্বপ্নকে নিয়ে বাঁচবার জন্য।

কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন,”আমি ৫০ শতক জমিতে পাট আবাদ করেছি এবং কাঠের গাছ রোপন করেছি। নদী ভাঙনের কারণে আমার ২২ শতক আবাদী জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন অপরিপক্ক পাটক্ষেত এবং গাছগুলো কেটে নিচ্ছি।”

একই রকম ক্ষতির শিকার হয়েছেন কৃষক ফরিদুল ইসলাম। নিজের কিছু জমি তিস্তার গর্ভে যাবার পর নিজের ঘর ভেঙে অন্যের জমিতে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ক্ষোভের কন্ঠে বলেন,”পানি উন্নয়ন থেকে ডে জিও ব্যাগ ফেলেছে তা অকার্যকর, ব্যাগে বালু তেমন নেই, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না,আর কিছুদিন গেলে আমাদেন বসতভিটা ভেঙে যাবে। ”

অন্যদিকে সদর উপজেলার সারডোবের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধটির কিছু অংশ ভেঙে যাওয়ায় ৫০টি গ্রাম নদীর পানিতে প্লাবিত হয়েছে। চরম দূর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন সেখানকার মানুষজন।

কুড়িগ্রামের ১৬ টি নদ-নদী আর ৪২০ টি চর এসব চরে প্রতিবছর বন্যা আসে বন্যা যায়। প্রকৃত অর্থে বন্যা নিয়ন্ত্রনে কাজের কাজ তেমন দেখা যায় না। প্রতিবছর ধরলা,তিস্তা ব্রহ্মপুত্র পাড়ে হাজার হাজার বসতভিটা যায় নদী গর্ভে। নিঃস্ব হয়ে পড়ে এসব অঞ্চলের বাসিন্দারা।

ছবি- সুজন মোহন্ত

এদিকে ধরলা, তিস্তা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ভাঙনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানি। রবিবার (৪ জুলাই) দুপুর ১২ টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি ২৮.৮৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে, ধরলা নদীর পানি ২৫.৭০.সেন্টিমিটার,ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুন খাওয়া পয়েন্টে ২৫.২৫ সে.মি এবং চিলমারী পয়েন্টে ২২.৮৮ সে.মি বৃদ্ধি পেয়েছে।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে শিগগিরই এ নদীগুলো বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়বে কয়েক হাজার মানুষ।

নিচু এলাকা দুদিন ধরে প্লাবিত হওয়ার সাথে এসব এলাকার পাট, ভুট্টা, আউস ধান, বীজতলা ও সবজি ক্ষেত নিমজ্জিত হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান,” মধ্য জুলাইয়ের আগে বড় বন্যার আশঙ্কা নেই। জেলায় ২৫টি পয়েন্টে নদী ভাঙন চলছে। এর মধ্যে দুই-একটি পয়েন্ট বাদে বাকি অংশে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।”

এদিকে, বন্যার আগাম পূর্বাভাসে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলার বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান,”স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন বন্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন বিভাগগুলো প্রস্তুত থাকে। বন্যা পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে বন্যা কবলিত মানুষদের উদ্ধার করে যেন আশ্রয়কেন্দ্রসহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায় সে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের পর্যাপ্ত চাল এবং টাকা বরাদ্দ দেওয়া আছে। আশা করি আগামী ১০-১৫ দিন কোনও সমস্যা হবে না।”

সুজন মোহন্ত/বার্তাবাজার/পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর