ক্ষমতার দাপটে বেপরোয়া ইউপি সদস্য, খামারে যেতে কৃষি জমি কেটে সাবার
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরে এক ইউপি সদস্যের বাড়ি ও মুরগীর খামারে যাওয়ার রাস্তা নির্মাণে দখলে নেয়া হয়েছে স্থানীয় কৃষকদের আবাদি জমি। সেই সঙ্গে জমির মাটি কেটে জোড়পূর্বক রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও এলজিইডির কর্মকর্তারদের বিরুদ্ধে।
জানা যায়, স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এমন একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন নাজির মেম্বার নামের এই ইউপি সদস্য। শুধু তাই নয়, নিজের সেই খামারে বিদ্যুতের তাঁর টানার জন্যে তিনি খুঁটি গেড়েছেন গেরস্ত বাড়ির আঙিনায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা হওয়ায় এই ইউপি সদস্যের অপকর্মের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে না কেউই। তাছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কে বিভিন্ন মহলকে অবগত করা হলেও সাধারন গরিব কৃষকদের কথা বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে দলীয় বা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ।

সম্প্রতি নাজির মেম্বারের এসকল কর্মকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন স্থানীয়রা। একই ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, মেম্বারের এসকল কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের বেশ কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা। আর তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশাসনের দরজায় বার বার কড়া নাড়লেও সাড়া পাননি কৃষকরা। শুরুতে নিরব থাকলেও সময়ের সঙ্গে তার এসকল কর্মকাণ্ডের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকলে সরব হতে শুরু করে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী।
এই ঘটনায় ভোক্তভোগী কয়েকজন কৃষক প্রতিকার চেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশলীর অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে লিখিত একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগকারী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছয়ফুল্লাকান্দি ইউনিয়নে মাছিমনগর গ্রামের পশ্চিমপাড়া থেকে শুরু হয়ে একটি অপরিকল্পিত রাস্তা আবাদি জমির বুক চিড়ে দিয়ে মধ্যনগর পূর্বপাড়ার পাকা সড়কের সাথে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। ১ হাজার ১৭ মিটার দৈর্ঘ্যরে রাস্তা ও একটি কার্লভাটসহ এই কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ১০ লক্ষ ৮৭ হাজার ২ শত ৯৫ টাকা। এ কাজটির প্রকল্প বাস্তবায়নের টেন্ডার পান সাফিন নেটওয়ার্ক নামে একটি প্রতিষ্ঠান। গ্রামবাসীর অভিযোগ স্থানীয় ইউপি সদস্য তার বাড়ি ও মুরগীর খামারে যেতে সাধারণ কৃষকদের ফসলি জমি থেকে জোড়পূর্বক ভেকু দিয়ে মাটি কেটে রাস্তা নির্মাণ করছে। পাশে একটি রাস্তা থাকার পরেও শুধুমাত্র ইউপি সদস্য নাজির মিয়ার বাড়িতে যেতে ‘ভিআইপি’ গোছের এই রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই রাস্তা গ্রামের মানুষের কোন কাজে আসবে না। কোনো একজন ব্যক্তির আয়েশি পথচলার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে কৃষকদের। এরইমধ্যে এলাকাবাসী উক্ত রাস্তা নির্মাণ বন্ধের আবেদন জানিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া (এলজিইডি) বরাবর একটি আবেদন দিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মাছিমনগর গ্রামের পশ্চিমপাড়া গ্রাম থেকে ফসলী জমির মাঝ দিয়ে ভেকু মেশিন দিয়ে কৃষকের জমি থেকে মাটি কেটে কৃষকের জমি দিয়ে নতুন একটি রাস্তা নির্মান করা হচ্ছে। এই রাস্তাটি মাছিমনগর পশ্চিমাপাড়া শুরু হয়ে মধ্যনগর পূর্বপাড়া গিয়ে শেষ হয়েছে। মাটির কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। এই রাস্তায় মাত্র ২টি বসত ঘর রয়েছে। একটি মাচিমনগর পশ্চিমপাড়াই, অন্যটি মধ্যনগর নাজির হোসেন মেম্বারের মুরগীর খামারের পাশে। মধ্যনগর গ্রাম জুড়ে রয়েছে একটি পাকা সড়ক। যেসকল জমি থেকে মাটি কাটা হয়েছে এগুলোর বেশির ভাগ জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মধ্যনগর গ্রামের সখিনা বেগম নামের এক নারীর অভিযোগ, ‘মেম্বার নিজের বাড়ি ও মুরগীর ফার্মে আসার জন্য আমাগো কৃষি জমির উপর দিয়া জোর কইরা রাস্তা বানাইতাছে। এই রাস্তা আমাগো কোন কামে আইবো না। গ্রামে আরো রাস্তা থাকতে আমগো জমি দিয়া ক্যারে রাস্তা বানাইতাছে মেম্বার।’
অপর এক অভিযোগকারী রেজাউল করিম সবুজ জানান, গ্রামে একটি পাকা সড়ক রয়েছে। আমাদের জমির উপর দিয়ে যে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে তার কোন প্রয়োজন নেই, কারণ এখানে কোন বসতি নেই। এই প্রকল্প ভিআইপি লোকেদের ভিআইপি প্রকল্প।
ছয়ফুল্লাকান্দি ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সদস্য নাজির মিয়া জানান, আমার খামারের জন্য রাস্তা করছি না, গ্রামের লোকজনের জন্যই রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে। এখন বাড়ি নেই, রাস্তা হলে অনেককেই রাস্তার পাশে বাড়ি করবে। পুরো গ্রাম জুড়ে আমাদের একটি পাকা রাস্তা রয়েছে।
সাফিন নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি মাসুম আহমেদ জানান, কাজটি আমি বাস্তবায়ন করছি। যদিও এটি অন্যের লাইসেন্সে। জোড় করে কারো জমি থেকে মাটি কাটা হয়নি। ইঞ্জিনিয়ার স্যারদের কথামত আমি রাস্তা নির্মাণ করছি। এখন কাজ বন্ধ থাকলেও কিছুদিনের মধ্যে কাজ শুরু হবে।
উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, এই রাস্তা নির্মাণ কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এলাকাবাসী অভিযোগ দিয়েছে এই রাস্তা নির্মাণ না করতে। গ্রামবাসীর মধ্যে সমঝোতা হলে আমরা রাস্তার নির্মাণ কাজ আবার শুরু করবো। এক মেম্বার তার জায়গা দিয়ে রাস্তা দিতে চাচ্ছে না। এই নিয়ে এলাকাবাসী একটু ক্ষুদ্ধ।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সরোয়ার জানান, মাছিমনগর মধ্যনগর বিষয়ে কিছু লোকজন আমার কাছে এসেছিল তাদের ফসলি জমি দিয়ে জোড়পূর্বক রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে, এমন অভিযোগ নিয়ে। আমি যতটুকু জানি ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এই কাজটি বন্ধ করে রেখেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানান, ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে একটি অভিযোগ দিয়েছিল এলাকাবাসী। বিষয়টি আমি উপজেলা প্রকৌশলী বাঞ্ছারামপুরকে তদন্ত করতে দিয়েছি।
এদিকে, এর আগেও নাজির মেম্বার তার মুরগীর খামারে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ অবৈধভাবে নেওয়ার জন্য মধ্যনগর মধ্যপাড়ার বেশ কয়েমকটি বাড়ির ভেতর খুঁটি গেড়ে সরকারি টাকায় অনুমতি ছাড়াই বিদ্যুৎ লাইন টেনে নিয়ে যায়। বাঞ্ছারামপুর গ্রামের এক ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ করলে কুমিল্লা ৩ জোন, গৌরীপুরের জেনারেল ম্যানেজার, পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হোসেন সরেজমিনে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তবে এখনো পর্যন্ত বিদ্যুতের খুঁটি গুলি অপসারণ করা হয়নি।
মোঃ রাসেল আহমেদ/বার্তাবাজার/পি