সিরাজগঞ্জের তাড়াশের নওগাঁ হাটে খাজনা আদায়ের নামে ইজারাদার কর্তৃক জোরপূর্বক ভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রতিবছর সরকার এ হাট থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করছে। আর উপজেলা প্রশাসন বছর শেষে হাট ইজারা দিয়েই যেন তাদের দায়িত্ব শেষ করছেন। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে কঠোর লকডাউনের প্রথম দিনেও প্রশাসনের নাকের ডগায় নওগাঁ হাট চলে, এর সমাধান পাবো কোথায়? এ যেন কালো চশমা পড়ে আছে স্থানীয় প্রশাসন।
জানা যায়, জেলার বৃহত্তম হাট গুলোর মধ্যে এ হাট অত্যতম। চলতি ১৪২৮ বাংলা সনে ভ্যাটসহ তিন কোটি ৫০ লাখ টাকায়, আকবর আলী নামের জনৈক এক ব্যক্তি এক বছরের জন্য টোল আদায়ের ইজারা নেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ইজারা নিয়েই শুরু করেছেন অতিরিক্ত টোল আদায়। এমন কি হাট পেরিফেরির বাইরে নিজস্ব ঘরে যারা ব্যবসা করেন তাদের কাছেও টোল দাবি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে করে সংক্ষুদ্ধ ব্যবসায়ীরা প্রতিকার চেয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১ জুলাই) সরেজমিন নওগাঁ হাট ঘুরে দেখা যায়, কঠোর লকডাউনের তিলফোটা চিহৃ নেই। হাট পেরিফেরির বাইরে নওগাঁ জিন্দানী কলেজ মাঠেও বসেছে গরু-ছাগল, কাঠের আসবাবপত্র ও মাছধরার চাঁইয়ের হাট। এই কলেজ চত্বরে রয়েছে মহানমুক্তিযুদ্ধে অন্যতম গেরিলা বাহিনী পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের দর্শনীয় স্মৃতিস্মম্ভ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সেসব স্মৃতিচিহ্ণ অপবিত্র করে হরদম চলছে গরু-ছাগল কেনাবেচা। অথচ সরকারি বিধানমতে স্কুল কলেজ মাঠে হাট লাগালো সম্পূর্ণ বেআইনি। হাটের কোথাও টোল চার্ট (মূল্যতালিকা) টাঙানো হয়নি।
এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড.ফারুক আহম্মদ মুঠোফোনে বলেন, কঠোর লকডাউনে কোথাও হাট বসার কথা না। তবে ওখানে কেন হাট বসলো তা খতিয়ে দেখছি। আর ১২৫ ধরনের দ্রব্য কেনাবেচার জন্য টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। তা বিগত হওয়ায় নতুন করে মূল্য তালিকা প্রণোয়নের কাজ চলছে। বর্তমান মূল্য তালিকায় প্রতিটি গরু ও মহিষ সর্বেচ্চ ২৫০ টাকা, প্রতিটি ছাগল ও ভেড়া ৫০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ক্রেতা শুধু টোল দিবেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি ও ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেবেন।
জেলা প্রশাসকের কথার প্রেক্ষিতে এ হাটে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্নচিত্র। একটি গরু কিনতে ক্রেতার কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা আর বিক্রেতার কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা। ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ৩৫০-৪৫০ টাকা, বিক্রেতার কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। ক্রেতা কে যে রশিদ দেয়া হচ্ছে তাতে টাকার অঙ্ক না লিখে, লেখা হচ্ছে পরিশোধ। যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এছাড়াও অন্যান্য পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রেও কোনো প্রকার নিয়ম মানা হচ্ছে না, এমনকি এক হালি ডিম কিনলেও দিতে হয় ২টাকা খাজনা। ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের কাছেই টোল আদায় করা হচ্ছে মর্মে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন খন্দকার বলেন, করোনা হলে কি হবে এখানে প্রশাসনের কোন ভুমিকা নেই। আর নওগাঁ হাটে অনেক ক্রেতা আসেনা অতিরিক্ত খাজনার ভয়ে। এ ভাবেই এক সময়ের প্রসিদ্ধ মির্জাপুর ও প্রতাপ হাট ধ্বংস হয়ে গেছে। তাড়াশ বাজারের আব্দুল আউয়াল বলেন, আমি তিনটা হাঁস বিক্রি করেছি, খাজনা নিয়েছে ৩০ টাকা।
আরেক ক্রেতা লাবু সরকার বলেন, ৩০ টাকা দিয়ে একটি তরলা বাঁশ কিনেছি, খাজনা নিয়েছে ১০ টাকা। হরেন্দ্র দাস বলেন, তিন হালি হাসের ডিম কিনেছি তার জন্য খাজনা দিতে হলো ৬ টাকা।
হাটে আসা ভাংগুড়া গ্রামের বাসেদ আলী বলেন, আমাদের এলাকাতে সপ্তাহে এই একদিন হাট বসে। সারা সপ্তাহের সদাই এই হাট থেকে কিনতে হয়। সরকার লকডাউন দিসে আর কি করা আজ হাট থেকে সব কিনে নিলাম কাল থেকে আর আসবোনা। আলু ,পিয়াজ, লবন, মরিচ সহ আরো অনেক কিছু কিনেছি তাই অধেক বস্তা হয়েছে। এখন আমাকে ২০টাকা খাজনা দিতে হল্ আজব সব হাটের ইজারাদার। হাট পেরিফেরির বাহিরে স্থায়ী ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম সহ অনেকের অভিযোগ, চলতি বছর হাটের ইজারাদার তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের বার্ষিক টোল দাবী করে, তাদের বারবার তাগাদা দিচ্ছেন। অথচ হাটের ইজারদারের হাট পেরিফেরির বাইরে টোল আদায় করার কেনো নিয়ম নেই।
নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আবুল কাশেম বলেন, কলেজ মাঠে হাট লাগানোর জন্য কেউ অনুমতি নেয় নি। আগেও টুকটাক হাট বসেছে। তাছাড়া স্থানীয় প্রভাবে অনেক কিছুই বলা যায় না। এদিকে অভিযুক্ত ইজারাদার আকবর আলী বলেন, বহু বছর ধরেই হাটের ইজারাদাররা ওই সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের সাথে আলোচনা করেই বার্ষিক একটা অংকের টোল ধার্য করে তা আদায় করে আসছেন। সে অনুযায়ী তিনি টোল চেয়েছেন।
অতিরিক্ত টোল আদায়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশাসন ও ক্ষমতাশীন দলের লোকজনকে ম্যানেজ করেই টোল আদায় করছি। তাদেরকে শেয়ারও দিয়েছি। এ কারণে কেউ কিছু করতে পারবেনা। ক্ষমতাশীন দলের কে কে রয়েছেন জানতে চাইলে আকবর আলী বলেন, এমপির ভাই উকিল (এ্যাড. মো: নূরুল ইসলাম) এ হাটের সভাপতি।
স্থানীয় এমপি অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল আজিজের ভাই এ্যাড. নুরুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়ম মতোই হাট চালাচ্ছি। ক্রেতা বিক্রেতার নিকট হতে খাজনা নেয়া আমাদের সিস্টেম। করোনায় হাট বন্ধ রাখতে হবে কে বলেছে? সারে তিন কোটি টাকা দিয়ে হাট নিয়েছি কি বন্ধ রাখার জন্য। আমি হাট বন্ধ রাখলে কি সরকার আমার কাছ থেকে টাকা কম নেবে। এসব লিখে কিছুই করতে পারবেন না। তাড়াশ চলে আমাদের হুকুমে।
এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেজবাউল করিম বলেন, লকডাউনের মধ্যে হাট বসানোর কোন অনুমতি নেই। কেন হাট বসানো হলে তা খতিয়ে দেখা হবে। আর হাটের ব্যাপারে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। খোঁজ নিয়ে অনিয়ম গুলো দেখে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এম এ মালেক/বার্তাবাজার/পি