সোনালি আঁশে এবার স্বপ্ন দেখছে কৃষক

সোনালি আঁশ খ্যাত পাট তার অতীত ঐতিহ্য হারিয়েছে অনেক আগেই। কালের বিবর্তনে পাটের সেই কদর এখন আর নেই। পাটের সোনালি অতীত এখন কেবলই ইতিহাস। এরপরও পুরনো ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সিরাজগঞ্জের পাট চাষিরা।

এবার জেলায় ১৫ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চাষ হয়েছে ১৫ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে। গত মৌসুমে চাষ হয়েছিল ১৩ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে। দেশী, তোষা, কেনাফ ও মেস্তা জাতের পাটের মধ্যে এ জেলায় এবছর তোষা চাষ করা হয়েছে ১১ হাজার ৩৯০ হেক্টর জমিতে।

আশা-নিরাশার দোলাচালে এখনও কৃষকের আঙিনা রঙিন করে রাখছে এই সোনালি আঁশ। প্রতিবছর এক বুক স্বপ্ন নিয়ে পাট চাষ করেন গ্রামের সাধারণ কৃষক। রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে কাজ করেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাটি থেকে ফসল ফলান। সবুজ পাটকে রূপান্তরিত করেন সোনালি বর্ণে। এরপরও বিক্রি করতে গিয়ে পড়েন দুর্বিপাকে। কখনো ভালো দাম পান; আবার কখনও একেবারেই পান না! অনেক সময় আবার লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয় বেশি। এরপরও সামান্য লাভের আশায় প্রতি বছরই পাটের আবাদ করেন। পাটের দাম নিয়ে সংশয় থাকেই।

তবে এবার পাটের দাম ভালো হওয়ায় কপাল খুলেছে কৃষকদের। নতুন সম্ভাবনায় এবছর কৃষকের মনে সেই ভয় কেটেছে। যেন আবারও সোনালি আঁশের সুদিন ফিরে পেয়েছেন। গত বছরে বাজারে ওঠার শুরুর দিকেই ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার সাড়ে ৫ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হচ্ছে। যা দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড। আর এমন দাম এবারই প্রথম, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই পাটের দাম বেশি দাম পাওয়ায় পুঁজি তো উঠেছেই। মাঠের পাট টাকা হয়ে কাঙ্খিত মুনাফাও ঘরে উঠবে। গেল কয়েক বছরের লোকসানের পর লাভের মুখ দেখার আশায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বেজায় খুশি। অনেকেই পাট চাষে নতুনভাবে আগ্রহী হয়ে উঠছেন এ বছর।

তবে পাটের গৌরবময় অতীত হারিয়ে গেলেও নতুন করে আবার পাটের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সিরাজগঞ্জে। কৃষি বিভাগ বলছে জেলায় গতবারের চেয়ে এবার লক্ষ্যমাত্রা ও ফলন দুটোই বেশি হয়েছে। এতে হাসি ফুটেছে সিরাজগঞ্জের পাট চাষিদের মুখে। এক সময়ের সোনালি আঁশকে নিয়ে তারা নতুন করে স্বপ্ন বাঁধছেন।

তবে দাম নিয়ে সিন্ডিকেটের আশঙ্কায় তাদের সেই স্বপ্নও মলিন যেন না হয় সেটাই দাবি। চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলনের পর লাভের আশা করছেন চাষিরা। এরইমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় সোনালি আঁশ আহরণ শুরু হয়ে গেছে। সরেজমিন জেলার নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের মাঠে মাঠে চোখ জুড়ানো সবুজের সমারোহ। সবুজ পাতার সাথে দোল খাচ্ছে মাঠের পর মাঠ কৃষকের সোনালী স্বপ্ন।

ওই ইউনিয়নের উত্তর রেহাই শুড়িবের গ্রামের পাট চাষি খাদেম উদ্দিন মন্ডলের সাথে হলে তিনি বলেন, কৃষি অফিসের সহযোগিতায় এ বছর আট বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। আবহাওয়া ভালো থাকায় এ বছর পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। চাষে খরচ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তবে আশা করছি পাট কেটে ঘরে তুলতে পারলে ভালো দাম পাবো।
একই গ্রামের আব্দুল খালেক সরকার বলেন, চার বছর ধরে পাট চাষ করি কিন্তু কাটতে পারিনা। যমুনার পানি স্বপ্ন মলিন করে দেয়। এ বছর আড়াই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। তবে আশা করছি এবার পাটের ফলন ভালোই হবে।

এ প্রসঙ্গে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) মো. আবু হানিফ বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর পাটের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আশা করি, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত স্বপ্নের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশবান্ধব পাটের মোড়কসহ বিভিন্ন কাজে পাট জাতীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়ালে পাটের চাহিদা যেমন বাড়বে, তেমনি লাভবান হবেন চাষিরা। তবে কৃষক যাতে ন্যায্য মূল্য পায়, সে ব্যাপারে সরকারের সজাগ দৃষ্টি রয়েছে।

এম এ মালেক/বার্তা বাজার/এফএইচপি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর