বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দিতে ২০০০ সালের ১৫ ই জুলাই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ আইন। যার ধারাবাহিতায় ২০০৬ সালের ২২ জুন দেশের ২৭তম পাবলিক এবং ৫ম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করেছিল নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)।
শুরুতে মাত্র ৪টি বিভাগ, ১৩ জন শিক্ষক, ১৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে নোবিপ্রবিতে বর্তমানে ১০১ একরের বিশ্ববিদ্যালয়টির ৬টি অনুষদ, ২টি ইনস্টিটিউট, ২৮টি বিভাগের অধীনে ৭ হাজার শিক্ষার্থী। প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষক এবং ৪ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে নোবিপ্রবি পরিবার। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে ৫টি আবাসিক হল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহের মধ্যে ১০ তলা বিশিষ্ট বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ১০ তলা বিশিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা টাওয়ার, হাউস টিউটর, স্টাফ কোয়ার্টার ও প্রভোস্ট টাওয়ার নির্মাণাধীন। একতলা কেন্দ্রীয় মসজিদ, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট ভবন এর নির্মাণ কাজ চলমান। সম্প্রতি তিন তলা ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার ও ত্রিধর্মীয় উপাসনালয় উদ্বোধন করা হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন। একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেধা-মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য এসব সেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনে কার্যক্রমে সারা বছরই মুখরিত ১০১ একরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, নোবিপ্রবি ডিবেটিং সোসাইটি, মডেল ইউনাইটেড নেশন্স, বিজনেস ক্লাব, রয়েল ইকোনমিকস ক্লাব, সিএসটিই ক্লাব, লুমিনারি, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, কালের কণ্ঠ শুভসংঘ, শব্দকুটির, অভিযাত্রিক ব্লাড ব্যাংক, এনএসটিইউ ব্লাড ডোনার সোসাইটি, নোবিপ্রবি থিয়েটার ইত্যাদি।
শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেছে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। রয়েছে অবিস্মরণীয় সাফল্য। শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে চীন ও ভারতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের নোবেল নামে খ্যাত হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় সফলতা লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ ম ব্যাচের শিক্ষার্থী কাউসার আলম,কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণামূলক কাজের স্বীকৃত হিসেবে অর্জন করেছেন বিভিন্ন আন্তজাতিক পদক। বর্তমানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে দেশীয় ও আন্তজাতিক জার্নালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরাও দেশে ও বিদেশে সুনামের সাথে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সুনাম রয়েছে। ফিমস বিভাগের অধ্যাপক ড. বেলাল হোসেন ছয়টি নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণী আবিষ্কার করেন। এরমধ্যে নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া নামটি নোবিপ্রবির নামে নামকরণ করা হয়। মাইক্রো বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দ্রুত করোনা সনাক্তকারী যন্ত্রের আবিষ্কারে আবদান রাখেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের সাথে যৌথ গবেষণায় ড. ফিরোজ আহমেদের নেতৃত্বে নোবিপ্রবি গবেষক দল বর্জ্য পানিতে কোভিড -১৯ ভাইরাসের উপস্থিত শনাক্ত করে।
বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. সুবোধ কুমার সরকার জাপানের হিরোশাকি ইউনিভারসিটি অব হেলথ সায়েন্সের সাবেক বিখ্যাত প্রফেসর ড. জিন ইচি সাসাকির সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রথম তিন ধরনের কালো রসুন উদ্ভাবন করেন। যার নাম- নোবিপ্রবি-বিজি-১ (ডিএল-বিজি), নোবিপ্রবি-বিজি-২ (ডিএস-বিজি) ও নোবিপ্রবি-বিজি-৩ (সিএল-বিজি)। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে দেশীয় ও আন্তজাতিক জার্নালে।
করোনাকালীন পরিস্থিতিতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে দেশমাতৃকা সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রো বায়োলজি বিভাগের ল্যাবে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের কোভিড-১৯ নমুনা শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে। বর্তমানে নোবিপ্রবি ও নর্থ সাউথ বিশ্বববিদ্যালয়ের গবেষক দল যৌথভাবে কোভিড-১৯ ভাইরাসের জীবনরহস্য উন্মোচনের জন্য গবেষণা করছে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয় জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে গড়ে তোলে। আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মনির্ভরশীল উন্নত জাতি গঠনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অনেক।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সফলতার উপর ভর করে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের প্রথম সারির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবে এমন আশা শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের উপকূলীয় জনপদের আলোর দিশারী হয়ে উঠুক ১০১ একরের নোবিপ্রবি নামক এ স্বপ্নপুরী।
ফাহাদ হোসেন/বার্তাবাজার/এফএইচপি