আজ রবিবার সকাল ৬:২২, ২০শে আগস্ট, ২০১৭ ইং, ৫ই ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলক্বদ, ১৪৩৮ হিজরী

২০ টাকার পেঁয়াজ সাত দিনে ৪০

নিউজ ডেস্ক | বার্তা বাজার .কম
আপডেট : আগস্ট ৮, ২০১৭ , ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ
ক্যাটাগরি : অর্থনীতি,প্রধান খবর
পোস্টটি শেয়ার করুন

ভারত সরকার পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য বাড়ায়নি, দেশেও এখনো আমদানি তেমন কমেনি। তা সত্ত্বেও সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে হঠাৎ করেই রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত সপ্তাহে প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয় ২২ টাকা কেজি দরে। এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৬ টাকা কেজি। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪১-৪২ টাকা দরে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ঈদুল আজহা সামনে রেখে বানোয়াট অজুহাতে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। ঈদুল আজহা হবে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১ বা ২ সেপ্টেম্বর। সেদিকে লক্ষ রেখেই আগেভাগে বাজারে দাম বাড়ানো হচ্ছে সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকার সুযোগে। এ অবস্থায় এই মুহূর্তে বাজার তদারক করার উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে ভোক্তারা।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বন্যার কারণে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সেখানকার ব্যবসায়ীরা আড়তে দাম বাড়িয়েছে।

আবার কারো কারো দাবি, দেশের সাম্প্রতিক বন্যা এবং বেহাল রাস্তার কারণে আড়তে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ নেই। ভারতের হিন্দু বিজনেস লাইন পত্রিকার গত ৩ আগস্টের অনলাইন সংস্করণের খবর অনুযায়ী, সে দেশের কয়েকটি রাজ্যে বন্যার কারণে পেঁয়াজের দাম সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে রপ্তানিমূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা নাকচ করা হয়েছে দেশটির আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠকে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামে ভারতীয় পেঁয়াজের সরাসরি আমদানিকারক নেই। ভোমরা, হিলি, সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা পেঁয়াজ চট্টগ্রামে পৌঁছার পর কমিশনে বিক্রি করা হয়। ফলে দাম বাড়া-কমা নির্ভর করে স্থলবন্দর দিয়ে কী পরিমাণ পেঁয়াজ কত দামে আসছে তার ওপর।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জ হামিদ উল্লাহ মার্কেট কাঁচা পণ্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ‘বন্যার কারণে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সেখানকার মোকাম বা আড়তে দাম বাড়ানো হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। অথচ গতকালও স্বাভাবিক সময়ের মতো খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজবাহী ৩০টি ট্রাক ঢুকেছে। ’ তিনি জানান, ভারতীয় পেঁয়াজের পাশাপাশি কোনো কারণ ছাড়াই দেশীয় পেঁয়াজের দামও বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছে আমদানিকারকরা।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী ও সোনালী ট্রেডার্সের কর্ণধার আবসার উদ্দিন বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজারে এই অস্থিরতা অন্তত ১০ দিন আগেই শুরু হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী ভারতের বদলে বিকল্প দেশ মিয়ানমার, চীন ও পাকিস্তান থেকে আমদানির উদ্যোগ নিলেও শুধু চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজজটের কারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এর পরও কিছু ব্যবসায়ী পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলে পণ্য জাহাজীকরণ করেছে। সেগুলো ঈদের আগে পৌঁছবে। বাকিরা মিয়ানমার ও চীন থেকে আমদানির উদ্যোগ নিলেও হাতে সময় কম থাকায় ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছে না। ’

দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয় ১৯ লাখ টনের মতো, বাকি চাহিদা মেটানো হয় আমদানি করেই। আমদানি করা পেঁয়াজের বেশির ভাগই আসে ভারত থেকে। আর ঈদুল আজহার সময় পেঁয়াজের চাহিদা বাড়ার কারণে প্রতিবছরই ঈদের আগে আমদানি করা পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। কিন্তু এ সমস্যা সমাধান করতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড ও ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল হোসেন বলেন, ‘প্রায় প্রতিবছরই যেহেতু এই সমস্যা হচ্ছে সে জন্য এই সময়ে পেঁয়াজের আমদানি এক মাস তদারক করলেই হয়। আর ঘাটতি মেটাতে স্থায়ী পদক্ষেপ হিসেবে বছরে তিন লাখ টন উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নিলেই সমাধান হয়ে যায়। ’

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহসভাপতি নাজের হোসেন  বলেন, ‘দেশের ব্যবসায়ীরা মৌসুম বুঝে ব্যবসা করে। তাই ঈদুল আজহা সামনে রেখে তারা পেঁয়াজের দাম বাড়াতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের কারসাজিতেই পেঁয়াজের পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুদ থাকা সত্ত্বেও দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুদ করছে। এ ছাড়া বাজারে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থাও নেই। টিসিবি একসময় বাজার নিয়ন্ত্রণের কিছু উদ্যোগ নিলেও বর্তমানে একেবারেই নেই। ’

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক মাস আগে দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ছিল ২২ থেকে ২৫ টাকা। এ সময়ের মধ্যে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ৫৬.৩৩ শতাংশ। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৫৯.৪৭ শতাংশ। এ ছাড়া গত এক সপ্তাহের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৩৮ থেকে ৪৫ টাকায়।

গতকাল সোমবার রাজধানীর শ্যামবাজার, কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর ও ফকিরাপুল বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশি পেঁয়াজ মানভেদে বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে। ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে।

শান্তিনগর বাজারের মানিক স্টোরের মো. আইয়ুব মিয়া বলেন, আড়তে পেঁয়াজের দাম বেশি হওয়ায় তাঁদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি জানান, গত ১০ দিনে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৮ থেকে ২০ টাকা। আর ভারতীয় পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বন্যা এবং রাস্তা খারাপ হওয়ায় পেঁয়াজ রাজধানীতে আসতে পারছে না। এ ছাড়া চট্টগ্রামে পেঁয়াজের আড়তে পানি ওঠায় অনেক পেঁয়াজ পচে গেছে। এখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামেও পেঁয়াজ যাচ্ছে। ফলে হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম এমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ’

চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ির খুচরা বিক্রেতা আল মদিনা স্টোরের কর্ণধার নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আড়ত থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ কিনলে তির কেজি পচা থাকে, আর ৩৮ টাকা কেজির পেঁয়াজ কিনলে এক কেজি পচা থাকে। অর্থাৎ পরিবহন খরচ, ধোলাই মিলিয়ে পড়তা পড়ছে ৪০ টাকা। সেটি ৪২ টাকায় বিক্রি করছি আমরা। ’