বৈরাগীর খাল পুনরুদ্ধারে সাভার উপজেলা প্রশাসনের শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান!
ঢাকার সাভারে উপজেলা প্রশাসন জলাবদ্ধতা দূরীকরণের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে বৈরাগীর খাল দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে এক শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে। শনিবার (১২ জুন) দুপুরে সাভার পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড কাতলাপুর ও দরিয়াপুর এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোঃ এনামুর রহমান এমপি’র নেতৃত্বে এবং সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজীব, সাভার পৌর মেয়র আলহাজ্ব আব্দুল গণি সহ সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলাম সমন্বয়ে উপজেলা প্রশাসন খালের অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে।
দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোঃ এনামুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, আজ আমরা সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বৈরাগীর খাল পুনরুদ্ধারে কার্যক্রম চালাচ্ছি। আপনারা জানেন, সাভার পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে এই বৈরাগীর খালের গুরুত্ব অপরিসীম। এই এলাকার পানি এই খালটি দিয়ে বংশী নদীতে গিয়ে পড়ে। আমি নিজেও বিগত ৪০ বছর ধরে দেখছি যে, এই খাল দিয়ে পানি বংশী নদীতে প্রবাহিত হয়। এই খালটি এত বড় ছিলো যে, একসময় এই খাল দিয়ে বড় বড় মালবাহী নৌকা চলাচল করতো, এখানে ভিড়তো। কিন্তু ক্রমাগত দখলের কারণে সেই বৈরাগীর খাল আজ শীর্ণ এক নালায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আজ সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখতে পেলাম, খালটির বিভিন্ন জায়গায় মানুষ দখল করে ঘর-বাড়ী তৈরী করেছে। কোনো কোনো অংশে তো খাল বন্ধ করে দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যহত করেছে। আমরা প্রশাসনকে সাথে নিয়ে এসেছি এবং নকশা অনুযায়ী মূল খাল যেভাবে প্রবাহিত হবার কথা, সেই অনুযায়ী উচ্ছেদের মাধ্যমে খাল পুনরুদ্ধার করবো। এক্ষেত্রে কাউকে কোনোরকম ছাড় দেয়া হবেনা বলেও জানান তিনি।
জলাশয় দখলকারীদের তালিকার ব্যাপারে ডা. এনাম জানান, আইনশৃঙ্খলা কমিটির গত মাসিক সভায় এবিষয়ে আলোচনা হয় এবং সাভারে বেদখল হওয়া সকল খালের তালিকা করা হয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমে সবগুলো খাল নিয়ে কাজ করবো। আমাদের পরবর্তী টার্গেট আশুলিয়া ইউনিয়নের নয়নজুলি খাল।
সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব জানান, সাভারে প্রায় হাজারের মতো মানুষ উপজেলার বিভিন্ন প্রাকৃতিক খালগুলো দখল করে একপ্রকার অবিবেচকের মতো বাড়ি-ঘর নির্মাণ করেছে। কেউ কেউ আবার খালকে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেইন’ বানিয়ে খালের প্রবাহ রুদ্ধ করেছে। আমি আগেও বলেছি, এই ধরণের অবৈধ কাজ যারা করেছে, আমি মনে করি তারা দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী এবং তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র দেশপ্রেম নাই। আমরা এবিষয়ে একটা ‘টিম ওয়ার্ক’ চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান সাহেবের নেতৃত্বে এখানে আমাদের ‘লজিষ্টিক সাপোর্ট’ দিচ্ছেন আমাদের পৌর মেয়র মহোদয়। এছাড়াও, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলাম, সাভার রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহ সকল সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত উপস্থিতিতে আমরা এই বৈরাগীর খাল পুনরুদ্ধারে কাজ করছি।
মঞ্জুরুল আলম রাজীব আরও বলেন, আপনারা ইতোমধ্যে দেখেছেন ভাকুর্তায় আমরা ৩টি খাল পুনরুদ্ধার করেছি। সেখানে যারা বালু ভরাট করে খাল দখল করেছিলো, আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক ওই বালু নিলাম করেছেন এবং আমরা দখলদারদের বাড়ি-ঘর উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। আমাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং এসব প্রাকৃতিক খালগুলো উদ্ধারের মাধ্যমে আমরা সাভারকে জলাবদ্ধতামুক্ত করবো ইনশাআল্লাহ।
এপ্রসঙ্গে সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এই জলাশয় দখলমুক্ত করতে আমরা কারও চেহারা দেখবো না, আমরা দেখবো না কে কালো আর কে সাদা। কে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য, আমরা তাও দেখবো না। জলাশয় আইনে আছে, ভূমির ‘ন্যাচার’ পরিবর্তন করা যাবে না। মানে খাল বা নদী যেদিক দিয়ে প্রবাহিত হবে, সেটাই খাল, সেটাই নদী। মানুষ খালে মাছ ধরুক; কিন্তু সেটা ভরাট করতে পারবে না। আমরা জনস্বার্থে এগুলো উদ্ধার করবো ইনশাআল্লাহ।
এসময় সাভার পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব আব্দুল গণি বলেন, মাননীয় ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সাভার পৌর এলাকায় যত খাল-বিল বেদখল রয়েছে, আমরা তা উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কারণ সাভার পৌর এলাকা সহ সাভারকে জলাবদ্ধতামুক্ত আমাদেরই করতে হবে। যেখানেই জলাধার দখল করে পানির প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হবে, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হবে। আমরা সাভারকে জলাবদ্ধতামুক্ত সুন্দর একটি শহরে পরিণত করতে চাই। আপনারা জানেন, কিছুদিন পূর্বেও পৌরসভার ডাক বাংলো এলাকায় এরকম পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে একটি খাল পুনরুদ্ধার করা হয়েছিলো। এই কার্যক্রম তারা অব্যাহত রাখবেন বলেও জানান সাভার পৌর মেয়র।
অভিযানের ব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলাম জানান, ঈদের একদিন পরেই আমাদের মাননীয় ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান স্যারের নেতৃত্বে সাভার উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব মহোদয়ের উপস্থিতিতে, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহনে পৌরসভার বেদখল হয়ে যাওয়া একটি খাল আমরা পুনরুদ্ধার করেছিলাম। আজ আমাদের এই টিমের এটি দ্বিতীয় অভিযান। এর মাধ্যমে এই ৬নং ওয়ার্ড এলাকা এবং সাভার পৌরসভার মানুষের মধ্যে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তার দু’টি সুফল আমরা পাবো আশাকরি। ভবিষ্যতে কেউ আর খাল অবৈধভাবে দখল করতে যাবে না এবং এখন যারা অবৈধ দখলে আছে তাদেরকে উচ্ছেদ করে দিয়ে আগের অবস্থায় খালকে ফিরিয়ে আনবো আমরা। আইনের কথা যেটি আমাদের মাননীয় উপজেলা চেয়ারম্যান বললেন যে, জমির শ্রেণি বা ‘ন্যাচার’ পরিবর্তন করা যাবে না। খাল-বিল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধার যেভাবে আছে, সেভাবেই সংরক্ষণ করতে আমাদের আইনী কার্যক্রম চালাতে হবে। এই কাজটিতে আমরা নাগরিকদের সহায়তা চাই। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহ সকলের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আমরা একাজে সফল হবো ইনশাআল্লাহ।
দখলদারদের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন কি ব্যবস্থা নেবে এপ্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলাম জানান, আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। এরপরে আমরা নয়নজুলি খাল পুনরুদ্ধারে যাবো। ওই খালের ব্যাপারে মাননীয় ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীর কাছে এবং আমাদের কাছেও বেশকিছু অভিযোগ এসেছে। আমরা সেগুলো যাচাইবাছাই করে যেগুলো অবৈধ দখলে আছে তা ‘পার্মানেন্টলি’ উচ্ছেদ করবো। পুনরায় যাতে তা বেদখল না হতে পারে সেজন্য খালের দুই পাড় সংরক্ষণের ব্যবস্থাও গ্রহন করা হবে।
সরেজমিন অভিযানস্থলের আরেক অংশ সাভার পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ দরিয়ারপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিভিন ভবন খালের জায়গা দখল করে নির্মিত হয়েছে। সবিতা সাহার মালিকানাধীন রণজিৎ কটেজ (হোল্ডিং নং- ২৪/৯) ভবনটিও খালের ভিতরে পড়েছে জানালেন অভিযানে অংশ নেয়া সাভার রাজস্ব সার্কেলের একজন সার্ভেয়ার। শুধু তাই নয়, এই রণজিৎ কটেজ এর সরাসরি কিছুটা সামনে গেলেই একটি ছয়তলা ভবন। এটাও এই বৈরাগীর খাল দখল করে করা হয়েছে।
এব্যাপারে অভিযান পরিচালনাকারী টিম এর সদস্য সাভার রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ জানান, খালের অংশ দখল করে যত বড় ভবনই নির্মাণ করা হোকনা কেন, তা অবৈধ এবং উপজেলা প্রশাসন তা উচ্ছেদ করে খালের প্রবাহ ঠিক রাখবে।
পরে, কাতলাপুর ফুলবাগান এলাকায় বায়তুল মামুর জামে মসজিদের সামনে বৈরাগীর খালের বেদখল হয়ে যাওয়া একটি অংশে দখলদারদের অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দিয়ে খাল পুনরুদ্ধার করা হয়। এসময় সেখানে উপিস্থিত ছিলেন, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোঃ এনামুর রহমান এমপি, সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব, সাভার পৌর মেয়র আলহাজ্ব আব্দুল গণি, সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মাজহারুল ইসলাম, সাভার রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ, সাভার পৌর যুবলীগ নেতা মাজহারুল ইসলাম রুবেল, সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মোঃ সফিউল্লাহ সুজন, উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য রাজু আহমেদ, সাভার উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক প্রমুখ সহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীবৃন্দ।
বার্তাবাজার/পি