‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই, বই এবং বই’- মানব জীবনে বইয়ের গুরুত্বের কথা স্মরণ করে টলস্টয় বলেছিলেন। একইভাবে ৩০০ বছর পূর্বে Joseph Addison বলে গেছেন ‘Reading is to the mind what exercise is to the body’. আর বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার দ্বারা এই কথাটির সত্যতা প্রমাণ করেছে। ব্যায়াম যেমন আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে, তেমনি বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও আনন্দিত রাখতে পারি। একটি ভালো বই মানুষের মনশ্চক্ষু যেমন খুলে দেয়, তেমনি জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে মনের ভিতরে আলো জ্বালাতেও সাহায্য করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বইপ্রেমী প্রান্তিক মানুষের জ্ঞান অর্জনের এক ‘প্ল্যাটফরম’ এবং ভাবনার বাতিঘর হতে অস্তিত্ব লাভ করেছে ‘পানধোয়া উন্মুক্ত পাঠাগার’!
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমের ছোট্ট একটি গ্রাম পানধোয়া। ছবির মতো সাজানো ছিমছাম এক মহল্লা। নানা শ্রেণিপেশার মানুষের বসবাস সেখানে। এই গ্রামের একদল স্বপ্নবাজ ও অনুভবক্ষম কয়েকজন যুবক একদিন একত্রীত হয়। উদ্দেশ্য প্রিয় গ্রামটি হবে স্বপ্নের মতো। কল্পনার এক আদর্শ গ্রাম কিভাবে বাস্তবে রুপ দেয়া যায়, সেই ভাবনায় ব্যকুল হয়ে ওঠে তারা। আর এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে গ্রামের মানুষকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে হবে, এটাই অনুভবে আসে তাদের। এলাকার সব শ্রেণির মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতেই তারা প্রতিষ্ঠা করে ‘পানধোয়া উন্মুক্ত পাঠাগার’।
প্রায় প্রতিটি পাড়া মহল্লাতেই উঠতি বয়সের তরুনদের আড্ডাস্থল সাধারণত চায়ের দোকান, কফি শপ কিংবা মহল্লার বিভিন্ন চিপা গলি। এসব তরুনদের অনেকে সিগ্রেটের নেশায় আসক্ত, কেউ কেউ আরো একধাপ এগিয়ে গাঁজা, হেরোইন কিংবা ইয়াবায় আসক্ত। আর সস্তা প্রযুক্তির বিভিন্ন ধরণের গেমস তো রয়েছেই। মোটকথা, এসব ধ্বংসাত্মক পথে গিয়ে আগামী প্রজন্ম নিজেকে মেধাশূণ্য করার পাশাপাশি পরিণত হচ্ছে মানসিক রোগীতে। পানধোয়া এলাকাও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। এলাকার তরুনদের সুস্থ ও সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে এনে তাদের মেধার বিকাশে একটি পাঠাগার স্থাপনের স্বপ্ন উঁকি দেয় একদল স্বপ্নবাজ যুবকের মাঝে। শুরু হয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের ২৮ মে ‘এসো বই পড়ি, আলোকিত জীবন গড়ি’ শ্লোগানকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করে পানধোয়া উন্মুক্ত পাঠাগার। পানধোয়া বাজারের কেন্দ্রস্থলেই এই পাঠাগারটির অবস্থান।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঠাগারটির সার্বিক উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন, মোবারক হোসাইন, আব্দুল্লাহ পারভেজ, নূর মোহাম্মদ শিমুল, জহিরুল ইসলাম, রাসেল, আব্দুর রাজ্জাক, মাওলানা আবু বকর মুহাম্মদ তাহের, হাফেজ আব্দুল্লাহ আল নাঈম, হাফেজ সাদিকুর রহমান, রবিউল ইসলাম, তানভীর, রাজিব মাহমুদ, ইসরাফিল হোসেন, অনিক আনোয়ার, নাহিদ, মিনহাজুল ইসলাম নাইম, শাকিল, ফয়েজ, প্রিন্স, সাব্বির, মতিউর, রাইসুল ইসলাম প্রমুখ।
সরেজমিন পাঠাগারটিতে গিয়ে দেখা যায়, পাঠাগারটিতে বই প্রেমীদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের বই। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে পাঠাগারটি। রয়েছে সহস্রাধিক বই। এখানে জাতীয় দৈনিক পত্রিকাও রয়েছে দেখা গেছে। শুধু শিক্ষার্থীই নয়, নানা বয়সের বিভিন্ন পেশার মানুষের সমাগম দেখা গেছে পাঠাগারটিতে।
এই পাঠাগারের উদ্যোক্তাদের একজন জানান, এলাকার তরুন সমাজ যেন সামাজিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত থাকে সে লক্ষ্যেই ‘পানধোয়া উন্মুক্ত পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা। পাশাপাশি পাঠাগারের কার্যক্রম দ্বারা এলাকার জনসাধারণের ভেতর বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকান্ডের সচেতনতা বৃদ্ধি, মানবিক গুণাবলীর বিকাশ এবং ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরীর মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ গড়াও তাদের উদ্দেশ্য। আর সবার সহযোগিতা পেলে এই পাঠাগারটিকে একটি আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর পাঠাগারে রুপ দিতে চান তারা।
প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছরে এই পাঠাগারটি এলাকায় মাদক এবং জঙ্গীবাদ বিরোধী নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। স্বেচ্ছায় রক্ত দানে উৎসাহিত করতে পালন করে যাচ্ছে বিনামূল্যে রক্ত দান কর্মসূচি। পাশাপাশি এলাকায় মেধাবী ছাত্রছাত্রী গড়ার লক্ষ্যে কৃতি ছাত্রছাত্রীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ সহ বিভিন্ন আলোচনা সভার আয়োজন করে চলেছে।
একটি গ্রামকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার দ্বারা এবং এখানে বসবাসরত কিশোর ও তরুনদের নেশার করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করে আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসেবে তৈরী করতে ‘পানধোয়া উন্মুক্ত পাঠাগার’ অন্যান্য এলাকার জন্যও অনুসরণীয় হবে এতে কোনো দ্বিমত নেই।
আল মামুন খান/বার্তাবাজার/ই.এইচ.এম