আমার সব কিছু নদীতে চলে গেলো, এখন দাঁড়াবো কোথায়! রাতে ঘুমানোর ছাউনি ও রইলো না। সব জিনিসপত্র জল নিয়ে গেলো। সব কিছু হারিয়ে ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনেক অসুবিধার মধ্যে আছি। অনেক ক্ষতি হলো আমার। তিন দিন ধরে শুধু ভাঙছে। যেটুকু জমি ছিলো, তাও নদী রেখে গেলো না। এখন দাঁড়াবো কোথায়! ঠিক এভাবেই কথা গুলো বলছিলেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের উপজেলার পাচিল গ্রামের স্বামীহারা মইতন বেগম।
জানা যায় গত তিন দিনে জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় শতাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া হুমকির মুখে রয়েছে স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদসহ অসংখ্য স্থাপনা।
বৃহস্পতিবার (৩ জুন) সরেজমিনে গেলে দেখা যায় ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেতে অনেকে ঘর থেকে আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। এদিকে ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তেমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় হুমকির মুখে থাকা এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে পাউবোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভাঙন রোধে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা হাতে পেলেই স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
স্থানীয়রা জানায়, যমুনা নদীতে পানি বাড়ার কারণে গত কয়েকদিন ধরে জেলার শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুড়ী, জালালপুর ও খুকনী ইউনিয়নের পাচিল, হাট পাচিল, পাকরতলা, ব্রক্ষনগ্রাম, জয়পুরা, আরকান্দি, কুঠিপাড়া, ভেকা গ্রামে, এনায়েতপুর থানার দক্ষীণে তীব্র নদী ভাঙন চলছে। মুহূর্তের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি।

বাড়িঘর হারিয়ে ভাঙনকবলিত মানুষদের অনেকে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। সহায়-সম্বল হারিয়ে ছেলে-মেয়ে নিয়ে এসব মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এই ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এরই মধ্যে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক ও পাউবোর সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার অপু। তাঁরা ভাঙন রোধে প্রকল্প নেওয়ার কথা বলেছেন। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে সিরাজগঞ্জ পাউবো সূত্রে জানা গেছে।
পাচিল গ্রামের ডালিম বেগম বলেন, ঘরবাড়ি ভেঙে সব নদীর মধ্যে যাচ্ছে। কোথায় যাব, কী করব, কিছুই জানি না। এখন কী খেয়ে বাঁচব, আর কোথায় দাঁড়াব, সে জায়গা আমাদের নাই। বাঁশ-খুঁটি টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। এখনও অনেক অসহায় মানুষ আছে। এই সময় যদি ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে এলাকার মানুষ রক্ষা পেত।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নুরুজ্জামান বলেন, আমরা এলাকাবাসী হিসেবে জানতে পেরেছি, ভাঙন রোধে পাউবো কাজ করবে। পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর শ্বশুরবাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। তিনি কিছুদিন আগে ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ভাঙন রোধে অচিরেই কাজ শুরু হবে। এখনও তার কোনো প্রতিফলন আমরা দেখতে পাইনি। নদী ভাঙনের ফলে মানুষ রাস্তার ফকির হয়ে যাচ্ছে। শত বছরের বাপ-দাদার বাড়িঘর রেখে রাস্তায় চলে যাচ্ছে। মন্ত্রী বলেছিলেন, এক চাপ মাটিও আর নদীতে পড়বে না। তারপরও নদী ভাঙছে। গত কয়েকদিনে প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে।
এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন,এনায়েতপুরের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ থেকে কৈজুড়ী পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার এলাকায় নদী ভাঙন রয়েছে। এই জায়গায় ভাঙন রোধে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে একনেকে অনুমোদন হবে বলে আমরা আশা করছি। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে স্থায়ী কাজ শুরু করব। তখন আর নদী ভাঙন থাকবে না।
এম এ মালেক/বার্তাবাজার/ই.এইচ.এম