বগুড়ায় বেড়েই চলেছে হত্যা, আত্মহত্যা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। কখনো পারিবারিক কিংবা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব আবার কখনো ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ঘটানো হচ্ছে এসব হত্যাকান্ড। গত মে মাসের ৩১ দিনে এসব কারনে দূর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছে অন্তত ১৫ জন। এছাড়া ছিনতাই, ছুরিকাঘাত ও আত্মহত্যার ঘটনা এ জেলার নিত্যদিনের খবর। নিরীহ মানুষের রক্তে হাত রাঙাতে ঈদের দিনকেও বাদ দেয়নি সন্ত্রাসীরা। প্রায় প্রতি ঈদেই এ জেলায় চলে হত্যা বা ছুরিকাঘাতের ঘটনা ।
বার্তাবাজারের অনুসন্ধান ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উঠে এসেছে এ জেলার সামাজিক অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন দৃশ্য।
গত রবিবার (৩০ মে) বগুড়ার শাহজাহানপুরের সাবরুল এলাকায় প্রকাশ্যে সিহাব উদ্দিন বাবু (৩০) নামের এক স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা।
ঘটনার দুদিন আগে শুক্রবার (২৮ মে) সকালে শাজাহানপুরের সুজাবাদ উত্তরপাড়া দাখিল মাদ্রাসার বৃদ্ধ নৈশ প্রহরী জয়নাল আবেদিন(৭০) কে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
বৃহস্পতিবার (২৭মে)বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের শালফা গ্রামের আয়ুব আলী নামের এক চালককে অজ্ঞান করে অটোরিকশা ছিনতাই করে ছিনতাইকারীরা।
ঐদিন বিকালে বগুড়া শহরের স্টেশন রোডের জামিল নগর এলাকায় সিনেমা স্টাইলে চলন্ত বাস থামিয়ে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দুই নেতাকে উপুর্যপরি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
রবিবার (২৩ মে) বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে শহরের গাজী পালশা এলাকায় সুমি রানী দাস (২০) নামের এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
শুক্রবার (২১ মে) রাত ১০টার দিকে গাবতলী উপজেলার বালিয়াদীঘি গ্রামে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে বন্ধুর ছুরিকাঘাতে আব্দুস সালাম (১৯) নামের আরেক বন্ধু খুন হয়।
ঐ দিন সোনাতলার হারিয়াকান্দি মধ্যপাড়া গ্রাম থেকে ১ দিন নিখোঁজ থাকার পর বাঁশ ঝাড় থেকে জাহিদুল ইসলাম (৬৫) নামের এক বৃদ্ধের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সোমবার(২৪ মে) ধুনট উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের হেউটনগর গ্রামে বাঙালি নদী থেকে মমতা খাতুন (৯০) নামের এক বৃদ্ধা নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
মঙ্গলবার (১২মে) ঈদুল ফিতরের ৩ দিন আগে ঈদ খরচের তিন হাজার টাকা না পেয়ে বগুড়া সদরের বালা কৈগাড়ি গ্রামের মিলন মিয়ার ছেলে ইয়াকুব আলী (১৯) তার নানি আছিয়া বেওয়াকে খুন করে।
ঈদের দিন শুক্রবার (১৪ মে) রাত সাড়ে ৯টার দিকে শহরে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে আব্দুল্লাহ আল রোমান (২২) নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গুরুতর আহত করে সন্ত্রাসীরা । আহত রোমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ডেফোডিলের ছাত্র ও বগুড়া শহরের খাজাপাড়া এলাকার তবিবর রহমানের ছেলে।
ঐ দিন বিকেলে সদরের কৈচর এলাকায় ঈদ উপলক্ষে বগুড়ায় প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ খেলাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে সিহাব (২৫) এবং মেহেদী (২৩) নামের ২ জন গুরুতর আহত হয়।
এছাড়া একই তারিখে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাসার বাথরুম থেকে শহরের মালতীনগর চানমারি ঘাট এলাকার আব্দুর রহমান ডনের স্ত্রী আলপনা আক্তার (১৬) এর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঈদের পরদিন শনিবার (১৫ মে) রাত সাড়ে আটটার দিকে বগুড়ার কাহালুর আলোক ছত্তর এলাকায় ভ্যানচালক বাদশা মণ্ডল ওরফে পুকরুর হাতে প্রাণ হারায় যাত্রী তফিজ মন্ডল (৭৫) ।
ঐদিন জেলার ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়িতে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে জাকির হোসেন স্বাধীন (২২) নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে দূর্বৃত্তরা।
শনিবার(২২ মে) তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা ইউনিয়নের বারপুর স্কুলপাড়ায় আপন বড়ভাইকে আগুনে পুড়িয়ে খুন করার অভিযোগ উঠে ছোট ভাই আপেল (২৮) এর বিরুদ্ধে।
বুধবার (১২ মে) শহরতলীর গোদারপাড়া এলাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারায় নাইম বাবু (১৮) নামের এক ইজি বাইক চালক ।ঐ এলাকার একটি ড্রেন থেকে তার অর্ধ গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
গত রবিবার (৯ মে) রাত সাড়ে ৯ টার দিকে শহরের মালগ্রাম ডাবতলা এলাকায় রনি নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে দূর্বৃত্তরা।
এর আগে মঙ্গলবার (৪ মে) সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে বগুড়া-নাটোর মহাসড়কে শাজাহানপুর উপজেলার জোড়া কৃষি কলেজের সামনে দিন দুপুরে মহাসড়কে সিএনজি আটকিয়ে মোজাফ্ফর হোসেন (৬০) নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা ।
বগুড়ার শিবগঞ্জে মোখলেছুর রহমান (৬০) নামে এক ভ্যান চালককে গলা কেটে হত্যা করে তার অটো ভ্যান ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। গত ৩ মে বেলা ১২ টার দিকে উপজেলার ময়দানহাটা ইউনিয়নের উত্তর কৃষ্টপুর পোল্লারপার গ্রামের পার্শ্বে পাটক্ষেত থেকে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ।
রোববার (২ মে) বিকেল ৪ টার দিকে জেলার শেরপুর উপজেলার খানপুর গ্রাম সংলগ্ন বাঙালি নদীর তীরবর্তী বাঁশঝাড় থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।পুলিশর ধারণা শনিবার (১ মে) রাতে দুর্বৃত্তরা ওই যুবককে হত্যা করে মরদেহ ফেলে রেখে যায়।
শনিবার (১ মে) সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে বগুড়া সদরের বারপুর দক্ষিণপাড়া এলাকার ধান ক্ষেত থেকে দুই দিন আগে নিখোঁজ মশিউর রহমান সোনা মিয়া(৩০) নামের এক দলিল লেখকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যা ও ছিনতাই ছাড়াও এ জেলায় গত মাসে প্রায় ১৫ টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
২৮ মে (শুক্রবার) ভোর রাতে বগুড়ার কাহালু উপজেলার সাতরুখা গ্রামে মোঃ চাঁন মিয়া (৩২) নামের এক ব্যক্তি ঘরের তীরের সাথে গলায় রশি লাগিয়ে আত্নহত্যা করে।
বৃহস্পতিবার (২৭ মে) রাতে নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের মণিনাগ গ্রামে জুয়া খেলা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে জেসমিন আক্তার (২৬) নামের এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করে।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় ভূমি অফিসের মাস্টার রোলে অফিস সহকারী পদে কর্মরত উজ্জ্বল মিস্ত্রি (৪৫) চাকরি হারিয়ে মানসিক অবসাদে নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন। বুধবার (২৬ মে) সকালে পুলিশ তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে।
মঙ্গলবার (২৫মে) স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে বগুড়ার শেরপুরে ময়না বেগম (৪৫) নামের এক নারী গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করে।
একই দিনে শাজাহানপুরে ‘ফ্রি ফায়ার’ খেলতে না দেওয়ায় উম্মে হাবিবা বর্ষা (১২) নামে এক স্কুলছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
এছাড়া এই তারিখে ঐ উপজেলার (বি-ব্লক) রহিমাবাদ গ্রামে৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পুড়ুয়া উম্মে হাবিবা বর্ষা (১১) নামে এক শিশু শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।
শনিবার (২২ মে) আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে মোবাইল ফোন দেখা ও পারিবারিক কলহের কারনে তন্দ্রা ভৌমিক (১৫) নামের এক দশম শ্রেনির স্কুল ছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
শুক্রবার (২১ মে) জেলার আদমদীঘিতে বিষাক্ত গ্যাসট্যাবলেট সেবনে সুমন প্রামানিক (২৮) নামের এক যুবক আত্মহত্যা করে।
শুক্রবার (২১ মে) বগুড়ার আদমদীঘির তালশন গ্রামের টুটু প্রামানিকের ছেলে সুমন (২৫) ও নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের মণিনাগ গ্রামে জেসমিন আক্তার (২৬) নামের এক গৃহবধূ স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করে।
রবিবার (১৬ মে) শিবগঞ্জ উপজেলার বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের জামুরহাট গ্রামের তোতা মিয়ার ছেলে রাজু মিয়া(২১) স্ত্রীর উপর অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
একই দিন শিবগঞ্জে ফ্রী ফায়ার গেমস্ খেলার জন্য পরিবারের কাছ থেকে স্মার্টফোন চেয়ে না পাওয়ায় অভিমান করে আখিরুল ইসলাম (১৩) নামের এক স্কুল ছাত্র গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।
বুধবার (০৫ মে) বগুড়ার শেরপুরের গাড়ীদহ ইউনিয়নের হাপুনিয়া গ্রামের ফিরোজ আলীর স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৪৮) ছেলের বউয়ের ওপর অভিমান করে বিষপানে আত্মহত্যা করে।
এর আগে মঙ্গলবার (৪ মে) সকালে পরিবারের সদস্যদের অগচরে গ্যাস ট্যাবলেট সেবনে আত্মহত্যা করে উপজেলার চন্ডিহারা গ্রামের মুস্তাফিজার রহমানের ছেলে আমিন (২৬)।
সোমবার (০৩ মে) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া শহরের বড়গোলা এলাকায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও শত শত মানুষের সামনে পাঁচতলা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে টমাস (৩৮) নামের এক যুবক।
জেলা জুড়ে হত্যা,ছিনতাই ও অপমৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় চিন্তিত সচেতন মহল। তাদের দাবি সাড়াশি অভিযানের মাধ্যমে খুব দ্রুত সময়ে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া পারিবারিক কলহে সৃষ্ট আত্মহত্যা ও সামাজিক অপরাধ দমনে সামাজিক সংগঠন ও সমাজপতিদের জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করতে হবে।
বগুড়ার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে আমাদের নিয়মিত টহল ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত কারনে খুনের ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা অবনতির কারন বলা যাবেনা। কারন, এসব হত্যাকান্ড আমরা তাৎক্ষণিক রোধ করতে পারিনা। আমরা এ ধরনের হত্যাকান্ডের পর আসামী গ্রেপ্তারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছি। এছাড়া জেলার মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও চোরদের আইনের আওতায় আনতে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বার্তা বাজার/শাহরিয়া