ঢাকার বনগাঁও ইউনিয়নে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি ইজিপিপি-EGPP (Employment Generation Programme for the Poorest) ২য় পর্যায়ের প্রকল্পে সরকারি বিধি না মেনে ভেকু (খনন যন্ত্র) ব্যবহার ও নির্ধারিত শ্রমিকের চেয়ে কম শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিন প্রকল্প স্থানে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে কথা বলে বিষয়টি জানা যায়। এছাড়া প্রকল্পের রাস্তায় গিয়ে রাস্তার পাশ থেকে মাটি কেটে নেয়ার জায়গায় ভেকু দিয়ে কাটার চিহ্ন দেখেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যও মুঠোফোনে ভেকু ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন।
২০২০-২০২১ অর্থবছরে বনগাঁও ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের গান্ধারিয়া ডিপ টিউবওয়েলের রাস্তা হতে ছান্দা বস্তির সীমানা পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়ন কাজে ১৬ লক্ষ ৭২ হাজার টাকার প্রকল্প বরাদ্দ আসে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন ২০৯ জন হতদরিদ্র শ্রমিক ২০০ টাকা মজুরিতে মোট ৪০ দিনে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা।
এই বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য এই প্রতিবেদকসহ দৈনিক মুক্তখবর এর ষ্টাফ রিপোর্টার ফয়জুল ইসলাম, সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রার প্রতিনিধি ইমদাদুল হক এবং Daily Tribunal পত্রিকার ষ্টাফ রিপোর্টার মামুন মোল্লা সহ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদক দল প্রকল্পস্থানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে।
এসময় রাস্তার কাজ যে ছান্দা বস্তি এলাকায় চলছে, সেখানে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে কথা হয়। এই প্রতিবেদকের নিকট ভিডিও বক্তব্যে তারা জানান, রাস্তার কাজ করার সময় মাটি কাটা হয়েছে ‘ভেকু (খননযন্ত্র)’ দিয়ে। আর এসব মাটি রাস্তার উপরে ‘লেভেল’ করার কাজে শ্রমিক ব্যবহার করা হয়েছে, তবে প্রতিদিন ২০৯ জন শ্রমিক ব্যবহার করতে তারা দেখেন নাই।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) এর মূল উদ্দেশ্যই হলো – কর্মহীন মৌসুমে স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থান এবং স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কর্মক্ষম দুঃস্থ পরিবারগুলোর সুরক্ষা। মূলত এলাকার অতিদরিদ্র এবং মৌসুমী বেকার শ্রমিক পরিবারের জন্য এই প্রকল্প। এখন যদি এদেরকে বাদ দিয়ে কিংবা নির্ধারিত শ্রমিকদের চেয়ে অনেক কম শ্রমিক নিয়ে মাটি কাটার কাজটা খননযন্ত্র দিয়ে করানো হয়, তাহলে তো এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে! আবার অল্প শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়ে কাজ শেষে প্রকল্পে উল্লেখিত শ্রমিকদের বিল উত্তোলনও বৈধ হবেনা। কিন্তু সাধারণত প্রকল্পে উল্লেখিত সংখ্যার শ্রমিকদের সকলের বিল উত্তোলিত হতে দেখা যায়। এই ২০৯ জন শ্রমিকের ‘জব কার্ড ‘ তথ্য অধিকার আইনে বনগাঁও ইউপি সচিবের কাছে চাওয়া হয়েছে। ওই তথ্য পেয়ে ‘ফলো-আপ’ প্রতিবেদনে এবিষয়টি ১০০ ভাগ নিশ্চিত করা যাবে।
গান্ধারিয়া ডিপ টিউবওয়েলের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিডিও বক্তব্যে এখানে বসবাসরত মিঠু নামের একজন বলেন, বনগাঁও ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ছান্দা বস্তিকে ঘিরে কয়েকটি দিকে রাস্তায় মাটি ফেলে রাস্তার কাজ করা হচ্ছে। এই মাটি কাটার কাজ ভেকু দিয়ে করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, তিনি একদিন আনুমানিক ৬০ জন শ্রমিককে ভেকুর কাটা মাটি রাস্তায় এনে সমান করতে দেখেছেন।
এখানে বসবাসরত বয়োঃবৃদ্ধ আব্দুল গফুর জানান, তিনি গান্ধারিয়া পশ্চিম পাড়ার ছান্দা এলাকায় রাস্তা বানাতে দুইদিন ভেকু দিয়ে মাটি কাটতে দেখেছেন। তবে মাটি কাটার কাজ শ্রমিকদের করতে তিনি দেখেন নাই, শ্রমিকেরা শুধু ভেকু দিয়ে কাটা মাটি রাস্তায় ফেলে সমান ( লেভেল) করেছে। এসময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাস্তার যে অংশ থেকে ভেকু দিয়ে গভীরভাবে মাটি কেটে নেয়া হয়েছে, সেগুলোর বিপরীত দিকে বস্তির বাড়িঘর। এই বর্ষায় সেগুলো পানিতে পূর্ণ হয়ে গেলে শিশুরা অসতর্কভাবে পড়ে মারা যাবার সম্ভাবনা থেকে গেলো। আর এই বর্ষায় ওই সব জায়গায় রাস্তার মাটি ভেঙ্গে রাস্তা নষ্ট হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
একই কথা বলেন ওখানে বসবাসরত বয়োঃবৃদ্ধা নুরজাহান বেগম, মোঃ নেয়ামতউল্লাহ এবং মোঃ ফরিদ হোসেন। ভিডিও বক্তব্যে এই প্রতিবেদককে তারা সবাই জানিয়েছেন, রাস্তার মাটি কাটার কাজ ভেকু দিয়েই করানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, একটি ভেকু একদিন কাজ করলে অনেক শ্রমিকের কয়েকদিনের মাটি কাটার চেয়েও বেশী মাটি কাটতে পারে। আর এই সুযোগটাই গ্রহন করে দূর্ণীতিগ্রস্ত জনপ্রতিনিধিগণ। তারা প্রকল্পে উল্লেখিত শ্রমিকের চেয়ে অনেক অনেক কম শ্রমিক নিয়ে ভেকুর সাহায্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে প্রকল্পে উল্লেখিত শ্রমিকের বরাদ্দকৃত অর্থ তুলে নেয়। বনগাঁও ইউনিয়নের এই প্রকল্পের কাজটি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম তার ভাতিজা রাসেলকে দিয়ে করিয়েছেন বলেও জানান ছান্দা বস্তি এলাকার স্থানীয়রা।
এব্যাপারে মুঠোফোনে প্রকল্পস্থানের ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ ছিদ্দিকের নিকট জানতে চাইলে প্রথমে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম নিজেই এই রাস্তার কাজ করাচ্ছেন। পরে, কাকে দিয়ে করাচ্ছেন এই প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ‘আমরাই দায়িত্বে আছি, লোক দিয়ে করাচ্ছি।’
এসময় তিনি আরও বলেন, রাস্তা তার ওয়ার্ডে হলেও চেয়ারম্যান কাজটা করাচ্ছেন। এখনও রাস্তার কাজ সম্পূর্ণ হয়নি বলে জানান তিনি। তবে প্রতিদিন কতজন শ্রমিক কাজ করেছে বা করছে, এই প্রতিবেদককে তার সঠিক সংখ্যা তিনি বলতে পারেন নাই। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শ্রমিক অনেক খাটছে, আমার খাতায় লেখা আছে, দেখে পরে আপনাকে জানাতে পারবো।’
এসময় ভেকু ব্যবহারের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি ভেকু দিয়ে মাটি কাটার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এপ্রসঙ্গে তিনি জানান ভেকু এবং ‘লেবার’ দুইটা দিয়েই কাজ করা হয়েছে। লেবার পাওয়া যায়না এবং শক্ত মাটি কাটতে ভেকুর ব্যবহার করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে ‘লেবার’ পাওয়া যায়না স্থানীয় ইউপি সদস্যের এই বক্তব্যের পরে ছান্দা বস্তি এলাকার মানুষের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ‘তাদের এই এলাকায় হতদরিদ্র মানুষের অভাব আছে কিনা যারা কাজ করতে পারে?’ নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভিডিও বক্তব্যে জানান, এটা বস্তি এলাকা, এখানে এবং আশেপাশের এলাকায় অনেক হতদরিদ্র শ্রমিক আছে। তাদের সংখ্যা ২০০ জনের মতো হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর চেয়েও বেশী শ্রমিক আছে যারা এই মাটি কাটার কাজ করতে পারবে। এদিক থেকে ইউপি সদস্য মোঃ ছিদ্দিক এর ‘শ্রমিক স্বল্পতার কারণে ভেকু ব্যবহার করতে হয়েছে’ সেটাও সত্য নয় বলে স্থানীয়দের কথায় প্রমানিত হয়।
এব্যাপারে জানতে চেয়ে মুঠোফোনে বনগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামকে একাধিকবার কল করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Daily Tribunal পত্রিকার ষ্টাফ রিপোর্টার মোঃ মামুন মোল্লা মুঠোফোনে সাভার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ একরামুল হক এর নিকট এব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলামকে এবিষয়টি জানালে তিনি বিষয়টির তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলে জানিয়েছেন।

তবে, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি ইজিপিপি প্রকল্পে আসলেই কিছু সমস্যা রয়ে গেছে যা সরকারের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের গোচরীভূত করা প্রয়োজন। প্রথমতঃ প্রকল্পের অপ্রতুল বরাদ্দ। একজন শ্রমিকের জন্য প্রতিদিন ২০০ টাকা বরাদ্দ, এর থেকে আবার সঞ্চয় হিসেবে ২৫ টাকা জমা রাখা হয়। এই পরিমাণ অর্থে শ্রমিক পাওয়া অসম্ভব নাহলেও প্রকল্প কাজের তদারকি যারা করেন তাদেরকে এই টাকায় শ্রমিক জোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হয়। এজন্য প্রতিদিনের বরাদ্দের পরিমান আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করে স্থানীয় ইউপি জনপ্রতিনিধিগণ।
আবার, রাস্তার কাজ করতে গিয়ে এমন এলাকা আসে যেখানের মাটি কোদাল দিয়ে কাটা অনেক কষ্টসাধ্য। পাশাপাশি রয়েছে প্রকল্পের সময়সীমায় অনেক এলাকায় পানি চলে আসা এবং বৃষ্টির বিষয়টিও মাথায় রেখে দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ অনুভব করেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কারণেই ভেকু ব্যবহার করছেন এমন এমন অভিমত তাদের। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্ষেত্রে প্রকল্প যখন নির্ধারণ করা হয়, ওই সময়েই প্রকল্পের কতটুকু শ্রমিকদের দিয়ে এবং কতটুকু ভেকু দিয়ে করা হবে এবিষয়ে প্রস্তাব রেখে চূড়ান্ত অনুমোদন করা যেতে পারে।
পরিশেষে, সরকারি বিধি মানতেই হবে সবাইকে। প্রয়োজনে বিধির সংস্কার করতে হবে। কিন্তু ২০৯ জন শ্রমিকের বদলে ৬০/৭০ জন শ্রমিক দিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করে ২০৯ জনের বিল উত্তোলন নিশ্চয়ই আইনসিদ্ধ হবে না। আর খননযন্ত্র (ভেকু) ব্যবহার এই প্রকল্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থান করে। ইজিপিপির মূল উদ্দেশ্যে কর্মহীন মৌসুমে স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থান এবং স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কর্মক্ষম দুঃস্থ পরিবারগুলোর সুরক্ষা। যদি যন্ত্রই ব্যবহৃত হয় সিংহভাগ কাজে, তবে শ্রমিকের সংখ্যা আপনাতেই কমে যেতে বাধ্য। ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার এই দূরদর্শী প্রকল্পের আসল উদ্দ্যেশ্যই ব্যাহত হবে। এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদক দল এমনটা দেখতে পেয়েছেন বনগাঁও ইউনিয়নে।
বার্তা বাজার/এস.আর