কর্ণপাড়া খাল সাভারের একটি ঐতিহ্যবাহী খাল। এই খালের উৎসমুখ ধলেশ্বরী নদীর বাম তীর (Left bank)। বিখ্যাত বিল বাঘিলের বেশীরভাগ অংশ ভূমি খেকো মানুষগুলো নিজেদের করে নেয়ায় বর্তমানে বিলটি খালে পরিণত হয়ে কর্ণপাড়া খালের সাথে মিলিত হয়ে তুরাগ নদীর সাথে মিলেছে। প্রাচীন কর্ণপাড়া খালের ক্ষীণ স্রোতধারা বহমান থাকলেও এই খালের বিভিন্ন সেকশনের পাড় দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিগন। কর্ণপাড়া খালের বাম পাশে উলাইল এলাকা অঘোষিত শিল্পাঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। এককথায় বলা যায়, এ এক ভয়ঙ্কর এলাকা! সাভারের সবচাইতে অনিয়মের ভাগার।
অঘোষিত এই শিল্প এলাকার সকল বর্জ্যই কর্ণপাড়া খালে পতিত হচ্ছে বিনা বাধায়। প্রশাসনের সম্মুখে অত্যন্ত নগ্ন ভাবে। বছরের পর বছর ধরে। দেখবার কেউ নেই! বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, কর্ণপাড়া খালের মাঝখানে দু’তলা একটি বাড়ী নির্মাণ করে বহাল তবিয়তে রয়েছে দখলকারী!! প্রতিনিয়ত চলছে খালের উভয় পাশের দখলদারদের ‘প্রতিযোগিতা দিয়ে দখলের মহড়া!’
দখলের ধরণটিও বেশ বিচিত্র। প্রথমে খালের তীরে অথবা বুকে ফেলা হয় পৌরসভার আবর্জনা। কিংবা খালের পাড়ে গড়ে ওঠে গার্মেন্টস সংশ্লিষ্ট ‘ঝুট’ (অব্যবহৃত বর্জ্য) এর গোডাউন। তারপর ধীরে ধীরে খাল ভরাট করে তাতে গড়ে ওঠে স্থাপনা। যার নেপথ্যে থাকে প্রভাবশালীরা। সাভারে মূলত নয়ারহাট থেকেই দখলের শুরু। সাভার বাজারেও নদী দখল করে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের অবৈধ স্থাপনা। এরই ধারাবাহিকতায় রক্ষা পায়নি তুরাগ নদী সংযোগকারী কর্ণপাড়া খালও। এই খালের বুক চিরে উঁচু দ্বিতল ভবন গড়ে উঠলেও, কেবল মাপ আর নির্দেশনা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের নদী আর খাল রক্ষার নানা আয়োজন!

সরেজমিন কর্ণপাড়া ব্রিজের পশ্চিম পাশে গিয়ে দেখা যায়, খালের পাড় ঘেঁষে বেশ কয়েকটি ঝুট এর গোডাউন। সাভারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই এসব গোডাউনের মালিক। ব্রিজ সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দাঁড়ালেই দেখা যায় ক্রমাগত দখল আর দূষণে কীভাবে ঐতিহ্যবাহী এই খালটি মরে যাচ্ছে। ঝুটের গোডাউনগুলোর মালিকেরা তাদের মালামাল ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলায়’ খালের তীর ঘেঁষে ফেলে রেখেছে। এগুলো খালের শীর্ণ স্রোতধারাকে দমিয়ে দিয়ে অর্ধেকের বেশী খালের জায়গা ভরাট করে রেখেছে। এসব ময়লার আবর্জনা এতটাই পুরু হয়েছে যে, এই প্রতিবেদক সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করতে পেরেছেন!
আর খালের পানির কথা বললে সেদিকেতো তাকানোই যায়না। ভয়ঙ্কর পানির রঙ এবং ওখানে হাজারো জীবাণুর বাস তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কলকারখানা ও গার্মেন্টস শিল্পের অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নামছে এই খালে। আর বর্ষাকালে এই দূষিত পানি খাল হয়ে মিশছে তুরাগ ও বংশী নদীতে। ভারী বর্ষায় খালের তীর উপচে সেগুলো বিভিন্ন এলাকায় খাবার পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্য পড়ছে হুমকির মুখে।
এবিষয়টি নিয়ে কথা হয় সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সায়েমুল হুদার সাথে। বার্তা বাজারকে তিনি জানান, এভাবে ময়লা, আবর্জনা ও কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য পানির সাথে মিশে ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ড্রিস, টাইফয়েড সহ চর্মরোগ ব্যপকভাবে দেখা দিতে পারে।
সর্বশেষ ২০১০ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখে সাভার কর্ণপাড়া খাল দূষণের দায়ে বাংলাদেশ ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি শিল্প কারখানাকে ১৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা জরিমানা করেছিলো পরিবেশ অধিদপ্তর। সেসময় অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নির্গমন বন্ধ করে ইটিপি চালুর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিলো। বরং যদি ইটিপি চালু না করা হয় তবে কারখানার বিদ্যুৎ ও সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে কারখানা বন্ধ সহ মামলা দায়েরের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। দোয়েল গ্রুপের সহযোগী ওই প্রতিষ্ঠানে আকস্মিকভাবে সেই অভিযানটি পরিচালনা করেন ওই সময়ের পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকার পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী।
তবে এরপর এরকম আর কোনো উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালিত হতে দেখা যায়নি। তাই বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের শিল্প-কারখানাগুলোর ক্রমাগত অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলায় এবং দখলদারদের দখল প্রক্রিয়া চলমান থাকায়, ধুঁকছে কর্ণপাড়া খাল।
এব্যাপারে কথা হয় সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সামছুল হকের সাথে। বার্তা বাজারকে তিনি জানান, সাভারের জীববৈচিত্র আর পরিবেশ বাঁচাতে হলে আগে বাঁচাতে হবে নদীকে। কিন্তু দখলে ও দূষণে নদী মরে সংকুচিত হয়ে কোথাও কোথাও পরিণত হয়েছে খাল আর নালায়। আবার এসব খালও দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সাভারের কর্ণপাড়া খাল। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সাভারে কোনো নদী কিংবা খাল আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এদের ঠাঁই হবে ইতিহাসের পাতায়!

একই কথা জানান নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ, সাভার এর সভাপতি মোঃ রফিকুল ইসলাম (ঠান্ডু মিয়া)। বার্তা বাজারকে তিনি বলেন, সাভারের প্রাণ ছিলো এক সময়ের উত্তাল বংশাই নদী। মূলত এই নদী ঘিরেই গড়ে উঠেছিলো এক সময়ের সম্ভার নামের আজকের সাভার। জীবনযাত্রার সকল আয়োজন, ব্যবসা-বাণিজ্য আর সহজ যাতায়াতের মাধ্যম ছিলো এই নদী। যা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে মানুষের আগ্রাসী খেয়াল, দখল আর দূষণে। নদী বাঁচাতে আমরা পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হলেও প্রশাসনের নেই তেমন কোনো তৎপরতা।
এপ্রসঙ্গে তিনি বেশ কিছু সুপারিশমালা তুলে ধরেন। সেগুলো হলো- নদী ও খাল দখল মুক্ত করে সেগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা, মন্ত্রণালয় বা সরকারি সংস্থার দ্বারা প্রকল্পের মাধ্যমে বংশী নদীর এখন পর্যন্ত জীবন্ত অংশটুকুর (নয়ারহাটের তেমোহনা থেকে সাভারের কর্ণতলী খাল পর্যন্ত) পুনরুদ্ধারের পর দুই পাড়ে ‘ওয়াকওয়ে’ (Walkway) সবুজায়ন সহ উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করা, শিল্প কারখানার বর্জ্য নদী ও খাল/বিলে ফেলা বন্ধ করার ব্যবস্থা করা, ট্যানারির সিইপিটি (CEPT) সারা বছর কার্যকর রাখা, প্রশাসন কর্তৃক নদী ও খাল দখলকারীদের তালিকা মোতাবেক উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা প্রভৃতি।
এব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাজহারুল ইসলাম জানান, সাভার উপজেলা প্রশাসন সাভারের নদী-খাল ও অন্যান্য জলাশয়গুলো দখল মুক্ত করতে কাজ চলমান রেখেছে। আমি সদ্য সাভারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেছি। ইতোমধ্যে গত ১৬ মে, ২০২১ তারিখে সাভার উপজেলার ডাকবাংলো সংলগ্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা একটি খাল মাননীয় দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক শ্বাসরুদ্ধকর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে দখলমুক্ত করেছি। আপনারা জানেন, সদ্য দখলমুক্ত করা এই খালটিই ছিলো সাভার সরকারি হাসপাতাল, সাভার মডেল থানা, সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, সাভার কলেজ, সাভার গার্লস স্কুল, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ব্যাংক কলোনি, তালবাগ, মধ্যপাড়া, দক্ষিন পাড়া এবং সাভার উপজেলা পরিষদসহ সকল স্থানের পানি প্রবাহের একমাত্র রুট। এসব এলাকার পানি এই খাল দিয়ে সরাসরি বংশী নদীতে প্রবাহিত হতো। বেদখল হবার কারণেই পৌরসভার ওইসব এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। ওই অভিযানের ফলে এবছর জলাবদ্ধতা এই অঞ্চলে সেভাবে হবেনা।
কর্ণপাড়া খাল সহ পর্যায়ক্রমে সাভারের অন্যান্য খাল ও বেদখল হয়ে যাওয়া জলাশয়গুলো দখল মুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।
পরিশেষে, যে পরিবেশ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে এবং বাঁচিয়ে রাখবে তা রক্ষার দায় আমাদেরই। আমাদের নিজেদের জন্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের সুস্থ্য জীবনের জন্য নিজ নিজ এলাকার পরিবেশকে দূষণ মুক্ত রাখতে হবে। মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিলো নদীর তীরকে কেন্দ্র করে। তাই নদী, খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো মরে গেলে সভ্যতারও মৃত্যু ঘটবে। বংশী, ধলেশ্বরী আর তুরাগ নদী দ্বারা বেষ্ঠিত সাভার উপজেলা একসময়ে কতটা সমৃদ্ধ ছিলো, আগামী প্রজন্ম হয়তো তা জানবে না। তবে এসব নদীগুলোর যতটুকু এখনও জীবন্ত রয়েছে, তাকে দখল ও দূষণ থেকে রক্ষা করতে না পারলে অচিরেই সাভার নামের জনপদটি বসবাসের অযোগ্য এক জনপদে পরিণত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মোঃ আল মামুন খান/বার্তাবাজার/ভিএস