প্রয়াত বাবার স্বপ্ন বুকে ধারন করে আলো ছড়াতে বার্ধক্য বয়স হার মেনেছে সুরথ চন্দ্র দে (৯০) নামে এক শিক্ষকের কাছে। বয়সের ভারে ন্যূয়ে পড়লেও এখনো শিক্ষার্থীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শিক্ষার আলো ছড়াতে দমে যাননি তিনি। প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রী পড়ান এই শিক্ষক। এ বয়সেও তাঁর দৃষ্টিশক্তি আজও যৌবনের মতো। তাঁর অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা বর্তমানে দেশ-বিদেশে রয়েছেন।
সুরথ চন্দ্র দে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় পৌরশহরে ১নং ওয়ার্ডের সাধুপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর পিতা ছিলেন প্রয়াত বিধুভূষন দে। চার ছেলে ও তিন মেয়ে সন্তানের জনক এই শিক্ষক এবং গত তিন বছর পূর্বে ব্যর্ধক্যজনিত কারনে তাঁর সহধর্মিনীকে হারান তিনি।
গভীর জঙ্গল বেষ্টিত সাধুপাড়া গ্রামটি ছিল তাঁর বাবা ও দাদাদের পৈতৃক ভিটে। এই ভিটেতে জন্ম নেন শিক্ষক সুরথ চন্দ্র দে। গ্রামটি বর্তমানে পৌরসভাধীন হলেও আগের আমলটা ছিল শত বছর পূর্বে সুসং মহারাজার শাসনকাল। তাঁর বাবা বিধুভূষন দে’র স্বপ্ন ছিল কোমলমতি শিশুদের লেখাপড়ায় পারদর্শী করতে হলে যে কাজটি বেশী প্রয়োজন তা হল বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজী সঠিক বর্ণবোধ, অঙ্কের ধারাপাত, কবিতার ছন্দের তালে নামাতা শিক্ষা। তবেই কোমলমতি শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে পড়বে সঠিক শিক্ষা। শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি না থাকলেও ভাবতেন শিক্ষকরাই মানুষ গড়ার কারিগড়। এ চিন্তায় তারা পিতা বিধুভূষন দে শিশুদের সঠিক শিক্ষায় আলোকিত করতে প্রদীপ হাতে নিয়েছিলেন।
শত বছর পূর্বে সুরথ চন্দ্র দে তার উত্তরসূরীরা ভারতে চলে গেলেও তিনি পৈতৃক ভিটে ছাড়েননি। শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে সেসময়কার ও এখনকার লেখা-পড়ার ধরণ আকাশ পাতাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় এই শিক্ষকের মাঝে। প্রয়াত বাবার ‘শিশু শিক্ষা’র চেতনাকে বুকে ধারন করে শিশুদের মাঝে আলো ছড়াতে প্রদীপ তুলে নেন সুরথ চন্দ্র দে। তাঁর নিজ বসত ভিটায় শিশুদের নিয়ে প্রথমে কাজ শুরু করেন। তার শিক্ষার প্রসার সমস্ত উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। তিনিও তার বাবার মত তেমন লেখাপড়া করতে পারেননি। তখনকার আমলে দুর্গাপুর উপজেলায় মহারাজা কুমুদ চন্দ্র মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে সরকারী) ছাড়া আর অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। তাই তিনি শিক্ষার প্রদীপ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন আলো জ্বালাতে পাড়া-মহল্লায়।
তার বহু ছাত্র-ছাত্রী দেশ বিদেশে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চাকুরী করছেন। বর্তমানে ৯০ বছর বয়সী সুরথ স্যার এর চোখের দৃষ্টি এত প্রকট, তিনি কখনও চশমা ব্যবহার করেন না। পুরনো জীর্ণ-শীর্ণ ছাতা কাঁধে নিয়ে বয়সের ভারে ন্যূয়ে ন্যূয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষকতা করছেন। তার মেধাবী ছাত্র আমেরিকায় বসবাসরত ড. রইছ উদ্দিন, আকবর হোসেন, অধ্যাপক মজিবর রহমান। ভারতে অবস্থানরত এডভোকেট বাসুদেব চক্রবর্তী, জনি ভাওয়াল, বলাই দে। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর অনুষদের মেধাবী ছাত্র নেত্রকোনার আলোকিত মানুষ ভাস্কর মোঃ মাহমুদুল হাসান সোহাগ, গ্রাফিক্ ডিজাইনার মোঃ সাইফুল হাসান শান্ত, দুর্গাপুরের সিনিয়র সাংবাদিক (দৈনিক সংবাদ) মোঃ মোহন মিয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত সোনা মিয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত, প্রতিবেদক রাজেশ গৌড়সহ নাম না জানা আরও অনেকে রয়েছেন।
দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক মোহন মিয়া (৭০) জানান, আমার বাল্যকালের শিক্ষক তিনি। প্রতিটি বাবা মা তার সন্তানকে যেমন হাত ধরে ধরে হাঁটতে শিক্ষায় ঠিক তেমনি তিনি একজন ছাত্রকে হাতে ধরে ধরে তিনি শিক্ষার আলো দিয়েছে। আমার ছেলে সোহাগের ব্যল্যকারের শিক্ষকও তিনি। সত্যি আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি আমার বাল্যকালের শিক্ষক যিনি আমাকে ছেলের বাল্যকালের শিক্ষকও তিনি।
শিক্ষক সুরত চন্দ্র দে’র নাতি সুব্রত দে বলেন, তার দাদা এখনো বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের পড়ান। বইয়ের পাতার লেখা চমশা ছাড়া পড়তে পারেন। তিনি এখনো সুস্থ আছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কোমলমতি শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে তাঁর দাদার জন্য সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন।
শিক্ষক সুরথ চন্দ্র দের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, শিক্ষকতা জীবনে প্রথম দিকে ২-৩ টাকা হারে মাসিক বেতন পেয়েছেন। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাকে মাসিক বেতন ২’শ থেকে ৩’শ টাকা দিচ্ছেন। দরিদ্র অভিভাবকদের কাছ অর্থ নেন না, তারপরও তিনি আনন্দিত। ঈশ্বরের কাছে তার প্রার্থনা মরনের আগ পর্যন্ত যেন শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যেতে পারেন।
রাজেশ গৌড়/বার্তাবাজার/পি