পুঁজি ছাড়া ব্যবসা শুরু করে জ্যোতির মাসে আয় লাখ টাকা

এক বাচ্চা, সংসার সামলেও সফল উদ্যোক্তার খাতায় নাম লিখিয়েছেন মাহবুবা খান জ্যোতি। বর্তমানে তিনি টাঙ্গাইলের একজন পরিচিত মুখ। যার কাছে মিলবে আপনার পছন্দ অনুযায়ী ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর কেক, বিভিন্ন আইটেমের খাবার, বিভিন্ন রকমের আচার, আমসত্ব, হাতের তৈরি ডিজাইনের শাড়ি, পাঞ্জাবি। তার উদ্যোক্তার নাম ‘স্বপ্নের সন্ধানে’।

বলছিলাম টাঙ্গাইল শহরের থানা পাড়া এলাকার মেয়ে মাহবুবা খান জ্যোতির কথা। বিয়ের পর মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, এমন ধারণাকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে আজ তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। মাত্র ৪৩ দিনেই হয়ে গেছেন লাখপতি। ঘরে বসেই তিনি মাসে আয় করছেন এক লাখ টাকা। পড়াশোনা চলাকালীন বিয়ে হয়ে যায় মাহবুবা খান জ্যোতির। তার স্বামী বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত আছেন। এরপর এক বাচ্চা ও সংসার সামলে কোনো চাকরিতে যোগদান করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আগে থেকেই ইচ্ছা ছিল নিজে কিছু করবেন। সময়-সুযোগের অভাবে কিছু করা হয়ে ওঠে নাই। এক মেয়ে একটু বড় হওয়ার পর ভাবলেন কিছু একটা করা উচিত। সে অনুযায়ী গতবছর জয়েন করেন ‘উই’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে। জ্যোতি ভরসা করেন উইতে। তাতে যুক্ত হওয়ার পর গতবছরের জুন থেকে কাজ শুরু করেন। নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করতে শুরু করেন আচার, আমসত্ত্ব । ইতোমধ্যে তার আমসত্ব সাড়া ফেলেছে টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলা ও দেশ-বিদেশে। আমসত্ব, আচার গুণগত মান নিয়ে সন্তুষ্ট তার ভোক্তারা। তাই অর্জন করেছেন টাঙ্গাইলে আমসত্ব জ্যোতি খেতাব। ক্রেতাদের কাছ থেকেই পেয়েছেন এ নাম। জ্যোতির উদ্যোগে বর্তমানে ২ জন মেয়ে কাজ করছেন। তবে টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলা ও দেশ-বিদেশে ডেলিভারি দিয়ে থাকেন তিনি। এটাকে আরও প্রসারিত করার চিন্তা তার।

পুঁজি ছাড়া বস্যবসা শুরু করে জ্যোতির মাসে আয় লাখ টাকা। -বার্তাবাজার

মাহবুবা খান জ্যোতি বার্তা বাজারকে বলেন, আমি ছিলাম সংসারী বউ আর এক কন্যার মা। অবসর সময়ে ফোন এ সময় কাটাতাম বেশি। ২০২০ সালের জুন মাসের ১১ তারিখ ভুল বসত জয়েন হয়ে যাই “উই” নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে। লাখপতি লাখপতি লাখপতি এসব কথা গুলোর ছড়াছড়ি। আর একটি নাম “রাজীব স্যার”। কোন কৌতুহল নয় শুধু “রাজীব স্যার” কে জানার জন্যই ঘাটাঘাটি করছিলাম গ্রুপটিতে। প্রত্যেকটা লেখায় পেয়েছিলাম অনুপ্রেরণা।

জ্যোতি বলেন, উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা ছিল না। পেশাগত দিক থেকে আমার হাসবেন্ড “মেরিনার” ছুটিতে এসেছিলেন দেশে। মহামারী করোনার জন্য আটকে যায়। অভাবের মুখটা তখন দেখতে পাই। ইচ্ছা না থাকলেও হাসবেন্ডের পাশে থাকতে চেয়েছিলাম। দুঃখের ভাগিদার হতে চেয়েছিলাম। লাখপতি হওয়ার জন্য কাজ করিনি। নিজের কাজের ১০০ ভাগ দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। লাখপতি হওয়ার আগে ‘মিলিয়নিয়ার’ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্ন টা ছিল বিশাল। অনেকে কটূ কথা বলেছেন আচার সেল কে খায় আচার? মানুষ কিনে খায় এসব? প্রশ্নের উত্তর দেইনি তখন । জবাবটা হয়তো আজ আমায় দেখে তারা বুঝতে পারে। মাত্র ৪৩ দিনে পুরোটাই আচার ও আমসত্ত্ব সেল করে লাখপতি হয়ে গেছি। আমি টাকা ইনভেস্ট করে বিজনেস করা পছন্দ করতাম না। টাকা দিয়ে টাকা আনায় বিশ্বাসী ছিলাম। বাসায় খাওয়ার জন্য বোন, মাকে দেয়ার জন্য আচার করেছিলাম। আর সেই ছবি ফেইসবুকে দেই। আর সেখান থেকেই অর্ডার পাই বেশ কয়েক ধরনের আচারের। ১ম অর্ডার ছিল ২৬০ টাকার প্রথম ডেলিভারিটা আমার হাসবেন্ড ডেলিভারি দিয়েছিল। তিনি বলেন, টাকাটা আমার হাতে দেয়ার আগে সালাম করে বলেছিল তোমার অনেক কষ্টের টাকা। টাকাটা আমি হাতে নিয়ে বলেছিলাম ২৬০ টাকা থেকে ২ লাখ ৬০ হাজার যেদিন করতে পারব সেদিন মনটা শান্তি পাবে। টার্গেট পূরণ করতে ২ মাস লেগেছিল! ‘শুরু থেকে আমার মা অনেক সাপোর্ট করেছে আমায়। পরিবারের সবাই বিপক্ষে থাকলেও মা পাশে ছিলেন। আমার হাসবেন্ড ছিল আমার ভরসার জায়গা। যার উৎসাহ আর সহযোগিতায় আজ আমি এই পর্যায়ে।

উদ্যোক্তা হওয়টা কতটা সহজ মনে হয় আপনার কাছে, বা একজন নারীর উদ্যোক্তা হতে কি কি গুণাবলি বা যোগ্যতার প্রয়োজন হয় বলে আপনি মনে করেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মোটেও সহজ নয়। একজন উদ্যোক্তা হতে গেলে মনের সাহসটা থাকতে হয় সব থেকে বেশি। শরীরের জোরের থেকে এই কাজে মনের জোরটা বেশি প্রয়োজন। অনেক ধ্যৈর্যের প্রয়োজন। সামান্য একজন নারী হয়ে উঠতে পারে অসামান্য যদি সে কাজ টাকে ভালোবেসে এগিয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, এটা চ্যালেঞ্জের একটা বিষয়। অনলাইনে ১০ জন কি কাজ করছে সেটায় ফোকাস না করে ১০ জন কি কাজ করতে লজ্জা পায় সেটাই আগে খুজে বের করা উচিত। সেটাই আমি করেছিলাম। খাবার নিয়ে কাজ করতে সবাই লজ্জা পায় সেই সুযোগটাই আমি নিয়েছি। লজ্জা না মনের খুশিতে আমি কাজ করে গেছি।

জ্যোতি বলেন, প্রায় ২৮ টা দেশে আমার বানানো আচার, আমসত্ত্ব ডেলিভারি দিতে পেরেছি এবং বাংলাদেশের প্রতিটা জেলায় আমার এই আচার আইটেম পৌঁছে দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, ‘স্বপ্নের সন্ধানে’ নামটা ব্যান্ড হবে। একটা সময় আমি শত জনকে যেন কর্মসংস্থানের জায়গা করে দিতে পারি। আমার হাসবেন্ড বিষয়টি মন থেকে মেনে নিতে পেরেছিল যে আমি খাবার নিয়ে কাজ করব। আমার বাবা একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তাই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেনি কেউ। হয়তো আমার কাজ টা লজ্জার মনে হতো। যদিও আমি বর্তমানে তা ভুল প্রমাণিত করতে পেরেছি। আমার হাজবেন্ড ‘মেরিনার’ দুই বছরের একটা রাজকন্যা আছে আমার। আমার বাবা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এ.জি.এম. ছিলেন (অবসরপ্রাপ্ত), মা গৃহিণী।

জ্যোতি বলেন, আমি টাঙ্গাইলের বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি। মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান কলেজ থেকে এইচএসসি। কুমুদিনী সরকারি কলেজ থেকে ‘গ্রেজুয়েশন’ বর্তমানে টাঙ্গাইলের ‘ল’ কলেজ এ অধ্যয়নরত আছি (ভবিষ্যতে আরও ধাপ পেরুনোর ইচ্ছা আছে)। যে সাফল্যের কথা আপনি সবাইকে বলতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘরে বসে মাসে লাখ টাকা আয়’। জ্যোতি কাজ শুরু করেন, সিগনেচার আইটেম, আমসত্ব, আচার নিয়ে। কাজ শুরু করলেও বর্তমানে হ্যান্ড পেইন্টের সবকিছু, হোম মেইড কেক খাবার, কাসা পিতলের জিনিসপত্র এবং টাঙ্গাইলের শাড়ি শুধুমাত্র টাঙ্গাইলের নামটা সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এ নিয়েও কাজ করেছি।

হাসান সিকদার/বার্তাবাজার/ভিএস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর